ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ একসঙ্গে? কিডনি সুস্থ রাখতে খাবারে যেসব পরিবর্তন জরুরি
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:০১ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দু’টি রুটি, একবাটি ডাল, সালাদ ও একটি সেঁকা পাঁপড়—প্রথম দেখায় খাবারের তালিকাটি বেশ স্বাস্থ্যকর মনে হতে পারে। কিন্তু ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনির সমস্যা একসঙ্গে থাকলে এই খাবারগুলোও কি নিরাপদ? বিশেষজ্ঞদের মতে, খাবার স্বাস্থ্যকর কি না, তা শুধু উপাদানের ওপর নির্ভর করে না; বরং ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা ও খাবারের পরিমাণও গুরুত্বপূর্ণ।
ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ কিডনির ক্ষতির অন্যতম ঝুঁকির কারণ। দীর্ঘদিন রক্তে শর্করা ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে কিডনির সূক্ষ্ম রক্তনালিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে কিডনির রক্ত পরিশোধনের ক্ষমতা কমে যায়। সমস্যা আরও জটিল হলো, কিডনির রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই বাড়তে থাকে। ফলে রোগী বুঝে ওঠার আগেই কিডনির ক্ষতি গুরুতর হয়ে যেতে পারে।
ধূমপান, অতিরিক্ত মদ্যপান ও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যথানাশক ওষুধ সেবনের পাশাপাশি প্রতিদিনের খাবারের কিছু অভ্যাসও কিডনির স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পুষ্টিবিদদের পরামর্শ, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি খাদ্যতালিকায় কিডনিবান্ধব খাবার রাখা এবং ক্ষতিকর অভ্যাস এড়িয়ে চলা জরুরি। এ জন্য কঠোর ডায়েটের চেয়ে ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী সঠিক খাবার বেছে নেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
নুন কমাতে হবে, সতর্ক থাকতে হবে পাঁপড়-আচারেও
শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য সোডিয়াম প্রয়োজন হলেও অতিরিক্ত নুন উচ্চ রক্তচাপ বাড়াতে পারে। আর অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ কিডনির সূক্ষ্ম রক্তনালির ক্ষতি করে কিডনির কার্যক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।
রান্নায় নুনের পরিমাণ কমানোর পাশাপাশি প্রতিদিনের খাবারে থাকা লুকানো নুনের উৎসগুলোও খেয়াল রাখা জরুরি। পাঁপড়, নোনতা আচার, নুন দেওয়া বাদাম এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারে প্রচুর সোডিয়াম থাকতে পারে। তাই এসব খাবার নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস কমানো প্রয়োজন।
অনেকে স্বাস্থ্যকর মনে করে সেঁকা পাঁপড় বা নুন দেওয়া বাদাম খান। কিন্তু উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনির সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে খাবারের ধরন ও পরিমাণ বিবেচনা করা জরুরি। অতিরিক্ত নুন এড়িয়ে চললে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়, যা কিডনি ও হৃদযন্ত্রের সুরক্ষায় সহায়ক।
কিডনির সমস্যা থাকলে কি প্রোটিন কম খেতে হবে?
শরীরের পেশি গঠন ও ক্ষয়পূরণসহ বিভিন্ন কাজে প্রোটিন প্রয়োজন। তবে কিডনির রোগ থাকলে কতটা প্রোটিন খাওয়া উচিত, তা নিয়ে অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে।
পুষ্টিবিদদের মতে, সবার জন্য প্রোটিন গ্রহণের একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। কিডনির কার্যক্ষমতা, রোগের পর্যায়, শরীরের ওজন, বয়স, পুষ্টির চাহিদা ও দৈহিক পরিশ্রমের ওপর প্রোটিনের প্রয়োজন নির্ভর করে। তাই কিডনির সমস্যা থাকলেই নিজের সিদ্ধান্তে প্রোটিন একেবারে কমিয়ে দেওয়া বা অতিরিক্ত খাওয়া—কোনোটিই ঠিক নয়।
ডাল, মাছ ও মাংস প্রোটিনের উৎস হলেও কোন খাবার কতটা খাওয়া যাবে, তা চিকিৎসক বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত।
ভাত, রুটি ও ডাল কতটা খাবেন?
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভাত ও রুটির মতো শর্করাজাতীয় খাবারের পরিমাণের দিকে নজর দেওয়া জরুরি। তবে কতটা ভাত বা রুটি খাওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে রক্তে শর্করার মাত্রা, শরীরের ওজন, দৈহিক পরিশ্রম এবং সামগ্রিক খাদ্যতালিকার ওপর।
খাবারে পরিমিত পরিমাণে ভাত বা রুটি রাখার পাশাপাশি উপযুক্ত পরিমাণে শাকসবজি ও সালাদ খাওয়া যেতে পারে। তবে কিডনির রোগের পর্যায় অনুযায়ী কিছু সবজি ও ফলের পটাশিয়াম বা অন্যান্য খনিজের পরিমাণও বিবেচনা করতে হতে পারে। তাই কিডনির সমস্যা থাকলে সব ধরনের সবজি বা ফল ইচ্ছামতো খাওয়া নিরাপদ—এমন ধারণা ঠিক নয়।
একইভাবে ডাল, মাছ ও মাংসের পরিমাণও ব্যক্তির প্রয়োজন ও কিডনির কার্যক্ষমতা অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত। সবার জন্য একই খাদ্যতালিকা অনুসরণ না করে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়াই ভালো।
উপসর্গের অপেক্ষা নয়, নিয়মিত কিডনি পরীক্ষা জরুরি
ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ থাকলে রক্তে শর্করা ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি নিয়মিত কিডনির কার্যক্ষমতা পরীক্ষা করানো প্রয়োজন। কিডনির সমস্যা শুরু হলে অনেক সময় প্রাথমিক পর্যায়ে স্পষ্ট কোনো উপসর্গ থাকে না। তাই অসুস্থ বোধ করার অপেক্ষায় না থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা করানো উচিত।
কিডনির কার্যক্ষমতা যাচাইয়ে সাধারণত রক্তে সিরাম ক্রিয়েটিনিন পরীক্ষা করা হয়। এই ফলের ভিত্তিতে ইজিএফআর বা ‘এস্টিমেটেড গ্লোমেরুলার ফিল্ট্রেশন রেট’ হিসাব করা হয়। এর মাধ্যমে কিডনি কতটা দক্ষতার সঙ্গে রক্ত পরিশোধন করছে, সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তবে শুধু ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা দিয়ে কিডনির অবস্থা পুরোপুরি বোঝা যায় না।
এ ছাড়া প্রস্রাবে অ্যালবুমিন বা প্রোটিনের উপস্থিতি যাচাইয়ের পরীক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের ক্ষেত্রে। কত ঘন ঘন পরীক্ষা করাতে হবে, তা রোগীর ঝুঁকি ও আগের পরীক্ষার ফল অনুযায়ী চিকিৎসক নির্ধারণ করবেন।
কিডনি সুস্থ রাখতে তাই শুধু খাবারে নুন কমালেই হবে না। রক্তে শর্করা ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান এড়িয়ে চলা, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যথানাশক ওষুধ না খাওয়া এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা—সবকিছুর দিকেই নজর দিতে হবে।
সূত্র: আনন্দবাজার
