সকালে ভারি নাশতার ঘণ্টাখানেক পরই আবার ক্ষুধা? জেনে নিন কারণ
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬, ১২:৫৮ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সকালে পেট ভরে নাশতা করার ঘণ্টাখানেক পর থেকেই পেটে মোচড় দিয়ে ক্ষুধা লাগার অভিজ্ঞতা অনেকেরই রয়েছে।
সাধারণত পর্যাপ্ত খাবার না খাওয়ার দরুন এমনটি হয় বলে ধরে নেওয়া হলেও, পুষ্টিবিদদের মতে বিষয়টি কেবল খাবারের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে না। বরং রক্তে শর্করার দ্রুত ওঠানামা, খাবারে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের অভাব কিংবা ঘুম ও মানসিক চাপের মতো জীবনযাত্রার নানা অনুষঙ্গ এর পেছনে দায়ী।
শরীর কীভাবে তৃপ্তি বা পেট ভরার সংকেত দেয়?
আমাদের পাকস্থলী ও মস্তিষ্কের মধ্যকার একটি সূক্ষ্ম যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষুধা ও পেট ভরার অনুভূতি নিয়ন্ত্রিত হয়। মূলত দুটি হরমোন এতে মূল ভূমিকা পালন করে—‘গ্রেলিন’ যা খালি পাকস্থলীতে তৈরি হয়ে মস্তিষ্কে ক্ষুধার সংকেত পাঠায়, এবং ‘লেপটিন’ যা পর্যাপ্ত খাবার গ্রহণের পর পেট ভরার অনুভূতি তৈরি করে।
খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন ও ফাইবার বা আঁশ না থাকলে খাবার দ্রুত হজম হয়ে যায়। ফলে ‘গ্রেলিন’-এর মাত্রা কমতে পারে না এবং খাওয়ার পরও ক্ষুধা রয়ে যায়।
দিল্লি ফোর্টিস হাসপাতালের প্রধান ক্লিনিক্যাল ডায়েটিশিয়ান ড. রুচিকা জৈন জানান, ‘খাবারে প্রোটিন ও ফ্যাটের অভাব থাকলে এবং কেবল পরিশোধিত শর্করা থাকলে রক্তে গ্লুকোজ দ্রুত মিশে যায়। এতে রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যায় এবং তা নিয়ন্ত্রণে শরীর অতিরিক্ত ইনসুলিন নিসরণ করে। ফলে শর্করার মাত্রা হঠাৎ কমে গিয়ে খাওয়ার ৬০ থেকে ৯০ মিনিটের মধ্যেই তীব্র ক্ষুধা অনুভূত হয়।’
দ্রুত ক্ষুধা লাগার প্রধান ৮টি কারণ
১. প্রোটিনের অভাব: প্রোটিন হজমপ্রক্রিয়াকে ধীরগতি করে এবং ‘গ্রেলিন’ হরমোন উৎপাদনে বাধা দেয়। নাশতায় ২০ থেকে ৩০ গ্রাম প্রোটিন না থাকলে অল্প সময়ের মধ্যেই আবার ক্ষুধা পেয়ে যায়।
২. অতিরিক্ত পরিশোধিত শর্করা গ্রহণ: সাদা পাউরুটি, মিষ্টি সিরিয়াল, পেস্ট্রি বা অতিরিক্ত মিষ্টি দেওয়া চা-কফি রক্তে শর্করার স্পাইক তৈরি করে। ভারতের অ্যাপোলো হাসপাতালের প্রধান ক্লিনিক্যাল ডায়েটিশিয়ান ড. প্রিয়াঙ্কা রোহাতগী বলেন, ‘প্যাকেটজাত মিষ্টি সিরিয়াল বা বেকারির খাবার ক্যালরিযুক্ত হলেও ফাইবার ও প্রোটিনের অভাবে এক ঘণ্টার মধ্যেই হজম হয়ে যায় এবং শরীর আবার দ্রুত শক্তির জন্য ক্ষুধা তৈরি করে।’
৩. ফাইবারের অভাব: ফাইবার বা খাদ্যআঁশ প্রাকৃতিক জেলের মতো কাজ করে খাবার হজমের গতি ধীর করে। লাল আটা, ফল বা বীজজাতীয় খাবার না খেলে খাবার দ্রুত পাকস্থলী ত্যাগ করে।
৪. দ্রুত গতিতে খাবার খাওয়া: পাকস্থলী থেকে মস্তিষ্কে পেট ভরার সংকেত পৌঁছাতে প্রায় ২০ মিনিট সময় লাগে। তাড়াহুড়ো করে খেলে মস্তিষ্ক সংকেত পাওয়ার আগেই খাবারের প্লেট খালি হয়ে যায়।
৫. পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব: গবেষণায় দেখা গেছে, দিনে ৭ ঘণ্টার কম ঘুমালে শরীরে ‘গ্রেলিন’ (ক্ষুধা হরমোন) বাড়ে এবং ‘লেপটিন’ (তৃপ্তি হরমোন) কমে যায়। ফলে সকালে শর্করার প্রতি লোভ বাড়ে।
৬. ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা: মস্তিষ্কের যে অংশ তৃষ্ণা নিয়ন্ত্রণ করে, সেটিই ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে পানির তৃষ্ণাকে অনেক সময় আমরা ক্ষুধা মনে করে ভুল করি।
৭. মানসিক চাপ: অতিরিক্ত মানসিক চাপে শরীর ‘কর্টিসল’ হরমোন তৈরি করে, যা ক্ষুধা বাড়ায় এবং মিষ্টি বা চর্বিযুক্ত খাবারের প্রতি আকর্ষণ তৈরি করে।
৮. ক্যালরির ঘাটতি বা অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম: সকালে ভারি ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রমের পর পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার না খেলে শরীর দ্রুত শক্তির ঘাটতি জানান দেয়।
যে ৪টি পুষ্টিকর কম্বিনেশন দীর্ঘক্ষণ পেট ভরিয়ে রাখবে
সবজি ও ডিমের ওমলেট: ডিম (বা তোফু স্ক্র্যাম্বল), পালং শাক, টমেটো, মাশরুম এবং ১ টুকরো লাল আটার পাউরুটি।
প্রোটিন ওটস: ওটস বা দালিয়া দুধ দিয়ে ফুটিয়ে তার ওপর ১ চামচ চিয়া সিড, কাঠবাদাম ও তাজা ফল।
ছানা/পনির ও টোস্ট: ছানা বা পনির হালকা সেঁকে শসা ও লাল আটার পাউরুটির সঙ্গে গ্রহণ।
মুগ ডাল ও দই: প্রোটিন সমৃদ্ধ মুগ ডালের প্যানকেক বা চিল্লা টকদইয়ের সঙ্গে।
দুপুর পর্যন্ত দীর্ঘক্ষণ পেট ভরিয়ে রাখার পরামর্শ
সকালে চা-কফি বা খাবারের আগে এক গ্লাস পানি পান করুন।
নাশতায় অন্তত ১৫ থেকে ২০ গ্রাম ভালো মানের প্রোটিন নিশ্চিত করুন।
জুস, মিষ্টি কফি বা অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলুন।
মনোযোগ দিয়ে অন্তত ১৫ মিনিট সময় নিয়ে ভালো করে চিবিয়ে খাবার খান।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের পরও যদি লাগাতার অতিরিক্ত ক্ষুধা অনুভূত হয়, তবে তা স্বাস্থ্যগত সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। ভারতের ম্যাক্স সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশনিস্ট চন্দা মালিক জানান, ‘অস্বাভাবিক ক্ষুধার পাশাপাশি যদি দ্রুত ওজন পরিবর্তন, অতিরিক্ত তৃষ্ণা, বার বার প্রস্রাবের বেগ বা থাইরয়েডের সমস্যা দেখা দেয়, তবে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে রক্তে শর্করা ও হরমোন পরীক্ষা করানো উচিত।’
মূলত, সকালে প্রোটিন, ভালো ফ্যাট, কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট ও ফাইবারের সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখাই পারে দীর্ঘক্ষণ শক্তি ধরে রাখতে এবং অসময়ের ক্ষুধা দূর করতে।

