ডিজিটাল যুগে শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় মা-বাবার নতুন চ্যালেঞ্জ
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬, ০১:০১ পিএম
প্রতীকী ছবি।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অতীতে মা-বাবারা সন্তানদের নিরাপত্তা বলতে রোগ-ব্যাধি, সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা পড়াশোনার ফলাফল নিয়ে চিন্তিত থাকতেন। কিন্তু বর্তমান যুগের অভিভাবকদের মোকাবিলা করতে হচ্ছে একেবারে ভিন্ন এবং অদৃশ্য এক চ্যালেঞ্জ।
শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মানসিক ক্লান্তি কিংবা বিষণ্নতা এখন আর কেবল স্কুল বা ঘরের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই; দিন-রাতের ২৪ ঘণ্টাই তা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে ডিজিটাল দুনিয়ার দ্বারা।
বর্তমান শিশুরা এমন এক পরিবেশে বড় হচ্ছে যেখানে তাদের বন্ধুত্ব, সফলতা, নিজস্ব চেহারা এবং চিন্তাভাবনা—সবকিছুই প্রতিনিয়ত অনলাইনে প্রদর্শিত হচ্ছে। সহপাঠীদের সঙ্গে ঝগড়া বা মতবিরোধ এখন আর স্কুল ছুটির সঙ্গে শেষ হয়ে যায় না। অন্যের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করার প্রতিযোগিতা চলে গভীর রাত পর্যন্ত।
মূল সমস্যা মনস্তাত্ত্বিক
সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো বলছে, প্রযুক্তি এবং মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্কটি কেবল ‘কত ঘণ্টা স্ক্রিন টাইম বা স্ক্রিনে সময় কাটানো হলো’—তার ওপর নির্ভর করে না।
‘নেচার হিউম্যান বিহেভিয়ার’-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব কিশোর-কিশোরী দুশ্চিন্তা বা বিষণ্নতায় ভোগে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের আচরণের ধরন অন্যদের চেয়ে আলাদা। অর্থাৎ, কেবল ইন্টারনেটে কাটানো সময় নয়, বরং শিশুর মানসিক স্পর্শকাতরতাই এখানে মূল বিষয়।
এ ছাড়া, অতিরিক্ত ও অপব্যবহারমূলক সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার ধীরে ধীরে ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায়, পারিবারিক সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি করে এবং দৈনন্দিন স্বাভাবিক রুটিন নষ্ট করে ফেলে।
মা-বাবারা যেসব লক্ষণ খেয়াল রাখবেন
সন্তানের মানসিক চাপ সবসময় প্রকাশ্যে আসে না। অনেক শিশু পড়ালেখায় ভালো ফল করলেও ভেতরে ভেতরে একাকীত্ব বা হীনমন্যতায় ভোগে। তবে কিছু লক্ষণ দেখা দিলে অভিভাবকদের সতর্ক হওয়া প্রয়োজন:
- অনলাইনে সময় কাটানোর পর অতিরিক্ত খিটখিটে মেজাজ বা মেজাজ হারানো
- পারিবারিক আড্ডা বা কথাবলা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া
- নোটিফিকেশন না আসলেও ঘন ঘন ফোন চেক করা
- ইন্টারনেট বা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে বাধা পেলে অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হওয়া
- পুরোনো কোনো প্রিয় শখ বা আনন্দের কাজ থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা
- রাত জেগে ফোন ব্যবহারের কারণে ঘুমের মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটা
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই লক্ষণগুলো দেখা দেওয়া মানেই শিশু মানসিকভাবে অসুস্থ—তা নয়। তবে এগুলো দীর্ঘস্থায়ী হলে বা পড়াশোনা ও পারিবারিক জীবনে প্রভাব ফেললে এড়িয়ে না গিয়ে গুরুত্ব সহকারে নেওয়া উচিত।
বন্ধুদের বিশাল তালিকা সত্ত্বেও বাড়ছে একাকীত্ব
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজার হাজার অনুসারী বা ‘ফ্রেন্ড’ থাকলেও তা প্রকৃত অর্থে একাকীত্ব দূর করতে পারে না।
সম্প্রতি শিক্ষার্থীদের ওপর করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, গভীর একাকীত্ব মানসিক স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি করে। ডিজিটাল নেটওয়ার্কের সংখ্যাগত ভার্চুয়াল বন্ধুত্বের চেয়ে অফলাইনের বাস্তব ও অর্থপূর্ণ সম্পর্কগুলোই মন ভালো রাখতে প্রধান ভূমিকা পালন করে।
অভিভাবকদের করণীয়
সমস্যা সমাধানের জন্য সন্তানকে ডিজিটাল জগত থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলা বা ডিভাইস কেড়ে নেওয়া কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। বরং একটি স্বাস্থ্যকর পারিবারিক পরিবেশ গড়ে তোলা বেশি কার্যকর। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী যা যা করা যেতে পারে:
১. খোলামেলা আলোচনা: কোনো বিচার বা সরাসরি শাসন না করে সন্তানের সঙ্গে প্রতিদিন খোলামেলা কথা বলার অভ্যাস তৈরি করুন।
২. ডিভাইস-মুক্ত সময়: খাওয়ার সময় এবং রাতে ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে ঘরে সব ধরনের ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার বন্ধ রাখুন।
৩. অফলাইন কাজে উৎসাহ: খেলাধুলা, গান শেখা, বই পড়া বা বইয়ের বাইরে নানা সামাজিক কাজে তাদের যুক্ত করুন, যা স্ক্রিনের বাইরে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে।
৪. সোশ্যাল মিডিয়ার বাস্তবতা তুলে ধরা: অনলাইনে যেসব চোখধাঁধানো ছবি বা ভিডিও দেখা যায়, তার পেছনের তৈরি করার প্রক্রিয়া এবং সেগুলো যে বাস্তব জীবন নয়—তা সন্তানদের বুঝিয়ে বলুন।
৫. পেশাদার সাহায্য: অতিরিক্ত বিষণ্নতা, সামাজিক দূরত্ব বা আচরণগত পরিবর্তন কয়েক সপ্তাহ ধরে অব্যাহত থাকলে বিলম্ব না করে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
আধুনিক যুগে সন্তানদের লালন-পালনের ধারণাতেও পরিবর্তন এসেছে। সন্তান কতক্ষণ অনলাইনে আছে—শুধু এই প্রশ্ন না করে, তারা শান্তিতে ঘুমাচ্ছে কিনা, বন্ধুদের মাঝে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছে কিনা, কিংবা ভয় ছাড়া মা-বাবার কাছে মন খুলে কথা বলতে পারছে কিনা—সেই প্রশ্নগুলো করাই এখন সময়ের দাবি।
ডিজিটাল যুগের নানা চ্যালেঞ্জের মাঝে সন্তানদের মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করাই আজকের মা-বাবার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

