শুধু ডায়েটেই কি ওজন কমে? জেনে নিন পাচনতন্ত্র ও বিপাকক্রিয়ার আসল গল্প
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬, ০৪:২২ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ওজন কমানোর কথা উঠলেই সাধারণত ক্যালরি হিসাব করা, ব্যায়াম করা আর ইচ্ছাশক্তির কথা আলোচনা করা হয়। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান এর চেয়ে অনেক বিস্তৃত একটি সত্য তুলে ধরে।
একই ধরনের খাবার খেয়ে এবং সমপরিমাণ কায়িক পরিশ্রম করেও দুজন মানুষের ফলাফল সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে—একজন হয়তো সহজেই ওজন কমাচ্ছেন, অন্যজন প্রাণপণ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছেন। এই পার্থক্যের বড় একটি অংশের সূচনা হয় আমাদের পরিপাকতন্ত্র বা পাকস্থলীতে।
পাচনতন্ত্র কেবল খাবার হজমই করে না; এটি মস্তিষ্ক, লিভার, অগ্ন্যাশয় এবং ইমিউন সিস্টেমের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রক্ষা করে। ক্ষুধা, তৃপ্তি, রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণ, চর্বি জমা এবং শক্তির ব্যবহার—সবকিছুর পেছনেই রয়েছে পরিপাকতন্ত্রের ভূমিকা। এই সংকেতগুলো সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকলে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়, কিন্তু এতে ব্যাঘাত ঘটলে বিপাকক্রিয়া ধীর হয়ে যায় এবং শরীরে মেদ জমতে শুরু করে।
পাচনতন্ত্র: শরীরের বিপাকীয় নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র
আমাদের অন্ত্রে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও অন্যান্য অণুজীব বাস করে, যাদের একসঙ্গে ‘অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম’ বলা হয়। এগুলো খাবার হজমে সাহায্য করার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি তৈরি করে এবং প্রদাহ নিয়ন্ত্রণ করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, স্থূলতায় ভুগতে থাকা মানুষের অন্ত্রে ব্যাকটেরিয়ার বৈচিত্র্য সুস্থ ও স্বাভাবিক ওজনের মানুষের চেয়ে কম থাকে। কিছু অণুজীব একই খাবার থেকে বেশি পরিমাণে ক্যালরি শোষণ করতে শরীরকে সাহায্য করে, ফলে বাড়তি খাবার না খেয়েও শরীরে বাড়তি শক্তি শোষিত হয়।
এছাড়া, অণুজীবগুলো ডায়েটারি ফাইবার বা আঁশযুক্ত খাবার থেকে শর্ট-চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড তৈরি করে। এগুলো লিভারের কার্যকারিতা এবং ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়ায়। অন্ত্রের স্বাস্থ্যকর ভারসাম্য বজায় না থাকলে শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমতে শুরু করে এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ সৃষ্টি হয়।
মস্তিষ্কে পৌঁছানোর আগেই ক্ষুধাবোধ তৈরি হয় অন্ত্রে
ক্ষুধা এবং তৃপ্তির অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করে একগুচ্ছ হরমোন, যার বড় একটি অংশ উৎপন্ন হয় পরিপাকতন্ত্রে।
খাবার খাওয়ার পর ‘জিএলপি-১’ এবং ‘পেপটাইড ওয়াইওয়াই’ হরমোন আমাদের পেট ভরার সংকেত দেয়, আর ‘ঘ্রেলিন’ নামক হরমোন খাবারের আগে ক্ষুধা জাগায়।
এই হরমোনগুলোর সঠিক মাত্রায় নিঃসরণ নির্ভর করে অন্ত্রের সুস্বাস্থ্যকর ব্যাকটেরিয়ার ওপর। অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার, চিনিযুক্ত পানীয় ও রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেট খেলে এবং খাদ্যতালিকায় ফাইবার না রাখলে এই হরমোনের সংকেতগুলো এলোমেলো হয়ে যায়। ফলে ঘন ঘন ক্ষুধা লাগে এবং বেশি খাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়।
রক্তের শর্করা ও পেটের চর্বির খেলা
ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনগুলো ইনসুলিন উৎপাদন এবং রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণেও কাজ করে। অন্ত্রের দেয়াল ক্ষতিগ্রস্ত হলে ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়ার বিষাক্ত উপাদান (যেমন- লিপোপলিস্যাকারাইড) রক্তে প্রবেশ করে পুরো শরীরে প্রদাহ তৈরি করে। এই প্রদাহ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়, যা টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়।
ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ-এর ২০২৩ সালের একটি রিপোর্ট অনুসারে, দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতি ৩ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে ১ জন পেটের স্থূলতায় এবং ৪ জনের মধ্যে ১ জন সাধারণ স্থূলতায় ভুগছেন।
সব চর্বি এক নয়। চামড়ার নিচে জমে থাকা চর্বির চেয়ে পেটের ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে (লিভার, অগ্ন্যাশয়) ঘিরে থাকা ভিসারাল ফ্যাট বেশি বিপজ্জনক। এটি প্রদাহ সৃষ্টিকারী রাসায়নিক নিঃসরণ করে ডায়াবেটিস, ফ্যাটি লিভার, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
দৈনন্দিন অভ্যাস ও চিকিৎসা
শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, বাদাম ও ফারমেন্টেড বা গ্যাঁজানো খাবার (যেমন—দই) অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়া বাড়াতে সাহায্য করে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম, শরীরচর্চা ও মানসিক চাপ মুক্ত থাকা মাইক্রোবায়োমের স্বাস্থ্য বজায় রাখে।
তবে যাদের ক্ষেত্রে চরম চেষ্টা সত্ত্বেও দীর্ঘস্থায়ী স্থূলতা কমছে না, চিকিৎসাবিজ্ঞান তাদের জন্য বেরিয়াট্রিক সার্জারিকে একটি কার্যকর সমাধান হিসেবে দেখে। স্লীভ গ্যাস্ট্রেক্টোমি বা গ্যাস্ট্রিক বাইপাসের মতো পদ্ধতিগুলো কেবল পাকস্থলীর আকার ছোটই করে না, বরং অন্ত্রের ‘জিএলপি-১’ হরমোনের মাত্রাসহ সার্বিক বিপাকীয় সংকেতগুলোকে নতুন করে পুনর্গঠন করে। ফলে সার্জারির মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই ইনসুলিন সংবেদনশীলতা ও শর্করা নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান উন্নতি দেখা যায়।
তাই কেবল না খেয়ে থেকে ওজনের দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। পরিপাকতন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া, হরমোন ও বিপাকীয় ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে আমাদের শরীর কীভাবে খাবার গ্রহণ ও ব্যবহার করবে।
সুষম খাবার, সুশৃঙ্খল জীবনযাপন এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শের মাধ্যমে অন্ত্রকে সুস্থ রাখাই দীর্ঘস্থায়ী মেটাবলিক স্বাস্থ্যের মূল ভিত্তি।
সূত্র: এনডিটিভি

