টেস্টোস্টেরনের অপব্যবহারে যেসব গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৩৬ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পুরুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে টেস্টোস্টেরন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পেশি গঠন, হাড়ের ঘনত্ব ধরে রাখা, শুক্রাণু উৎপাদন এবং যৌন আকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণে এই হরমোনের প্রয়োজন রয়েছে।
তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া টেস্টোস্টেরন গ্রহণ কিংবা প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যবহার শরীরের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। বিশেষ করে পেশি বাড়ানো, শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও যৌনশক্তি বাড়ানোর উদ্দেশ্যে হরমোনটির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার গুরুতর স্বাস্থ্যসমস্যা তৈরি করতে পারে।
কেন ব্যবহার করা হয় টেস্টোস্টেরন?
চিকিৎসকেরা সাধারণত যেসব পুরুষের শরীরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কম থাকে এবং সংশ্লিষ্ট উপসর্গ দেখা যায়, তাদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী টেস্টোস্টেরন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (টিআরটি) দিয়ে থাকেন। কিন্তু শরীরে হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিক থাকার পরও অনেকে পেশি বড় করা, শক্তি বাড়ানো কিংবা যৌন সক্ষমতা উন্নত করার আশায় এটি ব্যবহার করেন।
কিছু অনিবন্ধিত ওষুধ, সাপ্লিমেন্ট এবং জিমকেন্দ্রিক পণ্যেও হরমোন বা হরমোনজাত উপাদান থাকার দাবি করা হয়। চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান ছাড়া এসব পণ্য ব্যবহার করলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
টেস্টোস্টেরন অপব্যবহারের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- পেশি ও শক্তি বৃদ্ধি: অল্প সময়ে পেশিবহুল শরীর গঠন এবং শারীরিক শক্তি বাড়ানোর চেষ্টা।
- ক্রীড়াক্ষেত্রে পারফরম্যান্স উন্নত করা: খেলাধুলায় সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে হরমোন ব্যবহার।
- যৌন সক্ষমতা বাড়ানো: যৌন আকাঙ্ক্ষা বা পারফরম্যান্স উন্নত করার প্রত্যাশা।
চলুন জেনে নেওয়া যাক টেস্টোস্টেরনের অপব্যবহারে যেসব ক্ষতি হতে পারে-
১. প্রজননক্ষমতা কমে যাওয়া
বাইরে থেকে অতিরিক্ত টেস্টোস্টেরন গ্রহণ করলে মস্তিষ্কের হরমোন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে অণ্ডকোষে স্বাভাবিক টেস্টোস্টেরন ও শুক্রাণু উৎপাদন কমে যায়। দীর্ঘমেয়াদে অণ্ডকোষের আকার ছোট হওয়া, শুক্রাণুর সংখ্যা অত্যন্ত কমে যাওয়া কিংবা সম্পূর্ণ শুক্রাণুহীনতার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বন্ধ্যত্বের ঝুঁকিও বাড়ে।
এ ছাড়া শরীরে হরমোনের ভারসাম্য পরিবর্তিত হলে পুরুষের স্তনের টিস্যু বৃদ্ধি বা গাইনেকোমাস্টিয়া হতে পারে।
২. হৃদযন্ত্র ও রক্তনালির সমস্যা
টেস্টোস্টেরনের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার হৃদযন্ত্র ও রক্তনালির স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে রক্তচাপ বৃদ্ধি, ক্ষতিকর এলডিএল কোলেস্টেরল বেড়ে যাওয়া এবং উপকারী এইচডিএল কোলেস্টেরল কমে যাওয়ার মতো পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
বিশেষ করে অতিরিক্ত মাত্রায় বা দীর্ঘদিন হরমোন ব্যবহার করলে হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে ঝুঁকির মাত্রা ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা, ব্যবহারের ধরন ও মাত্রার ওপর নির্ভর করে।
৩. যকৃতের ক্ষতি
কিছু ধরনের টেস্টোস্টেরন ও অ্যানাবলিক স্টেরয়েড যকৃতের ওপর বিষক্রিয়ামূলক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে মুখে খাওয়ার নির্দিষ্ট কিছু অ্যানাবলিক স্টেরয়েড দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে যকৃতের প্রদাহ, পিত্তপ্রবাহে বাধা এবং বিরল ক্ষেত্রে যকৃতের টিউমারের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া হরমোনজাত ওষুধ গ্রহণ করা উচিত নয়।
৪. মানসিক স্বাস্থ্য ও আচরণে পরিবর্তন
টেস্টোস্টেরনের অতিরিক্ত ব্যবহার মেজাজ ও আচরণে পরিবর্তন আনতে পারে। কারও ক্ষেত্রে বিরক্তি, রাগ ও আক্রমণাত্মক প্রবণতা বাড়তে পারে। আবার উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও ঘুমের সমস্যাও দেখা দিতে পারে। হরমোনের ব্যবহার বন্ধ করার পরও কারও কারও মধ্যে বিষণ্নতা ও অন্যান্য মানসিক উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
৫. ত্বক ও চুলের সমস্যা
টেস্টোস্টেরনের মাত্রা বেড়ে গেলে ত্বকে অতিরিক্ত তেল উৎপন্ন হতে পারে। ফলে ব্রণ এবং তৈলাক্ত ত্বকের সমস্যা দেখা দেয়। যাদের বংশগতভাবে চুল পড়ার প্রবণতা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে মাথার চুল পাতলা হওয়া বা টাক পড়ার গতি বেড়ে যেতে পারে।
আরও যেসব জটিলতা দেখা দিতে পারে
টেস্টোস্টেরনের অপব্যবহারে কয়েকটি অতিরিক্ত স্বাস্থ্যসমস্যার ঝুঁকিও রয়েছে। যেমন-
রক্তে লোহিত কণিকা বেড়ে যাওয়া: পলিসাইথেমিয়ার কারণে রক্তের ঘনত্ব বাড়তে পারে। এতে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ঘুমের সমস্যা: বিশেষ করে আগে থেকেই স্লিপ অ্যাপনিয়া থাকলে কিছু ক্ষেত্রে সমস্যা বেড়ে যেতে পারে।
প্রোস্টেটের উপসর্গ: প্রস্রাবের সমস্যা বা প্রোস্টেটজনিত উপসর্গ বাড়তে পারে। প্রোস্টেট ক্যানসারের ঝুঁকি সম্পর্কে ব্যক্তিভেদে মূল্যায়ন প্রয়োজন; টেস্টোস্টেরন ব্যবহার সরাসরি ক্যানসার সৃষ্টি করে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ নেই।
নিরাপদ থাকতে কী করবেন?
টেস্টোস্টেরন একটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন হলেও এর ব্যবহার সবার জন্য প্রয়োজনীয় নয়। হরমোনের ঘাটতির উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা করে রোগ নির্ণয় করা জরুরি। শুধু ক্লান্তি, যৌন আকাঙ্ক্ষা কমে যাওয়া কিংবা পেশি বৃদ্ধিতে ধীরগতির কারণে নিজে থেকে টেস্টোস্টেরন ব্যবহার করা উচিত নয়।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, উপযুক্ত মাত্রা নির্ধারণ এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে চিকিৎসা নিতে হবে। পেশি ও শারীরিক সক্ষমতা বাড়াতে সুষম খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিয়মিত ব্যায়ামকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
মনে রাখবেন, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া টেস্টোস্টেরন বা হরমোনজাত পণ্য ব্যবহার করলে প্রজননক্ষমতা ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে। নিরাপদ থাকার জন্য সঠিক রোগ নির্ণয় এবং বিশেষজ্ঞের পরামর্শই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

