ওষুধ খেয়েও কমছে না উচ্চ রক্তচাপ? জেনে নিন দৈনন্দিন ৫টি ‘নীরব’ ভুল
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬, ০৪:১৯ পিএম
প্রতীকী ছবি।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
উচ্চ রক্তচাপকে অকারণেই ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয় না। দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন নিয়ম মেনে চিকিৎসকের দেওয়া রক্তচাপের ওষুধ খাচ্ছেন, খাবারে অতিরিক্ত কাঁচা লবণ খাওয়া বন্ধ করেছেন, তবুও ডিজিটাল মিটারে রক্তচাপের রিডিং ১৪০/৯০-এর নিচে না নামায় হতাশ হয়ে পড়ছেন।
নিয়মিত ওষুধ খাওয়ার পরও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না এলে আমরা সাধারণত বংশগত কারণকে দায়ী করি অথবা ওষুধের ডোজ বাড়ানো দরকার বলে ধরে নিই। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, আসল অপরাধী লুকিয়ে থাকে আমাদের খুব কাছেই—দৈনন্দিন কিছু অজানা অভ্যাস ও অনভ্যাসের ভেতরেই, যা অগোচরে আমাদের হৃদযন্ত্র ও রক্তনালীর স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
আপনিও যদি ভেবে থাকেন যে ওষুধ খাওয়ার পরও কেন আপনার রক্তচাপ কমছে না, তবে এখনই নিজের জীবনযাত্রার দিকে নজর দেওয়ার উপযুক্ত সময়। এনডোকোক্রাইন সিস্টেম ও হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য স্বাভাবিক রাখতে যে ৫টি সাধারণ ভুল এড়িয়ে চলা জরুরি, তা নিচে আলোচনা করা হলো:
১. প্রক্রিয়াজাত খাবারের লুকানো সোডিয়ামকে অবহেলা করা
অনেকেই ভাবেন খাবারের প্লেটে বা তরকারিতে কাঁচা লবণ খাওয়া বন্ধ করলেই সোডিয়ামের ঝুঁকি শেষ। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য বলছে, খাবারে ব্যবহৃত সোডিয়ামের প্রায় ৭৫ শতাংশই আসে প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত খাবার থেকে।
দোকানের পাউরুটি, প্যাকেটজাত সুপ, ইনস্ট্যান্ট নুডুলস, আচার, পাপড় ও সিরিয়ালের মতো প্রক্রিয়াজাত খাবারে স্থায়িত্ব ও স্বাদ বাড়ানোর জন্য প্রচুর সোডিয়াম ব্যবহার করা হয়। এই অতিরিক্ত সোডিয়াম রক্তে তরলের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়, ফলে রক্তনালীর দেওয়ালে অবিরাম চাপ সৃষ্টি হয়। তাই লবণের কৌটা দূর করার পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাত খাবারের উপাদানের তালিকা পড়ে সোডিয়ামের মাত্রা দেখে নেওয়া জরুরি।
২. পটাশিয়ামের গুরুত্ব না বোঝা
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের আলোচনায় সোডিয়াম নজর কাড়লেও পটাশিয়াম থেকে যায় অবহেলিত। মানবদেহে সোডিয়াম ও পটাশিয়াম বিপরীতমুখী হয়ে তরলের ভারসাম্য রক্ষা করে।
পটাশিয়াম প্রাকৃতিক উপাদানের মতো কাজ করে, যা কিডনির মাধ্যমে অতিরিক্ত সোডিয়াম বের করে দেয় এবং রক্তনালীর পেশিকে শিথিল রাখতে সাহায্য করে। খাদ্যতালিকায় সবুজ শাকসবজি ও পূর্ণশস্যের অভাব থাকলে পটাশিয়ামের ঘাটতি দেখা দেয়, যা শরীরকে পানি ধরে রাখতে বাধ্য করে এবং রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়।
৩. ঘরে রক্তচাপ মাপার ভুল পদ্ধতি
বাড়িতে নিয়ম করে রক্তচাপ মাপা ভালো অভ্যাস হলেও ভুল পদ্ধতি আপনাকে বিভ্রান্ত করতে পারে। সিঁড়ি দিয়ে হেঁটে এসেই রক্তচাপ মাপা, পা ক্রস করে বসা কিংবা মানসিক চাপের মুহূর্তে রিডিং নিলে সিস্টোলিক রক্তচাপ সাময়িকভাবে বেড়ে যায়। এই ভুয়া রিডিং মানসিক উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দেয়, যা রক্তচাপকে আরও ওপরে তোলে।
সঠিক নিয়ম:
রক্তচাপ মাপার আগে কমপক্ষে ৫ মিনিট শান্ত হয়ে বসুন। পা মেঝের সঙ্গে সমান্তরাল রাখুন, পিঠের পেছনে সাপোর্ট দিন এবং হাতটি হৃদপিণ্ডের সমউচ্চতায় কোনো টেবিলে রাখুন। মাপা চলার সময় কথা বলা বা মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকানো থেকে বিরত থাকুন।
৪. দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপকে হালকাভাবে নেওয়া
মানসিক চাপ কেবল কোনো আবেগের বিষয় নয়, এটি সরাসরি শারীরিক ক্ষতি করে। কর্মক্ষেত্রের চাপ বা পারিবারিক দুশ্চিন্তার কারণে শরীরের অ্যাড্রেনাল গ্রন্থি থেকে অনবরত কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের মতো স্ট্রেস হরমোন নিঃসৃত হয়।
এই হরমোনগুলো হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেয় এবং রক্তনালীকে সংকুচিত করে ফেলে। দীর্ঘদিন ধরে এমনটা চলতে থাকলে রক্তনালীর স্থিতিস্থাপকতা নষ্ট হয়ে যায় এবং রক্তচাপ স্থায়ীভাবে উঁচুতে অবস্থান করে।
৫. রাতের পর্যাপ্ত ঘুমে ছাড় দেওয়া
আজকের ব্যস্ত জীবনে ঘুম কমানো যেন এক স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। তবে ঘুম কোনো বিলাসি বস্তু নয়, এটি হৃদযন্ত্রকে পুনরায় সতেজ করার এক প্রাকৃতিক উপায়। গভীর ঘুমের সময় মানবদেহের রক্তচাপ স্বাভাবিকের চেয়ে ১০ থেকে ২০ শতাংশ কমে যায়, যা রক্তনালীগুলোকে বিশ্রাম ও নিরাময়ের সুযোগ দেয়।
যারা রাতে ৬ ঘণ্টার কম ঘুমান, তাদের এই স্বয়ংক্রিয় বিশ্রামপ্রক্রিয়া বিঘ্নিত হয়। ফলে দিনের বেলাতেও স্নায়ুতন্ত্র অতিরিক্ত সক্রিয় থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদে রক্তনালীর ক্ষতি করে। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাতে পর্যাপ্ত ও গভীর ঘুম নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
পরিশেষে, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা কেবল একটি ছোট ট্যাবলেট গেলার ওপর নির্ভর করে না। দৈনন্দিন জীবনের এই সূক্ষ্ম ভুলগুলো শুধরে নিয়ে জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনলেই কেবল ওষুধ সঠিকভাবে কাজ করবে এবং হৃদযন্ত্র তার স্বাভাবিক সুস্থতা ফিরে পাবে।
সূত্র: এনডিটিভি লাইফলাইন

