কাজের চাপে ক্লান্ত অথচ বিশ্রাম নিতে গেলেই অপরাধবোধ কাজ করে? কারণ জানালেন মনোবিদ
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১২ এএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
একটানা কাজ করে যাওয়া বা অতিরিক্ত উৎপাদনশীলতাকে সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে উদযাপন করার এই যুগে বিশ্রাম নেওয়া যেন এক অপরাধ। অনেক করপোরেট ব্যক্তিত্ব যখন সপ্তাহে ৬০ থেকে ৬২ ঘণ্টা কাজ করার পক্ষে মত দেন, তখন কাজের চাপে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করা বা একটু জিরিয়ে নেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
অথচ ক্লান্তি সত্ত্বেও কেন আমাদের মন সহজে শান্ত হতে চায় না এবং বিশ্রামের সময় কেন এক অদ্ভুত অপরাধবোধ কাজ করে—তা নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে বিস্তারিত জানিয়েছেন ভারতের ক্যাডাবামস হসপিটালের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ডা. অনিতা ভারতন।
বিশ্রাম নেওয়ার সময় আমাদের কেন অপরাধবোধ হয়?
ডা. ভারতনের মতে, যখন কেউ তার আত্মমর্যাদাকে সামগ্রিক সুস্থতার পরিবর্তে কেবল উৎপাদনশীলতার সঙ্গে মেলাতে শুরু করে, তখনই বিশ্রাম অপরাধবোধের জন্ম দেয়। কেউ যদি ছোটবেলা থেকেই শুনে বড় হন যে ‘ব্যস্ত থাকা মানেই সফল হওয়া’ আর ‘বিশ্রাম নেওয়া মানেই অলসতা’, তবে তার অবচেতন মনে এই বিশ্বাস গেঁথে যায় যে, বিশ্রাম পাওয়ার জন্য তাকে ক্রমাগত কিছু না কিছু করে যেতে হবে। এর ফলে এক সময় শরীর ক্লান্ত থাকলেও মন হিসেব করতে থাকে—আজ যথেষ্ট কাজ করা হলো কিনা।
মনস্তাত্ত্বিক কারণসমূহ
অসংগঠিত সময়ের অস্বস্তি: ডা. ভারতনের মতে, আরেকটি বড় মনস্তাত্ত্বিক কারণ হলো কোনো সুনির্দিষ্ট কাজ ছাড়া অলস সময় কাটানোর অস্বস্তি। আমরা যখন সবসময় কোনো না কোনো কাজে ব্যস্ত থাকি, তখন নিজের ভেতরের দুশ্চিন্তা, অমীমাংসিত আবেগ বা হীনমন্যতার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ কম থাকে। বিশ্রাম সেই ব্যস্ততার দেয়াল সরিয়ে দেয়, ফলে লুকিয়ে থাকা ভাবনাগুলো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। অনেকে এই নীরবতা ও ভাবনা থেকে বাঁচতেই বারবার কাজের মধ্যে ডুবে থাকেন, কারণ নিজের মনের সঙ্গে একা বসার চেয়ে ব্যস্ত থাকাকে অনেক বেশি আরামদায়ক মনে হয়।
পারফেকশনিজম ও উদ্বেগ: বিশ্রামের সময় অপরাধবোধের সঙ্গে পারফেকশনিজম (অতি নিখুঁত হওয়ার জেদ) এবং উদ্বেগেরও গভীর যোগ রয়েছে। যারা নিজেদের জন্য অতিরিক্ত উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেন, তারা সহজে মেনে নিতে পারেন না যে কাজ কখনো পুরোপুরি শেষ হয়।
তাদের মনে হয়, একটু বিরতি মানেই পিছিয়ে পড়া, অন্যকে হতাশ করা কিংবা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্রামকে পুনরুদ্ধারের সুযোগ হিসেবে না দেখে এক ধরণের বিপদ বা হুমকি বলে মনে হতে পারে।
ডা. ভারতন জোর দিয়ে বলেছেন, ‘এটি উপলব্ধি করা অত্যন্ত জরুরি যে, বিশ্রাম এমন কোনো জিনিস নয় যা আমাদের শরীরকে পুরোপুরি ক্লান্ত করে তবেই অর্জন করতে হবে। এটি আমাদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার একটি মৌলিক চাহিদা।’
পর্যাপ্ত বিশ্রাম আবেগ নিয়ন্ত্রণ, মনোযোগ ধরে রাখা, স্মৃতিশক্তি এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। কেউ যদি বারবার বিশ্রামের প্রয়োজনকে উপেক্ষা করেন, তবে তিনি ক্রমশ খিটখিটে, মানসিক অবসাদগ্রস্ত এবং কাজে কম কার্যকর হয়ে পড়তে পারেন—যদিও বাহ্যিকভাবে তাকে খুব ‘উৎপাদনশীল’ মনে হতে পারে।
এই সমস্যা থেকে মুক্তির উপায় কী?
ডা. ভারতনের মতে, এই মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসার প্রথম ধাপ হলো প্রতিটা মুহূর্তকে কাজের উপযোগী করে তোলার এই ধারণাকে ধীরে ধীরে চ্যালেঞ্জ করা। মানুষ চাইলে কোনো নির্দিষ্ট কাজের লক্ষ্য না রেখেই ছোট ছোট বিরতি দিয়ে শুরু করতে পারে এবং সেই সময়ে মনে কী ধরনের ভাবনা আসছে তা লক্ষ্য করতে পারে।
বিশ্রাম নেওয়ার সময় অপরাধবোধ জাগলেই সেটাকে নিজের কোনো ভুল কাজ হিসেবে ধরে না নিয়ে, বরং একটি পুরোনো অভ্যাস হিসেবে দেখা উচিত—যা চর্চার মাধ্যমে বদলানো সম্ভব।
তবে এই বিশ্রামহীনতা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং এর সঙ্গে তীব্র উদ্বেগ, ঘুমের ব্যাঘাত বা বার্নআউটের মতো সমস্যা দেখা দেয়, তবে কোনো পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া উচিত।
সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস

