সন্তানের বয়ঃসন্ধিকালে কেমন আচরণ করবেন?
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:২৫ পিএম
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
শিশু থেকে কৈশোরে পা রাখার সময় শরীর ও মনে নানা পরিবর্তন আসে। দ্রুত উচ্চতা বাড়ার পাশাপাশি বদলে যায় চিন্তা ভাবনা, আচরণ ও আবেগ। এ সময় নিজের পছন্দ অপছন্দ ও সিদ্ধান্ত নিয়ে সচেতন হয়ে ওঠে কিশোর-কিশোরীরা।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী- বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সি কিশোর- কিশোরী রয়েছে, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২২ শতাংশ। তবে এ বিশাল জনগোষ্ঠীর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য এখনো অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায় না।
কখন শুরু হয় বয়ঃসন্ধিকাল?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ১০ বছর থেকে ১৯ বছর বয়সের মাঝামাঝি সময় হলো কৈশোর। এই সময়ের মধ্যেই বয়সঃসন্ধিকাল শুরু হয়। তবে সবার ক্ষেত্রে এক নয়। অনেকের ১৯ বছরের পরও বয়ঃসন্ধির ব্যাপ্তি থাকতে পারে। এটি মূলত বিভিন্ন দেশ, পরিবেশ, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যর ওপর নির্ভর করে।
তবে সাধারণত মেয়েদের ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১৩ বছর এবং ছেলেদের ক্ষেত্রে ১১ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে বয়ঃসন্ধিকালের লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
শারীরিক কী কী পরিবর্তন হয়?
এ সময়ে মেয়েদের উচ্চতা দ্রুত বাড়ে। শরীরের বিভিন্ন অংশে শারীরিক পরিবর্তন আসে, বাহুমূল ও যৌনাঙ্গে লোম গজায় এবং ঋতুস্রাব শুরু হয়। এ সময়ে ছেলেদেরও উচ্চতা দ্রুত বাড়ে। গলার স্বর ভারী হয়, কাঁধ চওড়া হয়, পেশি শক্ত ও মুখে দাড়ি-গোঁফ ওঠে। শরীরের বিভিন্ন অংশে লোম গজানোর পাশাপাশি ঘামও বেশি হয়। ঘুমের সময় ছেলেদের বীর্যস্খলন হয় এটি বয়ঃসন্ধিরই একটি লক্ষণ। এ সময়ে ছেলে-মেয়ে উভয়ের প্রতি আকর্ষণ বোধ করে।
মানসিক পরিবর্তন ও আত্মপরিচয়ের বিকাশ
মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেঘনা সরকার বলেন, বয়ঃসন্ধিকালে ছেলে-মেয়েদের মধ্যে আত্মপরিচয় গড়ে উঠতে শুরু করে। তারা নিজের পছন্দ-অপছন্দ, সিদ্ধান্ত, ভবিষ্যৎ ও জীবন সম্পর্কে নিজস্ব ধারণা তৈরি করতে শেখে।
তিনি বলেন, শৈশবে তারা বাবা-মা যা বলতো, সেটাই করতো এবং সেটাই ভাবতো। কিন্তু বয়ঃসন্ধির সময় তারা স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শুরু করে। তারা কী পড়বে, কী খাবে, কার সঙ্গে মিশবে-এসব বিষয়ে নিজের সিদ্ধান্ত নিতে চায়।
ডা. মেঘলা সরকারের মতে, এ পরিবর্তনের কারণে অনেক সময় সন্তান ও পরিবারের মধ্যে দুরত্ব তৈরি হতে পারে। তবে এটি মানসিক বিকাশেরই অংশ। তিনি আরও বলেন, কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে ভালো-মন্দ বোঝার একটি ধারণা তৈরি হয়, যদিও সেটি সব সময় পরিপক্ব হয় না।
আবেগের ওঠানামা স্বাভাবিক
বয়ঃসন্ধিকালে হরমোনের পরিবর্তনের কারণে আবেগের তীব্রতা বেড়ে যেতে পারে। অনেক সময় মুড দ্রুত পরিবর্তন হয়। কখনো খুব আনন্দ, আবার কখনো মন খারাপ বা রাগান্বিত দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সময়ে সৃজনশীলতা, কৌতূহল ও নতুন কিছু শেখার কাজকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে পারলে ভবিষ্যতে তা ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সন্তানকে কীভাবে সামলাবেন?
ডা. মেঘনা সরকার মনে করেন, বয়ঃসন্ধিকালে সন্তানকে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ না করে তার অনুভূতি ও মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তিনি বলেন, এ সময়ে ছেলে-মেয়েরা বাবা-মায়ের চেয়ে বন্ধুদের মাধ্যমে বেশি প্রভাবিত হয়। তাই বাবা-মায়ের উচিত ধৈর্য না হারিয়ে তাদের আচরণ ও মতামতকে সম্মান করা।
ব্যক্তিগত গোপনীয়তার গুরুত্ব
বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়ঃসন্ধিকালে সন্তানদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। ডা. মেঘনা সরকার বলেন, সন্তানদের ধীরে ধীরে স্বাধীনতা দিতে হবে। তবে তারা কী করছে, কার সঙ্গে মিশছে সেটা অভিবাবকদের সচেতনভাবে নজরে রাখতে হবে।
যৌন শিক্ষা ও প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়ঃসন্ধিকালে সঠিক যৌন শিক্ষা বা প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে জ্ঞান থাকা অত্যন্ত জরুরি। ডা. মেঘনা সরকার বলেন, শরীরে পরিবর্তন, বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ- এসব বিষয়ে কিশোর কিশোরীদের সঠিক তথ্য দেওয়া দরকার; যাতে তারা বিভ্রান্ত না হয়।
পুষ্টি ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন
বয়ঃসন্ধিকালে দ্রুত শারীরিক বৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টির প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞরা এ বয়সে প্রোটিন, আয়োডিন, আয়রন, ক্যালসিয়াম, জিংক ও অন্যান্য পুষ্টি উপদানসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেন।
শাক-সবজি, ফলমূল, ডাল, ডিম, দুধ, মাছ ও মাংস প্রতিদিনকার খাদ্যতালিকায় রাখা উচিত। এছাড়া পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, নিয়মিত খেলাধুলা, ব্যায়াম করা এবং সৃজনশীল কাজে যুক্ত থাকা কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক বিকাশে সহায়তা করে। কাজেই বয়ঃসন্ধি কোনো সমস্যা নয়, এটি জীবনের একটি স্বাভাবিক ধাপ।


