কর্মক্ষেত্রে অতি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক শান্তি ও নিরাপত্তা, জানুন কেন
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৪১ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আধুনিক কর্মপরিবেশ, আকর্ষণীয় বেতন কিংবা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থাকলেই কর্মীরা স্বস্তিতে কাজ করতে পারবেন—এমন ধারণা এখন অনেকটাই বদলে গেছে। কর্মীরা যদি কর্মস্থলে নিজের মতামত প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ করেন, ভুল করার ভয়ে থাকেন বা মানসিক চাপের বিষয়টি খোলাখুলি বলতে না পারেন, তাহলে তা তাদের কর্মদক্ষতা ও প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে বিশ্বজুড়ে কর্মক্ষেত্রে মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি দিন দিন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানসিক নিরাপত্তা বলতে এমন একটি কর্মপরিবেশকে বোঝায়, যেখানে কর্মীরা নির্ভয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরতে পারেন, প্রশ্ন করতে পারেন, ভুল স্বীকার করতে পারেন এবং প্রয়োজনে সহায়তা চাইতে দ্বিধা বোধ করেন না। এমন পরিবেশ কর্মীদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর পাশাপাশি দলগত কাজ ও প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক সাফল্যেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
করোনা মহামারির পর কর্মজীবনে মানসিক সুস্থতার গুরুত্ব আরও বেড়েছে। দীর্ঘ সময়ের অনিশ্চয়তা, চাকরি নিয়ে উদ্বেগ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং অতিরিক্ত চাপ মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যে গভীর প্রভাব ফেলেছে। তাই এখন অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মীদের শারীরিক নিরাপত্তার পাশাপাশি মানসিক সুস্থতাকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মানসিকভাবে সুস্থ কর্মীরা সাধারণত বেশি উৎপাদনশীল হন এবং কর্মস্থলে ইতিবাচক পরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়তা করেন। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি শারীরিক সুস্থতার ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলে।
গুগলের 'প্রজেক্ট অ্যারিস্টটল' গবেষণায় দেখা গেছে, সফল কর্মদলের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো মানসিক নিরাপত্তা। যেসব দলে সদস্যরা নির্ভয়ে মতামত দিতে পারেন এবং ভুলের জন্য অপমানিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে না, সেসব দল নতুন ধারণা তৈরি, সমস্যা সমাধান এবং পারস্পরিক আস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি সফল।
এছাড়া হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক অ্যামি এডমন্ডসনের গবেষণায়ও উঠে এসেছে, কর্মীরা যেখানে নির্ভয়ে মতামত প্রকাশ করতে পারেন, সেখানে ভুল দ্রুত শনাক্ত হয় এবং তা থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এর ফলে প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবনী সক্ষমতা ও কর্মদক্ষতা আরও বাড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভুল আড়াল করার সংস্কৃতির পরিবর্তে ভুল থেকে শেখার সংস্কৃতি গড়ে তোলাই প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য বেশি কার্যকর।
মানসিকভাবে নিরাপদ কর্মপরিবেশ গড়ে তুলতে কর্মীদের মতামত গুরুত্বের সঙ্গে শোনা, সম্মানজনক আচরণ নিশ্চিত করা, ভুলকে শেখার অংশ হিসেবে গ্রহণ করা, মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রশিক্ষণ ও কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা রাখা, প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ সহায়তা নিশ্চিত করা এবং কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে উৎসাহ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, সহকর্মীদের আন্তরিক সহযোগিতা ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যও কর্মীদের মানসিক চাপ কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। এ কারণেই অনেক প্রতিষ্ঠান দলীয় আয়োজন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পারিবারিক মিলনমেলা ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে কর্মীদের মধ্যে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার উদ্যোগ নিচ্ছে।
বর্তমানে প্রযুক্তিনির্ভর কর্মব্যবস্থার কারণে অফিসের নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পরও অনেক কর্মী ই-মেইল, ফোন বা অনলাইন সভার মাধ্যমে কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। এতে পর্যাপ্ত বিশ্রাম ব্যাহত হয় এবং বার্নআউট বা অতিরিক্ত মানসিক ক্লান্তির ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা এ পরিস্থিতি এড়াতে নিয়মিত বিরতি নেওয়া, পর্যাপ্ত ঘুম, শরীরচর্চা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো এবং প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিকভাবে সুস্থ কর্মীরা বেশি আত্মবিশ্বাসী, দায়িত্বশীল ও সৃজনশীল হন। এর ফলে কর্মী পরিবর্তনের হার কমে, অনুপস্থিতি হ্রাস পায় এবং প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি কর্মীদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক কর্মপরিবেশে তাই শুধু দক্ষ জনবল নয়, তাদের মানসিক সুস্থতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও প্রতিষ্ঠানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কারণ কর্মীরা যখন সম্মান, আস্থা ও সহযোগিতাপূর্ণ পরিবেশে কাজ করার সুযোগ পান, তখন তারা যেমন নিজের সেরাটা দিতে পারেন, তেমনি প্রতিষ্ঠানও টেকসই সাফল্যের পথে এগিয়ে যায়।

