ওজন কমানোর চেষ্টা থেকে মানসিক ব্যাধি, কারা আক্রান্ত হতে পারেন
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:০৬ পিএম
প্রতীকী ছবি।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
খাদ্যাভ্যাসের ব্যাধি বা ‘ইটিং ডিজঅর্ডার’-এ আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রায়ই একাকী বোধ করেন। এই একাকীত্ব বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতা সমস্যাটিকে আরও বাড়িয়ে দেয়, যার ফলে আক্রান্তদের পক্ষে মন খুলে কথা বলা বা সাহায্য চাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
ভুক্তভোগী ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে এই বাস্তবতা উঠে এসেছে।
যুক্তরাজ্যের দ্বীপ অঞ্চল জার্সির ৩০ বছর বয়সি তরুণী অ্যানা বেনেট জানান, সুস্থ হয়ে ওঠার পথে সাহায্য চাওয়াটা সবচেয়ে কঠিন মনে হলেও, এটিই সেরে ওঠার মূল চাবিকাঠি।
২০২০ সালে ওজন কমানোর চেষ্টা করতে গিয়ে ‘বিঞ্জ ইটিং’ (নিয়ন্ত্রণহীন অতিরিক্ত খাওয়ার মানসিক সমস্যা)-এ আক্রান্ত হন অ্যানা। এরপর তিনি স্থানীয় সহায়তা সংস্থা ‘জার্সি ইটিং ডিজঅর্ডারস সাপোর্ট’-এর শরণাপন্ন হন। দীর্ঘ সময় ধরে সংস্থাটি থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও পরামর্শ পাওয়ার পর, সম্প্রতি তাকেই সংস্থাটির প্রথম অফিশিয়াল ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
অ্যানা জানান, ২০২০ সালে স্বাভাবিকভাবে ওজন কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরেই তার খাবারের অভ্যাসে জটিলতা তৈরি হয়।
শুরুতে একে একটি সাধারণ ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার পরিবর্তন মনে হলেও ধীরে ধীরে খাবারের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি জটিল হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে এটি মারাত্মক ‘বিঞ্জ ইটিং’ সমস্যায় রূপ নেয়।
তিনি স্বীকার করেন, এর আগে অতিরিক্ত কম খাওয়া বা জোর করে বমি করার মতো চরম উপসর্গ ছাড়া ইটিং ডিজঅর্ডার সম্পর্কে তার তেমন কোনো ধারণাই ছিল না।
পরে এক বন্ধুর সাহসে তিনি ‘জার্সি ইটিং ডিজঅর্ডারস সাপোর্ট’-এর প্রতিষ্ঠাতা ক্যারেন ডিঙ্গেলের সঙ্গে দেখা করেন।
অ্যানা বলেন, ‘প্রথম দিকে অচেনা মানুষদের সাপোর্ট গ্রুপে যেতে আমার ভীষণ ভয় করছিল। ভেবেছিলাম সবাই বুঝি আমাকে নিয়ে সমালোচনা করবে। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর আমার অনুভূতি পুরোপুরি বদলে যায়; মনে হয়েছিল যেন এক নতুন পরিবার খুঁজে পেয়েছি।’
সুস্থতার পথ সহজ নয়
অ্যানার স্বাভাবিক জীবনে ফেরার লড়াইয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় পারিবারিক ট্র্যাজেডি।
২০২৫ সালের আগস্টে তার মা ক্যানসারে মারা যান। এর মাত্র চার মাস পর, ডিসেম্বরে রক্তের মারাত্মক সংক্রমণে তার বাবাও মৃত্যুবরণ করেন।
অ্যানার মতে, জীবনের এসব বড় আঘাত সুস্থ হওয়ার প্রক্রিয়ায় কঠিন ধাক্কা দেয়। ফলে মানুষ আবারও পুরোনো মানসিক নেতিবাচক অভ্যাসে ফিরে যেতে পারে। তিনি বলেন, ‘সুস্থ হওয়ার পথটি সবসময় সহজ হয় না। দীর্ঘ দিন ভালো থাকার পরও জীবন পরিবর্তনকারী কোনো ঘটনায় মানুষ আবার আগের অবস্থানে ফিরে যেতে পারে।’
সংস্থাটির অ্যাম্বাসেডর হিসেবে অ্যানা এখন সাধারণ মানুষকে ইটিং ডিজঅর্ডার সম্পর্কে সচেতন করতে চান।
তার মতে, নিজে থেকে না খুঁজলে অনেকেই জানেন না যে বিপদে কোথায় সাহায্য পাওয়া যাবে। তার মতে, সাধারণ মানুষকে নিয়মিত মনে করিয়ে দেওয়া দরকার যে তারা একা নন এবং সহায়তার হাত বাড়াতে অনেক প্রতিষ্ঠান প্রস্তুত রয়েছে।
একই সঙ্গে কারা এই ব্যাধিতে আক্রান্ত হন—তা নিয়ে সমাজে থাকা ভুল ধারণাগুলো ভাঙতেও তিনি কাজ করছেন।
আক্রান্ত হতে পারেন যেকোনো মানুষ
অনেকেই মনে করেন, ইটিং ডিজঅর্ডার শুধু নির্দিষ্ট বয়স, শারীরিক গঠন বা বিশেষ শ্রেণি-পেশার মানুষেরই হয়। কিন্তু অ্যানা জানান, এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা।
বাস্তবে যেকোনো বয়সের বা চেহারার মানুষের মধ্যে এই সমস্যা দেখা দিতে পারে। উপরন্তু, এর লক্ষণগুলো সবসময় বাইরে থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় না। অনেকে হয়তো মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার পর বাহ্যিকভাবে তা প্রকাশ করেন, আবার অনেকে অত্যন্ত স্বাভাবিক জীবনযাপন করেও গোপনে কঠিন লড়াই চালিয়ে যান।
তিনি বিশ্বাস করেন, এই বিভ্রান্তিগুলো দূর করতে পারলে ভুক্তভোগীদের মনে একাকীত্ব কমবে এবং সাহায্য চাওয়া সহজ হবে।
পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আগেই সাহায্যের হাত বাড়ান
প্রথমবার সাহায্য চাইতে নিজের যে ভীতি কাজ করেছিল, তা তুলে ধরে অ্যানা জানান, বিপদের দিনে এই সাপোর্ট গ্রুপকে তিনি সবসময় পাশে পেয়েছেন।
খাবারের সঙ্গে জটিল মানসিক সম্পর্কে ভুগতে থাকা মানুষদের উদ্দেশে তার সহজ বার্তা—অবস্থা আরও গুরুতর হওয়ার জন্য অপেক্ষা করবেন না।
কোনো বিশ্বস্ত মানুষের কাছে মনের কথা বলা, সঠিক তথ্য জানা কিংবা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রাথমিক অবস্থায় কঠিন মনে হতে পারে। তবে সুস্থ হতে চাইলে সাহায্য চাওয়া কোনো দুর্বলতা নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত সাহসী পদক্ষেপ।

