কোলেস্টেরল নিয়ে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা, জানুন আসল সত্য
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩০ এএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আমাদের মধ্যে অনেকেই জানেন যে, উচ্চ কোলেস্টেরল স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকে বাসিন্দাদের ওপর একটি জরিপ চালানো হয় যেখানে খুব কম মানুষই বলতে পারেন কোলেস্টেরল আসলে কী বা হৃদস্বাস্থ্যের সঙ্গে এর সম্পর্কটা কী। মেমোরিয়ালকেয়ার হার্ট অ্যান্ড ভাস্কুলার ইনস্টিটিউটের কার্ডিওলজিস্ট ডা. রবার্ট গ্রিনফিল্ড বিষয়টি নিয়ে বলেন, কোলেস্টেরল ক্ষতিকর কিছু নয়। এটি শরীরের একটি স্বাভাবিক উপাদান বা নিরীহ সহযোগী, যা আমাদের বর্তমান জীবনযাত্রায় ভুলভাবে ব্যবহৃত বা পরিচালিত হচ্ছে।
কোলেস্টেরল শরীরের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং পরিচিত একটি উপাদান হওয়া সত্ত্বেও, এটি নিয়ে নানা ধরনের ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত রয়েছে।
কোলেস্টেরল কী?
কোলেস্টেরল এক ধরণের মোমের মতো চর্বি। অ্যামেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যানুযায়ী, শরীরে লিভার নিজেই কোলেস্টেরল তৈরি করে। শরীরের স্বাভাবিক কার্যকারিতার জন্য কোলেস্টেরল প্রয়োজন। তবে সব কোলেস্টেরল সমান নয়। জনস হপকিন্স মেডিসিনের অ্যাডভান্সড লিপিড ডিসঅর্ডারস প্রোগ্রামের পরিচালক ডা. সেথ শে মার্টিন ব্যাখ্যা করেন যে, কোলেস্টেরল এমন একটি উপাদান যা শরীরকে কোষের পর্দা, বিভিন্ন হরমোন এবং ভিটামিন ডি তৈরিতে সহায়তা করে। উপকারী কোলেস্টেরল, যা এইচডিএল বা হাই-ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন নামে পরিচিত। এটি রক্তপ্রবাহ থেকে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল পরিষ্কার করে। অন্যদিকে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল, এলডিএল বা লো-ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন নামে পরিচিত যা ধমনীর দেয়ালে জমা হতে থাকে এবং এমন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে যার ফলে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি তৈরি হয়।
ভুল ধারণা রয়েছে: ডিম কোলেস্টেরলের জন্য ক্ষতিকর
সুস্থ ও সচল শরীরের জন্য কোলেস্টেরলের প্রয়োজন রয়েছে। আমাদের অনেকেরই ধারণা, কোলেস্টেরলজনিত কোনো সমস্যা থাকলে তার মূল কারণ হলো আমাদের খাদ্যাভ্যাস। তবে মায়ো ক্লিনিকের মতে, সকালের নাস্তায় অনায়াসেই ডিম খাওয়া যেতে পারে। এমনকি একটি চীনা গবেষণায় দেখা গেছে, এটি হৃদপিণ্ডের সুরক্ষায়ও ভূমিকা রাখতে পারে। হেলথলাইন এর তথ্য অনুযায়ী, ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘস্থায়ী কোনো রোগ না থাকলে, গবেষণায় দেখা গেছে যে ডিমের মতো উচ্চ কোলেস্টেরলযুক্ত খাবার রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রার ওপর খুব সামান্যই প্রভাব ফেলে।
আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের ক্রনিক ডিজিজ প্রিভেনশন (দীর্ঘস্থায়ী রোগ প্রতিরোধ) বিভাগের পরিচালক ডা. কেট কার্লি বলেন, আমরা খাবার হিসেবে যে পরিমাণ কোলেস্টেরল গ্রহণ করি, তা আসলে আমাদের শরীরের কোলেস্টেরলের মাত্রার ওপর খুব একটা প্রভাব ফেলে না। এর কারণ হলো, শরীর নিজেই কোলেস্টেরল তৈরি করে। পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন, শরীর কোলেস্টেরল উৎপাদন অব্যাহত রাখে।
ভুল ধারণা: বেশি ওজন থাকলেই কোলেস্টেরল বেশি, অন্যথায় না
জনস হপকিন্স মেডিসিন নিশ্চিত করেছে যে, ওজন কমানো, এমনকি মাত্র ১০ পাউন্ড ওজন কমানোও আপনার শরীরে লো-ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন বা খারাপ কোলেস্টেরল এবং ট্রাইগ্লিসারাইডের (রক্তে থাকা এক ধরণের চর্বি) মাত্রা কমাতে সাহায্য করতে পারে। অনেক সময় কেবল খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনলেই এর সুফল পাওয়া যায়। তবে কারও কারও ক্ষেত্রে লিপিড বা কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে আনাটা বেশ জটিল বিষয় হতে পারে। অনেক সময় ওজন এক্ষেত্রে কোনো বড় বিষয়ই নয়। কে হেলথের কার্ডিওলজিস্ট ডা. এডো পাজ-এর মতে, আপনার ওজন স্বাভাবিক বা স্বাস্থ্যকর হলেও কোলেস্টেরলের মাত্রা অস্বাভাবিক হতে পারে।
ইয়েল মেডিসিনের তথ্য অনুযায়ী, খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন এবং নিয়মিত শরীরচর্চা বা ব্যায়াম অনেকের ক্ষেত্রেই সহায়ক হতে পারে। কিন্তু যদি জন্মগত কোনো জিনগত পরিবর্তনের (মিউটেশন) কারণে আপনার শরীরে এলডিএল কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি থাকে, তবে কেবল জীবনযাত্রার পরিবর্তন যথেষ্ট হবে না। বংশগত এই সমস্যাটিকে বলা হয় ফ্যামিলিয়াল হাইপারকোলেস্টেরোলেমিয়া। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ২০০ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে একজনের এই সমস্যাটি রয়েছে। অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে এফ এইচের কোনো দৃশ্যমান লক্ষণ দেখা যায় না। বয়স বাড়ার সাথে সাথে সবারই কোলেস্টেরলের মাত্রা কিছুটা বাড়তে থাকে। কিন্তু যাদের এফএইচ রয়েছে, তাদের এলডিএলের মাত্রা শুরু থেকেই বেশি থাকে এবং সময়ের সাথে সাথে তা আরও বাড়তে থাকে।
ভুল ধারণা: কোলেস্টেরল বেশি হলে কিছুই করার নেই
উচ্চ কোলেস্টেরল ধরা পড়লে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তবে খাদ্যাভাস ব্যায়ামের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। যদিও উচ্চ কোলেস্টেরলের ক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাসই একমাত্র বা প্রধান কারণ নয়, তবুও খাবার ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনে কোলেস্টেরলের মাত্রায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটানো সম্ভব।
ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের পরামর্শ অনুযায়ী, খাদ্যতালিকা থেকে স্যাচুরেটেড ফ্যাট (সম্পৃক্ত চর্বি), চিনি ও ময়দা যথাসম্ভব বাদ দিন। এর পরিবর্তে প্রচুর আঁশযুক্ত খাবার ও বাদাম অন্তর্ভুক্ত করুন। শরীরের বাড়তি ওজন (৫-১০ পাউন্ড বা প্রায় ২.৩-৪.৫ কেজি) কমান এবং নিয়মিত শরীরচর্চার মাধ্যমে শরীরকে সচল রাখুন। ধূমপানের অভ্যাস থাকলে তা অবশ্যই বর্জন করুন। কারণ ধূমপান ধমনী সরু করে দিতে পারে এবং হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়।
ভুল ধারণা: শিশুদের কোলেস্টেরল নিয়ে চিন্তার কিছু নেই
সাধারণত ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়সী ব্যক্তিদের মধ্যে উচ্চ কোলেস্টেরলের সমস্যা ধরা পড়ে। তবে প্রিভেনশনের তথ্য অনুযায়ী, ৬ থেকে ১৯ বছর বয়সী তরুণ ও শিশুদের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের উচ্চ কোলেস্টেরলের সমস্যা রয়েছে।
টেক্সাসের ডালাসে অবস্থিত চিলড্রেনস হেলথের পেডিয়াট্রিক এন্ডোক্রিনোলজিস্ট এবং ইউটি সাউথওয়েস্টার্ন মেডিকেল সেন্টারের সহকারী অধ্যাপক ডা. নিবেদিতা পাটনি বলেন, শিশুদের উচ্চ কোলেস্টেরলের অন্যতম প্রধান কারণ হলো স্থূলতা। স্থূলতায় আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৪৩ শতাংশেরও বেশি শিশুর উচ্চ কোলেস্টেরল থাকে, যেখানে স্থূল নয় এমন শিশুদের ক্ষেত্রে এই হার ১৪ শতাংশেরও কম।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের তুলনায় পুরুষরা বেশি কোলেস্টেরলের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। কারণ, নারীদের সন্তান জন্মদানের সময় শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা বেশি থাকায় তাদের এইচডিএল বা ভালো কোলেস্টেরলের মাত্রা তুলনামূলক বেশি থাকে, যা নারীদের মধ্য বয়স পর্যন্ত হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
সূত্র: মেডিকেল নিউজ টুডে।

