পেজেশকিয়ানের বিরুদ্ধে ইরানের কট্টরপন্থিরা, চায় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অভিশংসন
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০১ এএম
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে ইরানের কট্টরপন্থি রাজনৈতিক গোষ্ঠী প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের বিরুদ্ধে অবস্থান জোরদার করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বিরোধিতা করে দেশটির পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) থেকে বেরিয়ে আসার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে তারা।
‘ফ্রন্ট অব ইসলামিক রেভল্যুশন স্ট্যাবিলিটি’ নামে পরিচিত কট্টরপন্থি রাজনৈতিক গোষ্ঠী পায়দারি ফ্রন্ট ইরানের পার্লামেন্ট ও সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলকে এনপিটি থেকে প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু করার আহ্বান জানিয়েছে। এই উদ্যোগকে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান হিসেবে দেখা হচ্ছে। পায়দারি ফ্রন্ট বলেছে, এ ধরনের সামরিক উদ্যোগ ‘যত দ্রুত সম্ভব’ নেওয়া উচিত।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টার অভিযোগ তুলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল দেশটিতে হামলা শুরু করে। এরপর থেকেই ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে ইরানের কট্টরপন্থীদের বক্তব্য আরও কঠোর হয়েছে।
যুদ্ধের ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলায় ইরান এবং আরব দেশগুলোর অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহেও বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে।
গত আট মাসে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মধ্যপন্থি ও কট্টরপন্থিদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই আরও তীব্র হয়েছে। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানসহ মধ্যপন্থিরা সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের পক্ষে। অন্যদিকে পায়দারি ফ্রন্টের কট্টরপন্থিরা আলোচনার বিরোধিতা করছেন।
মধ্যপন্থিদের লক্ষ্য দ্রুত সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে রক্ষা করা। অন্যদিকে কট্টরপন্থিদের বিশ্বাস, যুক্তরাষ্ট্র কেবল শক্তির ভাষাই বোঝে। তাই ওয়াশিংটন ইরানের দাবির কাছে নতি স্বীকার না করা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া উচিত।
‘শত্রুর সঙ্গে আলোচনা দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা’
ইরানের বড় শহরগুলোর বিভিন্ন চত্বরে কট্টরপন্থিদের এই বিরোধ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গত ২০০ দিন ধরে সেখানে রাতে সমাবেশ করছেন তাদের সমর্থকেরা।
শুরুতে এসব সমাবেশের উদ্দেশ্য ছিল সরকারের প্রতি জনসমর্থন প্রকাশ এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের প্রতিবাদ জানানো। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এগুলো সুসংগঠিত রাজনৈতিক সমাবেশে পরিণত হয়েছে। এসব সমাবেশে অংশ নিয়ে কর্মীরা কূটনৈতিক পথে যুদ্ধ বন্ধ করার মধ্যপন্থীদের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান জানাচ্ছেন।
কট্টরপন্থিদের স্লোগানের মধ্যে রয়েছে, ‘কোনো আপস নয়, আত্মসমর্পণ নয়—আমেরিকার বিরুদ্ধে লড়াই’ এবং ‘শত্রুর সঙ্গে আলোচনা দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা’।
গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে অংশ নিয়ে তেহরানে ফেরার পর পেজেশকিয়ানের বিরুদ্ধেও বিক্ষোভ করেন তারা। ওই অধিবেশনে পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের নিন্দা জানানোর পাশাপাশি কূটনীতির গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন। প্রেসিডেন্টকে আলোচনাবিরোধী বার্তা পৌঁছে দেওয়ার একটি উপায় হিসেবে এসব বিক্ষোভকে দেখা হয়।
রাজপথের কর্মীদের বাইরেও ইরানের রাজনীতিতে কট্টরপন্থিদের উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। তেহরানের নগর প্রশাসন, পার্লামেন্ট, ধর্মীয় বক্তা ও শোকানুষ্ঠান পরিচালনাকারীদের পাশাপাশি শিক্ষাঙ্গন ও গণমাধ্যমেও তাদের শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে।
পায়দারি ফ্রন্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পার্লামেন্ট সদস্য আমিরহোসেইন সাবেতি এক বিবৃতিতে বলেছেন, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহার কিংবা নিষেধাজ্ঞা তুলে না নেওয়া পর্যন্ত ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা শুরু হবে না।
তিনি বলেন, ‘ইরানকে ধ্বংস করার শত্রুর লক্ষ্য বদলায়নি। তারা কেবল আরেকটি আকস্মিক হামলা চালানোর উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষা করছে। যারা মনে করেছিলেন, আলোচনা যুদ্ধ ঠেকাতে পারবে কিংবা আলোচনার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে, তারা বিশ্ব কীভাবে চলে তা বোঝেননি এবং নিজেদের ভুল ধারণায় বিভ্রান্ত হয়েছেন।’
সাবেতি আরও বলেন, ‘বিশ্ব কেবল শক্তির ভাষাই বোঝে।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে অভিশংসনের উদ্যোগ
জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্ক সফরের পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিকে অভিশংসনের প্রস্তাব দিয়েছে পায়দারি ফ্রন্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠী।
একই সঙ্গে বিদেশি গণমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দেওয়াকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার একটি আইন নিয়েও ইরানের পার্লামেন্টে আলোচনা চলছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা কট্টরপন্থিদের জন্য আরেকটি রাজনৈতিক সাফল্য হবে।
তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অভিশংসনের উদ্যোগ চললেও সরকারপন্থী রাজনৈতিক শিবির এখনো কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান ধরে রেখেছে।
পেজেশকিয়ানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সাংবাদিক দাউদ হেশমাতি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানের সরকার উৎখাতের বড় লক্ষ্য থেকে সরে এসে তুলনামূলক সীমিত কিছু লক্ষ্য অর্জনের দিকে মনোযোগ দিয়ে থাকতে পারে। এতে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, ওই লক্ষ্যগুলো অর্জনের বিভিন্ন পথ রয়েছে, যার একটি হলো যুদ্ধ। তবে যুদ্ধ ঠেকাতে হলে সামরিক পদক্ষেপের বিকল্প সব পথ আগে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। আলোচনার মাধ্যমে কূটনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানো সেই বিকল্পগুলোর অন্যতম এবং একে সব সময় অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
হেশমাতির মতে, যুদ্ধ বন্ধ করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে, যেখানে ইরানের ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান দেখানো হবে।
তিনি আরও বলেন, ইরানে আলোচনার সমর্থকেরা মনে করেন, শক্তির ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করতেই হবে—এমন কোনো কথা নেই। তবে কূটনৈতিক পথে এ পর্যন্ত যা ঘটেছে, তাতে পারস্পরিক অবিশ্বাস তৈরি হওয়াটা বোধগম্য।
কট্টরপন্থিদের প্রভাব কতটা?
রাজনৈতিক বিশ্লেষক নেগার মোর্তাজাভির মতে, ইরানের কট্টরপন্থীরা অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে শক্তিশালী হলেও দেশটির পররাষ্ট্রনীতিতে তাদের প্রভাব এখনো সীমিত।
তিনি বলেন, ‘ইরানের কট্টরপন্থীরা প্রান্তিক কোনো রাজনৈতিক শক্তি নয়। তারা সুসংগঠিত এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার গভীরে প্রোথিত একটি অংশ।’
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সমর্থকদের সংগঠিত করা, রাজনৈতিক আলোচনার গতিপথ নির্ধারণ, সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং কূটনীতির রাজনৈতিক মূল্য বাড়িয়ে দেওয়ার সক্ষমতা থেকেই তাদের শক্তি আসে।
তবে রাজনৈতিক প্রভাব থাকা আর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এক বিষয় নয় বলে মনে করেন মোর্তাজাভি। তার মতে, যুদ্ধ, শান্তি ও আলোচনার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামো।
কট্টরপন্থিরা আলোচনাকারীদের সঙ্গে বিরোধ চালিয়ে যেতে পারেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার পক্ষে থাকা কর্মকর্তাদের অভিশংসনের হুমকি দিতে পারেন এবং কূটনৈতিক উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু দেশটির প্রধান ক্ষমতাকেন্দ্রগুলোর সমর্থন থাকলে তারা কোনো সমঝোতা পুরোপুরি আটকে দিতে পারবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই।
মোর্তাজাভি বলেন, ‘কূটনীতিকে জটিল করে তোলার মতো শক্তি তাদের রয়েছে, কিন্তু তা বন্ধ করে দেওয়ার মতো শক্তি যে তাদের আছে, এমন নয়। তারা দৃশ্যমান ও সরব রাজনৈতিক শক্তি হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তাদের হাতে নেই।’
তিনি আরও বলেন, যুদ্ধ চলাকালে তেহরান কূটনীতির দরজা খোলা রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানোর সিদ্ধান্ত সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেই এসেছে। কট্টরপন্থীরা তা ঠেকাতে পারেননি।
মোর্তাজাভির মতে, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময় ইরানের পারমাণবিক চুক্তি বা জেসিপিওএ এবং পরবর্তী সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক—কোনোটিই কট্টরপন্থিরা শেষ পর্যন্ত আটকে দিতে পারেননি। কারণ, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তাদের অবস্থানের ঊর্ধ্বে থেকে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের বিরোধিতা করে ইরানে রাজপথের সমাবেশ ও টেলিভিশন অনুষ্ঠান অব্যাহত থাকতে পারে।
তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অভিশংসন শুনানির তারিখ নির্ধারণে বিলম্ব এবং যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত থাকার বিষয়গুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, ইরানের মধ্যপন্থিরা এখনো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে সক্রিয় রয়েছেন।
এখন দেখার বিষয়, কট্টরপন্থিদের চাপ সামলে পেজেশকিয়ান সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার পথে কতটা এগোতে পারে এবং যুদ্ধ বন্ধে কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয় কি না। সূত্র: আল জাজিরা



