Logo
Logo
×

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

ঝগড়া মেটাতে কি মিথ্যা বলা জায়েজ? ইসলাম যা বলে

Advertisement

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৩৩ পিএম

ঝগড়া মেটাতে কি মিথ্যা বলা জায়েজ? ইসলাম যা বলে

ছবি: জেমিনি এআই

Advertisement

বন্ধু কিংবা পরিচিত-অপরিচিতদের মধ্যকার বিরোধ বা কোন্দল মেটাতে গিয়ে অনেক সময় মধ্যস্থতাকারী এমন কিছু কথা বলতে চান, যা শুনলে উভয় পক্ষের মন গলে যায়। কিন্তু সেই কথাগুলো যদি পুরোপুরি সত্য না হয়, তবে তা কি বলা বৈধ এবং এর জন্য কি কোনো সওয়াব মিলবে? ইসলামি শরিয়তে মূলনীতি হলো সর্বদা সত্য বলা এবং মিথ্যা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। তবে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক জোড়া লাগানোর মহান উদ্দেশ্যে ইসলাম কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে নমনীয়তার বা ছাড়ের বিধান রেখেছে।

মীমাংসা: ইসলামের দৃষ্টিতে এক মহান নেক আমল

সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখাকে ইসলাম অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। পারস্পরিক ঝগড়া-বিবাদ নিরসন করে মীমাংসা করে দেওয়া সাধারণ কোনো বিষয় নয়, বরং এটি একটি মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন—

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَفَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ

‘মুমিনরা তো পরস্পর ভাই। কাজেই তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে আপস-মীমাংসা করে দাও এবং আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও।’ (সুরা আল-হুজুরাত: আয়াত ১০)

অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ তাআলা আরও বলেন—

لَا خَيْرَ فِي كَثِيرٍ مِنْ نَجْوَاهُمْ إِلَّا مَنْ أَمَرَ بِصَدَقَةٍ أَوْ مَعْرُوفٍ أَوْ إِصْلَاحٍ بَيْنَ النَّاسِ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ ابْتِغَاءَ مَرْضَاتِ اللَّهِ فَسَوْفَ نُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا

‘তাদের অধিকাংশ গোপন পরামর্শে কোনো কল্যাণ নেই, তবে কল্যাণ আছে যে নির্দেশ দেয় সদকা, সৎকাজ ও মানুষের মধ্যে শান্তি স্থাপনের; আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় কেউ তা করলে তাকে অবশ্যই আমি মহা প্রতিদান দেব।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ১১৪)

হাদিস শরিফেও পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। হজরত আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

أَلَا أُخبرُكُم بِأَفْضَلَ مِنْ دَرَجَةِ الصِّيامِ وَالصَّلَاةِ وَالصَّدَقَةِ؟ قَالُوا: بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ. قَالَ: إِصْلَاحُ ذَاتِ البَيْنِ، وَفَسَادُ ذَاتِ البَيْنِ الحَالِقَةُ

‘আমি কি তোমাদের এমন একটি আমলের কথা বলব না, যা মর্যাদা ও ফাজিলাতের দিক থেকে নফল রোজা, নামাজ ও সদকার চেয়েও উত্তম? সাহাবিরা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, অবশ্যই বলুন। তিনি বললেন, পারস্পরিক সম্পর্ক সংশোধন করা (ঝগড়া মিটিয়ে দেওয়া)। আর পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট করা বা ঝগড়া বাধানো হলো মুণ্ডনকারী (সব ধ্বংস করে দেয়)।’ (আবু দাউদ ৪৯১৯, তিরমিজি ২৫০৯)

অন্য একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) দুই ব্যক্তির মাঝে ন্যায়বিচার ও মীমাংসা করে দেওয়াকেও একটি সদকা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। (মুসলিম ২২২৫)

মিথ্যার কঠোর পরিণতি ও শরিয়তের মূলনীতি

ইসলামে মিথ্যা বলা একটি কবিরা গুনাহ এবং অত্যন্ত গর্হিত অপরাধ। মানুষের চরিত্র ধ্বংসের পেছনে মিথ্যার বড় ভূমিকা রয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ

‘হে ইমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাক।’ (সুরা আত-তওবা: আয়াত ১১৯)

এ ছাড়াও রাসুলুল্লাহ (সা.) মিথ্যার পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে বলেছেন—

إِنَّ الصِّدْقَ يَهْدِي إِلَى الْبِرِّ، وَإِنَّ الْبِرَّ يَهْدِي إِلَى الْجَنَّةِ... وَإِنَّ الْكَذِبَ يَهْدِي إِلَى الْفُجُورِ، وَإِنَّ الْفُجُورَ يَهْدِي إِلَى النَّارِ

‘নিশ্চয়ই সত্যবাদিতা পুণ্যের দিকে পরিচালিত করে এবং পুণ্য জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়। আর মিথ্যা পাপের দিকে পরিচালিত করে এবং পাপ জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়।’ (বুখারি ৬০৯৪, মুসলিম ২৬০৭)

মীমাংসার ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড়ের বিধান

সব ক্ষেত্রে মিথ্যা নিষিদ্ধ হলেও উম্মুল মুমিনিন হজরত উম্মু কুলসুম বিনতে উকবা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে মানুষের মধ্যে সন্ধি ও মীমাংসার স্বার্থে বিশেষ ছাড়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

لَيْسَ الْكَذَّابُ الَّذِي يُصْلِحُ بَيْنَ النَّاسِ فَيَنْمِي خَيْرًا أَوْ يَقُولُ خَيْرًا

‘ওই ব্যক্তি মিথ্যাবাদী নয়, যে মানুষের মধ্যে মীমাংসা করার জন্য ভালো কথা পৌঁছে দেয় কিংবা ভালো কথা বলে।’ (বুখারি ২৬৯২, মুসলিম ২৬০৫)

সহিহ মুসলিমের অন্য বর্ণনায় এসেছে, হজরত উম্মু কুলসুম (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে তিনটি ক্ষেত্রে এ ধরনের কথার অনুমতির কথা বলতে শুনেছেন— যুদ্ধের ময়দানে কৌশলগত কারণে, মানুষের পারস্পরিক মীমাংসার ক্ষেত্রে এবং স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্ক সুমধুর করার স্বার্থে।

সওয়াব কি মিথ্যার জন্য, না মীমাংসার জন্য?

একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি যে, ইসলামে সরাসরি মিথ্যা বলা কখনোই সওয়াবের কাজ নয়। এখানে মূল সওয়াবের বিষয় হলো মানুষের বিরোধ মেটানো এবং সম্পর্ক জোড়া লাগানোর আন্তরিক চেষ্টা। হাদিসে মীমাংসাকারীকে ‘মিথ্যাবাদী নয়’ বলে অভিহিত করার অর্থ হলো— এই বিশেষ পরিস্থিতিতে শরিয়তসম্মত সীমার মধ্যে এমন কথা বলার অনুমতি রয়েছে, যা সাধারণ অবস্থায় বৈধ হতো না।

তাই কেউ যদি সত্যিই দুই বন্ধুর বিরোধ বা দূরত্ব ঘোচানোর উদ্দেশ্যে, কারও হক বা অধিকার নষ্ট না করে এই বিশেষ ছাড়ের আওতায় কথা বলেন, তবে তিনি মীমাংসার মহৎ কাজ ও সচ্ছল নিয়তের কারণে সওয়াবের আশা করতে পারেন, মিথ্যা বলার কারণে নয়।

‘তাওরিয়া’ বা দ্ব্যর্থবোধক কথার শ্রেষ্ঠত্ব

মীমাংসার ক্ষেত্রে সরাসরি মিথ্যা বলার পরিবর্তে এমন শব্দ বা বাক্য ব্যবহার করা উত্তম, যার একটি সত্য অর্থও থাকে। ইসলামি পরিভাষায় একে ‘তাওরিয়া’ বা দ্ব্যর্থবোধক কথা বলা বোঝায়।

ইমাম নববি (রহ.) সহিহ মুসলিমের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন যে, এ ধরনের অনুমতির মূল উদ্দেশ্য এমন কথা বলা, যা বাহ্যিকভাবে এক অর্থ প্রকাশ করলেও বক্তার মনে সত্য অন্য একটি অর্থ থাকে। সম্ভব হলে এই পদ্ধতি অবলম্বন করাই শ্রেয়। তাছাড়া ইমাম গাজালি (রহ.) তার বিখ্যাত ‘ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, শরিয়তসম্মত কোনো কল্যাণকর লক্ষ্য যদি সরাসরি সত্য কথা বলে অর্জন করা সম্ভব না হয়, তবেই প্রয়োজনের খাতিরে এই সুযোগের অবকাশ আসে।

এই ছাড়ের সুনির্দিষ্ট সীমারেখা

স্বভাবতই এই বিশেষ ছাড়টিকে যত্রতত্র অপব্যবহার করার কোনো সুযোগ নেই। এর কিছু সুনির্দিষ্ট শর্ত ও সীমারেখা রয়েছে—

  • সত্য বা ‘তাওরিয়া’ বা কৌশলী কথার মাধ্যমে যদি মীমাংসা করা সম্ভব হয়, তবে সাধারণ মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
  • একজনের কথা অন্যজনের কাছে এমনভাবে বাড়িয়ে বা বিকৃত করে উপস্থাপন করা যাবে না, যাতে বিরোধ আরও তীব্র আকার ধারণ করে।
  • অপবাদ রটানো, প্রতারণা করা কিংবা ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে এই ছাড় ব্যবহার করা যাবে না।
  • এই মীমাংসার অজুহাতে যদি কারও সম্পদ, সম্মান, মৌলিক অধিকার বা নিরাপত্তা অন্যায়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে তা কোনোভাবেই বৈধ হবে না।

ঝগড়া-বিবাদ থামিয়ে মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করা ইসলামের অন্যতম একটি সৌন্দর্য। ঝগড়া মেটানোর প্রক্রিয়ায় যদি কোনো কঠোর বা অপ্রিয় সত্য গোপন করে উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতা তৈরির সামান্য সুযোগও থাকে, তবে ইসলাম তা অনুমোদনের মাধ্যমে সম্পর্কের ভাঙন রোধ করতে চেয়েছে। তবে এটি কোনোভাবেই মিথ্যা বলার লাইসেন্স নয়, বরং সমাজ ও পরিবারে শান্তি প্রতিষ্ঠার একটি বিশেষ ও সীমিত কৌশল। পারস্পরিক দূরত্ব ভুলে ক্ষমা ও ভালোবাসার মাধ্যমেই একটি সুস্থ ও শান্তিপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

বিবাহিত জীবনে সাধারণত যেসব বিষয় এড়িয়ে চলা উচিত

বিবাহিত জীবনে সাধারণত যেসব বিষয় এড়িয়ে চলা উচিত

ডেলিভারির ফাঁকে কুরআন তিলাওয়াত করে প্রশংসায় ভাসছেন উগান্ডার মনসুর

ডেলিভারির ফাঁকে কুরআন তিলাওয়াত করে প্রশংসায় ভাসছেন উগান্ডার মনসুর

বাবা কন্যাকে কি সব সম্পত্তি দান করতে পারবেন?

বাবা কন্যাকে কি সব সম্পত্তি দান করতে পারবেন?

বিভাজনের প্রাচীরে বন্দি মুসলিম উম্মাহ

বিভাজনের প্রাচীরে বন্দি মুসলিম উম্মাহ

সূরা আল-বাকারাহ’র আলোকে জীবনের নির্দেশনা

সূরা আল-বাকারাহ’র আলোকে জীবনের নির্দেশনা

জুমার দিনের অফুরন্ত ফজিলত ও বরকতময় আমল

জুমার দিনের অফুরন্ত ফজিলত ও বরকতময় আমল

আরও পড়ুন

বিবাহিত জীবনে সাধারণত যেসব বিষয় এড়িয়ে চলা উচিত

বিবাহিত জীবনে সাধারণত যেসব বিষয় এড়িয়ে চলা উচিত

সাবেক স্বামীকে কি আবার বিয়ে করা যাবে, শরিয়াহ কী বলে?

সাবেক স্বামীকে কি আবার বিয়ে করা যাবে, শরিয়াহ কী বলে?

তাবিজ-যাদুটোনা করে কাউকে বশ করা কি জায়েজ? শরিয়তের বিধান জানুন

তাবিজ-যাদুটোনা করে কাউকে বশ করা কি জায়েজ? শরিয়তের বিধান জানুন

ঝগড়া মেটাতে কি মিথ্যা বলা জায়েজ? ইসলাম যা বলে

ঝগড়া মেটাতে কি মিথ্যা বলা জায়েজ? ইসলাম যা বলে

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম