ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
হিজরি বর্ষপঞ্জি মুসলিম উম্মাহর ইমানি চেতনা, ত্যাগ, ইবাদত এবং সোনালি ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা হিজরি বছরকে ১২টি মাসে বিভক্ত করার কথা ঘোষণা করে ইরশাদ করেছেন—
إِنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِنْدَ اللَّهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِي كِتَابِ اللَّهِ يَوْمَ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ فَلَا جَمُوعَ...
‘নিশ্চয় আল্লাহর বিধানে আসমান ও জমিন সৃষ্টির দিন থেকেই মাসের সংখ্যা বারোটি। এর মধ্যে চারটি সম্মানিত মাস। এটিই সরল দ্বীন।’ (সুরা আত-তওবা: আয়াত ৩৬)
প্রতিটি মাসের নাম, অর্থ এবং নেপথ্যের ইতিহাস মুমিনের অন্তরকে এক বিশেষ রুহানি আবেশে উদ্বেলিত করে। নিচে হিজরি ১২ মাসের নাম, তাৎপর্য ও ঐতিহাসিক পটভূমি তুলে ধরা হলো—
১. মহররম (ٱلْمُحَرَّم)— সম্মানিত ও নিষিদ্ধ মাস
নামকরণ ও অর্থ: ‘মহররম’ শব্দের অর্থ অতি সম্মানিত বা নিষিদ্ধ। এটি ইসলামের চারটি পবিত্র ও সম্মানিত মাসের (আশহুরে হুরুম) প্রথমটি। জাহেলি যুগ থেকেই এ মাসে রক্তপাত ও যুদ্ধবিগ্রহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল।
তাৎপর্য ও আমল: মহররম মাসের ১০ তারিখকে বলা হয় ‘আশুরা’। রমজানের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) এই মহররম মাসেই সবচেয়ে বেশি নফল রোজা রাখতেন।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব: হিজরি ৬১ সনের ১০ মহররম কারবালার প্রান্তরে প্রিয় নবীজি (সা.)-এর দৌহিত্র হজরত হুসাইন ইবনে আলী (রা.) ও তার পরিবার-পরিজন অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে সাহসিকতার সঙ্গে শাহাদাত বরণ করেন।
২. সফর (صَفَر)— শূন্যতা ও পুনরুজ্জীবন
নামকরণ ও অর্থ: ‘সফর’ শব্দের অর্থ শূন্য বা ফাঁকা। প্রাচীন আরবে মহররমের নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর মানুষ যুদ্ধের ময়দানে বা খাদ্যের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ত এবং ঘরবাড়িগুলো জনশূন্য হয়ে যেত বলে এর নামকরণ করা হয়েছিল ‘সফর’।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব: হিজরি ২ সনে ইসলামের প্রথম যুদ্ধ ‘আবওয়া’ এবং হিজরি ৭ সনে বিখ্যাত ‘খায়বার যুদ্ধ’ এই মাসেই সংঘটিত হয়েছিল। অনর্থক কুলক্ষণ বা অশুভ মনে করার কুপপ্রথাকে ইসলাম এ মাস থেকে দূর করেছে।
৩. রবিউল আউয়াল (رَبِيع ٱلْأَوَّل)— বসন্তের প্রথম বার্তা
নামকরণ ও অর্থ: ‘রবিউল আউয়াল’ অর্থ বসন্তের প্রথম ভাগ। প্রাকৃতিক পরিবর্তনের সঙ্গে মিলিয়ে প্রাচীন আরবে এই নাম রাখা হয়েছিল।
তাৎপর্য ও ইতিহাস: এই মাসটি মুসলিমদের কাছে অত্যন্ত আবেগ ও ভালোবাসার। কেননা এই ধরণিকে আলোকিত করে বিশ্বমানবতার মুক্তির দিশারি, রাহমাতুল্লিল আলামিন হজরত মুহাম্মদ (সা.) এ মাসেই ধরাধামে তাশরিফ আনেন। এ ছাড়া এই মাসেই তিনি মক্কা মোকাররমা থেকে মদিনা মুনাওয়ারায় ঐতিহাসিক হিজরত সম্পন্ন করেন।
৪. রবিউস সানি/রবিউল আখির (رَبِيع ٱلْآخِر)— বসন্তের শেষভাগ
নামকরণ ও অর্থ: ‘রবিউস সানি’ অর্থ বসন্তের দ্বিতীয় বা শেষভাগ। এ মাসের জন্য নির্দিষ্ট কোনো বিশেষ ইবাদতের বর্ষপঞ্জি না থাকলেও এটি ইসলামের দাওয়াতি ও প্রতিরক্ষা ইতিহাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব: হিজরি ৩ সনে এই মাসেই সংঘটিত হয় ‘ফুরু’ অভিযান। বিশ্বনবী (সা.) এই অভিযানে সশরীরে অংশগ্রহণ না করে সাহাবিদের প্রেরণের মাধ্যমে ইসলামি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিলেন।
৫. জুমাদাল উলা (جُمَادَىٰ ٱلُولَىٰ)— শুষ্কতার সূচনা
নামকরণ ও অর্থ: ‘জুমাদাল উলা’ শব্দটির উৎপত্তি ‘জুমুদ’ বা শুষ্কতা ও পানি জমে যাওয়ার কাল থেকে। এটি গ্রীষ্ম ও তীব্র তাপদাহের সূচনাকে নির্দেশ করত।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব: এ মাসেই রাসুলুল্লাহ (সা.) তার জীবনের প্রথম সহধর্মিণী হজরত খাদিজা (রা.)-এর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এ ছাড়া তার শৈশবের অন্যতম অভিভাবক ও দাদাজান আবদুল মুত্তালিব এ মাসেই ইন্তেকাল করেন। ৮ হিজরিতে ঐতিহাসিক ‘মুতার যুদ্ধ’ এই মাসেই সংঘটিত হয়, যেখানে হজরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)-কে প্রিয় নবীজি (সা.) ‘সাইফুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর তরবারি’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
৬. জুমাদাস সানি/জুমাদাল আখিরাহ (جُمَادَىٰ ٱلْآخِرَة)— শুষ্কতার শেষভাগ
নামকরণ ও অর্থ: এই মাসটি চরম শুষ্কতা বা শীতের শেষভাগকে নির্দেশ করে।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব: ১৩ হিজরির ২২ জুমাদাস সানি ইসলামের প্রথম খলিফা, সিদ্দিকে আকবর হজরত আবু বকর (রা.) ৬৩ বছর বয়সে ওফাত লাভ করেন। একই দিনে হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) দ্বিতীয় খলিফা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এ মাসেই বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে মুসলমানদের ঐতিহাসিক ‘ইয়ারমুকের যুদ্ধ’ সংঘটিত হয়েছিল।
৭. রজব (رَجَب)— সম্মানের ও মহিমান্বিত মাস
নামকরণ ও অর্থ: ‘রজব’ শব্দের অর্থ সম্মান বা মর্যাদা দেওয়া। এটি ইসলামের দ্বিতীয় সম্মানিত বা নিষিদ্ধ মাস। রজব মাস আগমন করলে নবীজি (সা.) রজব ও শাবানের বরকত এবং রমজান পর্যন্ত পৌঁছানোর দোয়া করতেন।
তাৎপর্য ও ইতিহাস: এ মাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর ও মহিমান্বিত ঘটনা হলো প্রিয় নবীজি (সা.)-এর ‘ইসরা ও মিরাজ’ (ঊর্ধ্বাকাশে ভ্রমণ)। মিরাজের এই রাতেই উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য উপহার হিসেবে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করা হয়। ৯ হিজরিতে নবীজি (সা.)-এর জীবনের সর্বশেষ যুদ্ধ ‘তবুক অভিযান’ এই মাসেই পরিচালিত হয়।
৮. শাবান (شَعْبَان)— ছড়িয়ে পড়া ও আত্মশুদ্ধি
নামকরণ ও অর্থ: ‘শাবান’ শব্দের অর্থ ছড়িয়ে পড়া। রজব মাসের যুদ্ধবিরতি শেষে প্রাচীন আরবরা বিভিন্ন উপত্যকায় ছড়িয়ে পড়ত বলে এর নাম রাখা হয় শাবান।
তাৎপর্য ও আমল: রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজানের প্রস্তুতি হিসেবে এই মাসে সবচেয়ে বেশি নফল রোজা রাখতেন। এ মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতটি ‘শবে বরাত’ বা নিছফ মিন শাবান হিসেবে পরিচিত—যে রাতে মহান আল্লাহ তাআলা বান্দাদের প্রতি বিশেষ রহমতের দৃষ্টি দেন এবং ক্ষমা ও নাজাতের সুসংবাদ দেন।
৯. রমজান (رَمَضَان)— পাপ দগ্ধ করার পবিত্র মাস
নামকরণ ও অর্থ: ‘রমজান’ শব্দের অর্থ প্রখর তাপ বা দগ্ধ করা। প্রখর খরতাপে যেমন বস্তুর ময়লা শুকিয়ে যায়, তেমনি এ মাসের ইবাদত ও সিয়ামের মাধ্যমে মুমিনের জীবনের গুনাহসমূহ পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
তাৎপর্য ও আমল: এটি হিজরি বর্ষের সবচেয়ে সম্মানিত ও মর্যাদাপূর্ণ মাস। ইসলামের চতুর্থ রুকন— পুরো এক মাসের ফরজ রোজা এ মাসেই পালন করা হয়।
মহিমান্বিত রাত: এ মাসেই মানবজাতির হিদায়াতের গ্রন্থ ‘পবিত্র কুরআন’ নাজিল হয়েছে। এ মাসেই রয়েছে ‘লাইলাতুল কদর’ বা মহিমান্বিত রাত, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।
১০. শাওয়াল (شَوَّال)— সাফল্য ও আনন্দ উল্লাস
নামকরণ ও অর্থ: ‘শাওয়াল’ অর্থ উত্তোলন করা বা বিকশিত হওয়া। রমজানের কঠোর সিয়াম সাধনার পর আত্মিক আত্মোন্নতিকে উচ্চে তুলে ধরার বার্তা নিয়ে আসে এই মাস।
তাৎপর্য ও সুনান: দীর্ঘ এক মাসের রোজার পর শাওয়াল মাসের প্রথম দিন আল্লাহ তাআলা উম্মতে মুসলিমাকে ‘ঈদুল ফিতর’-এর মহান নিয়ামত ও আনন্দ উপহার দিয়েছেন। এ মাসে ছয়টি নফল রোজা রাখা সুন্নত, যা পুরো বছর রোজা রাখার সমান সওয়াব বহন করে। ৩ হিজরিতে ঐতিহাসিক ‘ওহুদের যুদ্ধ’ এ মাসেই সংঘটিত হয়েছিল।
১১. জিলকদ (ذُو ٱلْقَعْدَة)— বিশ্রামের মাস
নামকরণ ও অর্থ: ‘জিলকদ’ শব্দের অর্থ বসা বা ক্ষান্ত হওয়া। এটি ইসলামের তৃতীয় সম্মানিত মাস। এ মাসে আরবরা যুদ্ধবিগ্রহ থেকে বিরত থেকে নিজ ঘরে বসে থাকত এবং হজের প্রস্তুতি নিত।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব: ৫ হিজরিতে ঐতিহাসিক ‘খন্দকের যুদ্ধ’ (পরিখা খননের যুদ্ধ) এবং ৭ হিজরিতে বিশ্বনবী (সা.) ও সাহাবিদের ঐতিহাসিক ‘কাজা ওমরাহ’ আদায়ের ঘটনা এ মাসেই ঘটেছিল।
১২. জিলহজ (ذُو ٱلْحِجَّة)— হজের মাস
নামকরণ ও অর্থ: ‘জিলহজ’ অর্থ হজের মাস। এটি হিজরি বছরের সর্বশেষ এবং চতুর্থ সম্মানিত মাস।
তাৎপর্য ও মহিমা: ইসলামের পঞ্চম রুকন ‘হজ’ এবং হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর ত্যাগের স্মারক ‘কুরবানি’ ও ‘ঈদুল আজহা’ এই মাসেই অনুষ্ঠিত হয়।
প্রথম দশ দিনের মর্যাদা: জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন ইবাদতের জন্য বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ দিন। বিশেষ করে আরাফাতের দিনের রোজা ও নফল ইবাদতের মর্যাদা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়।
হিজরি বর্ষপঞ্জির প্রতিটি মাস কেবল কালের প্রবাহ নয়, বরং মুসলিম উম্মাহর আত্মিক জাগরণ ও ইতিহাসের অমূল্য পাঠশালা। প্রাত্যহিক জীবনে এই মাসগুলোর তাৎপর্য ও ঐতিহাসিক পটভূমি হৃদয়ে ধারণ করার মাধ্যমে আমাদের দ্বীনি চেতনা আরও বেশি শাণিত হতে পারে।

