খাবারের আগে অলিভ অয়েল খেলে রক্তে শর্করা বাড়ে ধীরে, বলছে গবেষণা
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৩৯ পিএম
খাবার খাওয়ার সময় কোনটি আগে খাচ্ছেন, তার ওপর নির্ভর করতে পারে রক্তে শর্করার মাত্রা।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
খাবার খাওয়ার সময় কোনটি আগে খাচ্ছেন, তার ওপরও নির্ভর করতে পারে রক্তে শর্করার মাত্রা। নতুন এক গবেষণায় ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার আগে অলিভ অয়েল গ্রহণ করলে রক্তে শর্করা বৃদ্ধির প্রাথমিক প্রবণতা কমতে পারে। এ ক্ষেত্রে হজমপ্রক্রিয়া, বিভিন্ন হরমোন এবং স্নায়ুতন্ত্রের পারস্পরিক কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
খাবার খাওয়ার পর রক্তে শর্করার মাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়া প্রতিরোধ করা ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আগের কয়েকটি মানবদেহভিত্তিক গবেষণায় দেখা গেছে, কার্বোহাইড্রেট গ্রহণের আগে শাকসবজি, প্রোটিন বা চর্বিযুক্ত খাবার খেলে রক্তে শর্করার আকস্মিক বৃদ্ধি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতে পারে। অর্থাৎ, খাবারের ধরন পুরোপুরি বাদ না দিয়েও খাওয়ার ক্রম পরিবর্তনের মাধ্যমে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলা সম্ভব হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এ ধরনের প্রভাবের পেছনে প্রধানত দুটি প্রক্রিয়া কাজ করে। প্রথমত, পাকস্থলী থেকে খাবার ক্ষুদ্রান্ত্রে যাওয়ার গতি ধীর হয়ে যায়। ফলে খাবার থেকে গ্লুকোজ রক্তে প্রবেশ করতে তুলনামূলক বেশি সময় নেয়। দ্বিতীয়ত, ইনক্রেটিন নামের কিছু হরমোনের নিঃসরণ বাড়ে। এসব হরমোনের মধ্যে রয়েছে জিএলপি-১, যা রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
তবে অন্ত্র ও অগ্ন্যাশয় থেকে নিঃসৃত হরমোন কীভাবে স্নায়ুতন্ত্রের সঙ্গে সমন্বয় করে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে, তা এতদিন পুরোপুরি স্পষ্ট ছিল না। বিষয়টি বুঝতে আন্তর্জাতিক একদল গবেষক গ্লুকোজ গ্রহণের আগে ও পরে চর্বিজাতীয় খাবার খাওয়ার প্রভাব পরীক্ষা করেন।
গবেষণাটির সংশ্লিষ্ট লেখক ও জাপানের কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডাইসুকে ইয়াবে বলেন, দৈনন্দিন জীবনে সহজে অনুসরণ করা যায়—এমন খাদ্যাভ্যাস নিয়ে তাদের দল দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। তার মতে, খাবার খাওয়ার ক্রম পরিবর্তনের পদ্ধতিটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে কোনো নির্দিষ্ট খাদ্যগোষ্ঠী বাদ না দিয়েই খাওয়ার অভ্যাসে পরিবর্তন আনা যায়।
যেভাবে অলিভ অয়েলের প্রভাব পরীক্ষা করা হয়
গবেষণায় ইঁদুরের ওপর কয়েকটি পরীক্ষা চালানো হয়। প্রথমে ইঁদুরগুলোকে তিনটি দলে ভাগ করা হয়। প্রথম দলকে পানি পান করানোর পর গ্লুকোজ দেওয়া হয়। দ্বিতীয় দলকে প্রথমে অলিভ অয়েল দেওয়ার ১৫ মিনিট পর গ্লুকোজ খাওয়ানো হয়। আর তৃতীয় দলকে প্রথমে গ্লুকোজ দেওয়ার ১৫ মিনিট পর অলিভ অয়েল দেওয়া হয়।
এরপর গবেষকেরা ইঁদুরগুলোর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা এবং ইনসুলিন, গ্লুকাগন, জিআইপি ও জিএলপি-১সহ রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখা বিভিন্ন হরমোনের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন।
এ ছাড়া পাকস্থলী থেকে খাবার কত দ্রুত ক্ষুদ্রান্ত্রে যাচ্ছে, তা নির্ণয় করতে প্যারাসিটামল ব্যবহার করা হয়। মুখে ওষুধটি দেওয়ার পর রক্তে এর উপস্থিতি পরিমাপ করে পাকস্থলী খালি হওয়ার গতি সম্পর্কে ধারণা নেন গবেষকেরা।
পরবর্তী পর্যায়ে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ইঁদুর এবং জিএলপি-১ হরমোনের সংকেত গ্রহণে প্রয়োজনীয় রিসেপ্টরবিহীন ইঁদুরের ওপরও পরীক্ষা চালানো হয়। পাশাপাশি, নির্দিষ্ট হরমোনের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া, ডায়াফ্রামের নিচে দুই পাশের ভেগাস স্নায়ুর সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং বিভিন্ন ধরনের খাদ্যচর্বির প্রভাবও পরীক্ষা করেন তারা।
ভেগাস স্নায়ু মস্তিষ্ক ও পরিপাকতন্ত্রের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হজমপ্রক্রিয়া এবং হরমোন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণেও এই স্নায়ুর ভূমিকা রয়েছে।
অলিভ অয়েল আগে খেলে রক্তে শর্করা বৃদ্ধির গতি কমে
পরীক্ষায় দেখা যায়, গ্লুকোজ গ্রহণের আগে অলিভ অয়েল খাওয়ানো ইঁদুরগুলোর রক্তে শর্করার প্রাথমিক বৃদ্ধি তুলনামূলক কম ছিল। অন্যদিকে, গ্লুকোজ দেওয়ার পরে অলিভ অয়েল গ্রহণ করলে একই ধরনের প্রভাব দেখা যায়নি।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গ্লুকোজের আগে অলিভ অয়েল গ্রহণ করলে পাকস্থলী খালি হওয়ার গতি ধীর হয়ে যায়। ফলে গ্লুকোজ পাকস্থলী থেকে ক্ষুদ্রান্ত্রে পৌঁছাতে বেশি সময় নেয়। এর ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা কমতে পারে।
একই সময়ে গ্লুকাগন, জিআইপি ও জিএলপি-১সহ কয়েকটি হরমোনের প্রাথমিক নিঃসরণও বেড়ে যায়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এবং শরীরে ইনসুলিনের ঘাটতি থাকা ইঁদুরের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রভাব দেখা গেছে। এতে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, ইনসুলিনের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হলেও এই প্রক্রিয়া কিছুটা কার্যকর থাকতে পারে।
রক্তে শর্করা বাড়ায় যে হরমোন, সেটিই কমাতে পারে বৃদ্ধির প্রবণতা
গবেষণার অন্যতম চমকপ্রদ ফলাফল পাওয়া গেছে গ্লুকাগন হরমোনের ভূমিকা বিশ্লেষণ করে। সাধারণত এই হরমোন যকৃৎকে সঞ্চিত গ্লুকোজ রক্তে ছাড়তে উদ্দীপিত করে, ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়তে পারে।
কিন্তু গবেষকেরা দেখেছেন, গ্লুকাগনের সংকেত কার্যক্রম বন্ধ করলেও গ্লুকোজের আগে অলিভ অয়েল গ্রহণের ফলে রক্তে শর্করা বৃদ্ধির যে প্রবণতা কমে, তা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। একইভাবে শুধু জিএলপি-১-এর সংকেত কার্যক্রম বন্ধ করলেও এ উপকারিতা দূর হয়নি।
তবে গ্লুকাগন ও জিএলপি-১—দুটি হরমোনের সংকেত কার্যক্রম একসঙ্গে বন্ধ করা হলে রক্তে শর্করা বৃদ্ধির প্রবণতা কমানোর প্রভাব দুর্বল হয়ে পড়ে।
গবেষকদের মতে, ফলাফলটি ইঙ্গিত দেয় যে গ্লুকাগন ও জিএলপি-১ পরস্পরের সঙ্গে সমন্বয় করে খাবার গ্রহণের পর রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থাৎ, গ্লুকাগন সাধারণত রক্তে শর্করা বাড়ানোর সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এটি এমন একটি জটিল প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে, যা খাবারের পর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা দ্রুত বেড়ে যাওয়া সীমিত করতে সহায়তা করে।
তবে গবেষণাটি ইঁদুরের ওপর পরিচালিত হওয়ায় মানুষের ক্ষেত্রে অলিভ অয়েল খাওয়ার একই প্রভাব নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তাই শুধু অলিভ অয়েল গ্রহণের মাধ্যমে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

