ওষুধ খেয়েও ব্লাড প্রেসার কমছে না? জেনে নিন কারণ
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৩৭ পিএম
প্রতীকী ছবি।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সাধারণত আমরা রক্তচাপ বা ব্লাড প্রেসারকে (বিপি) কেবল দুটি সংখ্যার হিসাব হিসেবেই দেখি, কিন্তু আমাদের হৃদয় বা হার্ট তা দেখে না।
রক্তচাপ যখন দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত মাত্রায় থাকে, তখন শরীরের রক্ত সঞ্চালন বজায় রাখতে হার্টকে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয়। সময়ের সাথে সাথে এই অতিরিক্ত চাপ রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ও কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
তবে চিন্তার বিষয় তখনই আরও বাড়ে, যখন চিকিৎসাধীন থাকার পরও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আসে না।
গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের ‘রেসিস্ট্যান্ট হাইপারটেনশন’ বা অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে (কমপক্ষে তিনটি ওষুধ খাওয়ার পরও রক্তচাপ ১৪০/৯০ মিমি পারদ বা তার বেশি থাকে), তাদের ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, কিডনি বিকল হওয়া এবং মৃত্যুর ঝুঁকি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা ব্যক্তিদের চেয়ে ২ থেকে ৬ গুণ বেশি।
উপমহাদেশে এই সমস্যাটি ধারণার চেয়েও অনেক বেশি প্রকট। এর মধ্যে ভারতে সর্বশেষ এনএফএইচএস-৬-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সি নারীদের ১৯.৪ শতাংশ এবং পুরুষদের ২২.১ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন অথবা তা নিয়ন্ত্রণে ওষুধ খাচ্ছেন।
১৭ লাখের বেশি ভারতীয়দের ওপর চালানো এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত রোগীদের মাত্র ৮.৫ শতাংশের প্রেসার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এতে স্পষ্ট বোঝাই যাচ্ছে, রক্তচাপ কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা কতটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাহলে একজন মানুষ যখন নিয়মিত ওষুধ খাচ্ছেন, খাদ্যাভ্যাস মেনে চলছেন এবং শারীরিক পরিশ্রম করছেন, তা সত্ত্বেও কেন রক্তচাপের পারদ কমছে না?
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা সবসময় নতুন আরেকটি ট্যাবলেট খাওয়া বা জীবনযাত্রায় আরও কঠোর পরিবর্তনের বিষয় নয়। উপযুক্ত চিকিৎসার পরও যখন প্রেসার বেশি থাকে, তখন আমাদের একটু থেমে ভাবা দরকার যে এর পেছনে অন্য কোনো মূল কারণ রয়েছে কিনা।
অবশ্যই জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তনের গুরুত্ব অপরিসীম।
খাবারে লবণের পরিমাণ কমানো, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, শারীরিক পরিশ্রম করা, অ্যালকোহল ও তামাক পরিহার করা এবং পর্যাপ্ত ঘুমানো প্রেসার নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। কিন্তু সুস্থ অভ্যাসের অর্থ এই নয় যে সবার শরীর একইভাবে সাড় দেবে। সব চেষ্টা সত্ত্বেও রক্তচাপ টানা বেশি থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শে পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
উচ্চ রক্তচাপের নেপথ্যে লুকানো হরমোনের প্রভাব
নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন এমন রক্তচাপের পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকতে পারে। এক্ষেত্রে সাধারণত চিকিৎসকরা নিচের বিষয়গুলো পরীক্ষা করে থাকেন:
- ওষুধগুলো কি সঠিক নিয়ম ও মাত্রায় খাওয়া হচ্ছে?
- রক্তচাপ কি সঠিকভাবে মাপা হচ্ছে?
- অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ, স্থূলতা, স্লিপ অ্যাপনিয়া (ঘুমের মধ্যে শ্বাসকষ্ট), কিডনির সমস্যা বা অন্য কোনো ওষুধ রক্তচাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে কিনা?
- এর পেছনে অন্য কোনো মূল কারণ বা হরমোনের প্রভাব রয়েছে কিনা?
অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপের অন্যতম একটি কারণ হতে পারে ‘অ্যালডোস্টেরন’ নামক হরমোন। এই হরমোন শরীরে লবণ ও পানির সামঞ্জস্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
যখন শরীরে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি অ্যালডোস্টেরন তৈরি হয়, তখন শরীর অতিরিক্ত সোডিয়াম ও পানি ধরে রাখে, যা রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়।
সময়ের সাথে সাথে এটি রক্তনালি ও অন্যান্য অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে। সাধারণ চিকিৎসায় কাজ না হলে রক্তচাপ বৃদ্ধির আসল কারণ বোঝা তাই অত্যন্ত জরুরি।
উল্লেখ্য, একটা সময় দীর্ঘদিন ধরে রক্তচাপ অনিয়ন্ত্রিত থাকলে ওষুধের মাত্রা পরিবর্তন করা বা নতুন ওষুধ যুক্ত করাই ছিল মূল উপায়। সেসব পদক্ষেপ এখনো গুরুত্বপূর্ণ। তবে বর্তমানে রক্তচাপের চিকিৎসায় প্রতিটি রোগীর ব্যক্তিগত শারীরিক চাহিদাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
চিকিৎসকরা এখন শুধু সংখ্যার দিকে না তাকিয়ে এর পিছনের জৈবিক কারণ অনুসন্ধানে জোর দিচ্ছেন।
বিশেষ করে অ্যালডোস্টেরন ক্ষরণ বন্ধের মতো নির্দিষ্ট জৈবিক প্রক্রিয়াকে লক্ষ্য করে তৈরি আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা এই নতুন চিন্তাধারারই প্রতিফলন।
রোগীর রক্তচাপ কেন নিয়ন্ত্রণে আসছে না তা বুঝতে পারলে চিকিৎসকরা পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এর মূল উদ্দেশ্য হলো পরবর্তী ডাক্তার দেখানোর সময় প্রেসার কম রাখা এবং অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপের ফলে হার্ট ও অন্যান্য অঙ্গের যে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হয়, তা রোধ করা।
শারীরিকভাবে সুস্থ অনুভব করছেন বলেই হার্ট ভালো আছে—এমনটা ভাবা একদমই উচিত নয়। কারণ উচ্চ রক্তচাপের দৃশ্যমান কোনো লক্ষণ না থাকলেও তা নীরবে হার্টের ওপর চাপ বাড়াতে থাকে।
নিজের রক্তচাপের মাত্রা জানুন, নিয়ম মেনে ওষুধ খান এবং রক্তচাপ টানা বেশি থাকলে তা অবহেলা করবেন না। ওষুধ খাওয়ার পরও প্রেসার নিয়ন্ত্রণে না এলে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করুন।

