আওয়ামী আমলের আমলনামা : তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন
স্থানীয় সরকারে অবিশ্বাস্য দুর্নীতি
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
স্থানীয় সরকার খাতে গত ১৭ বছরে ২৭ হাজার ৮৫৯ কোটি টাকার অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে সরকারি তদন্তে। ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৬৬টি খাতে অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ ও ক্ষমতা অপব্যবহারের তথ্য তুলে ধরে প্রতিবেদনটি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ।
এদিকে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ১৩ হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে দুদক অনুসন্ধান করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে আওয়ামী লীগ আমল ছাড়াও অন্তর্বর্তী সরকারের শেষদিন পর্যন্ত এই তদন্ত আওতাভুক্ত করা হয়েছে। গঠিত তদন্ত কমিটি এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন দুর্নীতি দমন কমিশনে জমা দিলেও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে তদন্তকাজ শেষ করতে পারেনি।
প্রসঙ্গত, আওয়ামী লীগের টানা সাড়ে ১৫ বছরসহ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কাল যুক্ত করে বিগত ১৭ বছরে স্থানীয় সরকার বিভাগের সামগ্রিক উন্নয়ন কার্যক্রমে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়েছে কি না, তা অনুসন্ধানে গত ১২ মে সাত সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটির আহ্বায়ক করা হয় স্থানীয় সরকার বিভাগের মহাপরিচালককে। সদস্য সচিব ছিলেন-স্থানীয় সরকার বিভাগের পরিকল্পনা-১ অধিশাখার যুগ্মসচিব মো. সামছুল ইসলাম। অন্য সদস্যরা হলেন-জেলা পরিষদ শাখার উপসচিব খোন্দকার ফরহাদ আহমদ, সিটি করপোরেশন-১ শাখার উপসচিব মো. রবিউল ইসলাম, পাস-৩ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব মোছা. আকতারুন নেছা, প্রশাসন-১ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব তাহমিনা আক্তার এবং উন্নয়ন-২ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব এ বি এম আরিফুল ইসলাম। গঠিত কমিটি স্থানীয় সরকার বিভাগের দপ্তর-সংস্থার অভিযোগপত্র, প্রকল্পের অডিট প্রতিবেদন, কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের অডিট রিপোর্ট, সংশ্লিষ্ট নথি, পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করে। কমিটির সভা ২০২৬ সালের ৪ জুন, ১৮ জুন, ২৯ জুন, ১ জুলাই, ১৬ জুলাই, ৩০ জুলাই, ১৮ আগস্ট এবং পরবর্তী কয়েকটি তারিখে অনুষ্ঠিত হয়। ৫ অক্টোবর সচিবের সভাপতিত্বে প্রতিবেদন পর্যালোচনা সভাও হয়। গত ১৯ অক্টোবর স্থানীয় সরকার বিভাগের পরিকল্পনা-৩ শাখা থেকে জারি করা এক চিঠিতে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি অধিকতর নিরপেক্ষ, পুঙ্খানুপুঙ্খ ও সমন্বিত তদন্তের জন্য দুদকে পাঠানো হয়েছে।
তদন্তে, ৬৬টি খাত নিয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং ঢাকা ওয়াসার বিভিন্ন কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হয়েছে। প্রতিবেদনে কোথাও প্রকল্পের অর্থের ব্যবহার, কোথাও ভ্যাট-কর সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়া, কোথাও নির্মাণ কাজের মান যাচাই না করে বিল পরিশোধ, আবার কোথাও নিয়োগ ও ক্ষমতা অপব্যবহারের কথা তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে এসব ঘটনায় আর্থিক ক্ষতি বা অনিয়মের অঙ্ক উল্লেখ করে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে অধিকতর তদন্ত, বিভাগীয় ব্যবস্থা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
পিরোজপুরে এলজিইডির প্রকল্পে ৬ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি : পিরোজপুরে এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের বিভিন্ন অর্থবছরের উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের সত্যতা পেয়েছে তদন্ত কমিটি। প্রতিবেদনে ৬ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্প সমাপ্তির তারিখে মালামাল ও মাঠপর্যায়ের অগ্রগতি যাচাই, প্রকল্পের অর্থ ব্যয়, গাড়ি কেনা ও মেরামত, অনুমোদিত জনবলের বাইরে বেতন-ভাতা এবং সড়ক-কালভার্ট নির্মাণে অনিয়মের পৃথক বিষয়ে দুর্নীতির কথাও বলা হয়েছে।
প্রকল্পের অর্থ ব্যয় ও তিনটি মোটরযান-সংক্রান্ত বিষয়ে ১১ কোটি ৬০ লাখ টাকা, গাড়ি মেরামতের অর্থ চালকের ব্যাংক হিসাবে পরিশোধের ঘটনায় ২৫ লাখ ৮৮ হাজার টাকা, অনুমোদিত জনবল কাঠামোর বাইরে বেতন-ভাতার ক্ষেত্রে ৪৮ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং পরামর্শক, প্রিন্টিং ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিল থেকে ভ্যাট-আয়কর কম কর্তনের ঘটনায় ৪৮ লাখ ৮৫ হাজার টাকার অনিয়ম হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া স্ট্যান্ডার্ড রোড ডিজাইন অনুসরণ না করে সড়ক মেরামত ও নির্মাণে এক কোটি ৯১ লাখ টাকা, সরকারি নকশা অনুসরণ না করে সড়ক নির্মাণে দুই কোটি ৭৯ লাখ টাকা এবং পাঁচটি কালভার্ট নির্মাণ না করেও ব্যয় দেখানোর ঘটনায় ৮২ লাখ ৪১ হাজার টাকার দুর্নীতি হয়েছে।
ঢাকা জেলা পরিষদের ভবন নির্মাণ ও নিয়োগ : ঢাকা জেলা পরিষদের নির্মাণাধীন আধুনিক বহুতল ভবন নির্মাণে অনিয়মের বিষয়টি তদন্তে উঠে এসেছে। পাশাপাশি জেলা পরিষদের নিয়োগ কার্যক্রমে দুর্নীতি, অস্বচ্ছতা ও বিধিবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের বিষয়েও অনুসন্ধান করা হয়েছে।
বিভিন্ন সিটি করপোরেশনে ভ্যাট-কর, রাজস্ব ও প্রকল্প ব্যয়ে অনিয়ম : তদন্ত প্রতিবেদনে বিভিন্ন সিটি করপোরেশনের অনিয়ম দুর্নীতির বড় অংশ উঠে এসেছে। ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, গাজীপুর, বরিশাল, রংপুর, খুলনা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন সময়ের রাজস্ব আদায়, ভ্যাট-কর জমা, ঠিকাদারি বিল, নির্মাণকাজ, বাজার ও মার্কেট বরাদ্দ এবং নিয়োগসংক্রান্ত খাতে দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি।
ঢাকা দক্ষিণের ভ্যাট জমা না দেওয়ার পরিমাণ ১১ কোটি টাকার বেশি : ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২০১৬-১৭ অর্থবছরের হিসাব পর্যালোচনায় দেখা গেছে, রোড কাটিং ফি থেকে আদায় করা অর্থের ওপর প্রযোজ্য ভ্যাট সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি। এতে ভ্যাট বাবদ এক কোটি ৫৬ লাখ ৯৩ হাজার ৭৮০ টাকা এবং দণ্ডসুদ বাবদ ৭৫ লাখ ৩৩ হাজার ১৪ টাকা-মোট দুই কোটি ৩২ লাখ ২৬ হাজার ৭৯৪ টাকার আর্থিক ক্ষতির কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।
একই সিটি করপোরেশনের ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বিভিন্ন কাজ ও সেবার বিপরীতে ভ্যাট কর্তন এবং সরকারি খাতে জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে আরেকটি ঘটনায় ৯ কোটি ১৫ লাখ ৪৫ হাজার ৮৭৮ টাকার আর্থিক ক্ষতির কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে ভ্যাট ছয় কোটি ১৮ লাখ ৫৫ হাজার ৩২৩ টাকা এবং দণ্ডসুদ দুই কোটি ৯৬ লাখ ৯০ হাজার ৫৫৫ টাকা।
নির্মাণসামগ্রী পরীক্ষা না করেই বিল : ঢাকা দক্ষিণ, গাজীপুর, রংপুর ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের ২০১৮-১৯ অর্থবছরের নির্মাণকাজে নির্মাণসামগ্রীর পরীক্ষা না করেই ছয় কোটি ৭৯ লাখ ৪৮ হাজার ২২৯ টাকার বিল পরিশোধ করা হয়। ঢাকা দক্ষিণ, রংপুর, বরিশাল ও খুলনা সিটি করপোরেশনে একই অর্থবছরে কাজ ও সেবার বিপরীতে উৎসে ভ্যাট আদায় না করায় দণ্ডসুদসহ ৯ কোটি ৫২ লাখ ৭৬ হাজার ৭৬০ টাকা, ঢাকা দক্ষিণ, বরিশাল ও খুলনা সিটি করপোরেশনে উৎসে আয়কর কর্তন বা আদায় না করার ঘটনায় দণ্ডসুদসহ ছয় কোটি ৫০ লাখ ৯৩ হাজার ৪০৩ টাকার ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। খুলনা সিটি করপোরেশনে আউটসোর্সিং শ্রমিকদের বেতন স্থায়ী কর্মচারীদের বেতনের মতো পরিশোধের ঘটনায় ১১ কোটি পাঁচ লাখ ৭৪ হাজার ৬৮৪ টাকার তছরুপ হয়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটির যানবাহন ও বাস টার্মিনাল : ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের যানবাহন মোটরযান বিধি অনুযায়ী নিবন্ধন না করা এবং অগ্রিম আয়কর পরিশোধ না করার কারণে এক কোটি ২৩ লাখ ছয় হাজার ৫০০ টাকার রাজস্ব ক্ষতির কথা বলা হয় প্রতিবেদনে। এ ছাড়া ২০১৮-১৯ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছরে আন্তঃজেলা বাসস্ট্যান্ড ও টার্মিনাল থেকে খাস আদায়ের বিপরীতে নির্ধারিত হারে ভ্যাট জমা না দেওয়ার ঘটনায় এক কোটি ৫২ লাখ ৬৪ হাজার ১৩৮ টাকার আর্থিক ক্ষতির বিষয় উঠে এসেছে।
রংপুর সিটির প্রকল্প তহবিল স্থানান্তর : রংপুর সিটি করপোরেশনে অর্থবছর শেষে তামাদি রোধের নামে প্রকল্প তহবিল থেকে ২০ কোটি পাঁচ লাখ টাকা স্থানান্তর করা হয়। প্রকল্পের অব্যবহৃত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে অন্য তহবিলে স্থানান্তরের বিষয়টিকে আর্থিক অনিয়ম হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সিটি করপোরেশনগুলোর বাজার, ভাড়া ও রাজস্ব খাতে দুর্নীতি : প্রতিবেদনের ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মোবাইল টাওয়ারের ভাড়া আদায় না করার ঘটনায় তিন কোটি ২৬ লাখ টাকার বিষয় রয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ, গাজীপুর, রংপুর, বরিশাল ও খুলনা সিটি করপোরেশনের মার্কেট বা স্থাপনার ভাড়া আদায়সংক্রান্ত ঘটনায় ১৮৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকা আত্মসাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ট্রেড লাইসেন্স ফি আদায় না করার বিষয়ে ১১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা এবং কমিউনিটি সেন্টার ও মার্কেটের দোকান ভাড়া আদায় না করার বিষয়ে সাত কোটি ৭৭ লাখ টাকার দুর্নীতি হয়েছে।
এছাড়া বিভিন্ন সিটি করপোরেশনে কর্মকর্তাদের নামে প্রাপ্ত অর্থ জমা না করা, হাটবাজার ইজারার অর্থ সরকারি হিসাবে জমা না দেওয়া, নন-কর রাজস্বের বিল পরিশোধ, পানির বিল আদায় এবং নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ না করে অর্থ ব্যবস্থাপনার বিষয়ও উঠে এসছে। এসব ঘটনায় পৃথক পৃথক দুর্নীতির কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ, গাজীপুর ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ভ্যাটসংক্রান্ত আরও কয়েকটি বিষয়ও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে আদায়কৃত ভ্যাট সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার ঘটনায় ছয় কোটি ৩৮ লাখ টাকা এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অতিরিক্ত গ্র্যাচুইটি প্রদানের ঘটনায় পাঁচ কোটি ৮১ লাখ সাত হাজার ৬৭৪ টাকার আর্থিক ক্ষতির কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। গ্র্যাচুইটির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধি ও আইনগত নির্দেশনা অনুসরণের বিষয়টি পর্যালোচনা করা হয়েছে।
গাজীপুর, বরিশাল ও রংপুরের সাবেক মেয়রদের দুর্নীতি : প্রতিবেদনে গাজীপুরের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে সাত হাজার ৫০০ কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে তার এবং প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা গোলাম কিবরিয়ার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও সম্পদসংক্রান্ত ৬৬ কোটি ৬৬ লাখ টাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাদিক আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে ৩০০ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ও তালিকাভুক্ত হয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের অনিয়ম-দুর্নীতি এবং ঢাকা দক্ষিণের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের মেয়াদকালে নিয়োগ-বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের কথাও প্রতিবেদনের বলা হয়েছে। এ ছাড়া রংপুর সিটি করপোরেশনের ২০০৯ সাল থেকে বিভিন্ন কার্যক্রম, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং নৌকা বা নৌকাঘাট ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের বিষয়গুলো পৃথকভাবে অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের দুর্নীতি : জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কুমিল্লা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ নসরুলের বিরুদ্ধে ৬০ কোটি টাকার টয়লেট নির্মাণ প্রকল্পে অনিয়মের বিষয়টি প্রতিবেদনে রয়েছে। এ ঘটনায় সরকারের ৬০ কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতির কথা উল্লেখ করে দুদকের মাধ্যমে অধিকতর তদন্ত এবং বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
পানির গুণগতমান পরীক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ প্রকল্পেও কেনাকাটা, দরপত্র ও বিল পরিশোধ নিয়ে অভিযোগের কথা বলা হয়েছে। প্রকল্প পরিচালক মুন্সী হাসানুজ্জামানের বিরুদ্ধে অনিয়মের বিষয়টি অনুসন্ধানের আওতায় ছিল। এ প্রকল্পে ২৪ কোটি টাকা বিল পরিশোধে অনিয়ম পেয়েছে তদন্ত কমিটি।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. সাইফুর রহমানের বিরুদ্ধে ৫৮ কোটি টাকার অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি।
ঠিকাদারদের জরিমানা আদায়ে অনিয়ম : প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি-পিইডিপি-৩-এর অর্থ ব্যবহারে প্রায় ৫৮ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে। ঠিকাদারি কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ না হলেও বিলম্বজনিত জরিমানা আদায়ে অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে।
প্রতিবেদনে সিরাজগঞ্জের মেসার্স আফরা সাদেকা নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ৭৬ লাখ ১১ হাজার ৬৬৩ টাকার কার্যাদেশের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে না পারার পর সময় বাড়ানোর আবেদন বিবেচনায় জরিমানার বড় অংশ মওকুফের কথা উল্লেখ রয়েছে প্রতিবেদনে। আরেকটি ঘটনায় ১৭১ দিনের বিলম্বের বিপরীতে মাত্র ১৫ দিনের জরিমানা আদায় করে বাকি ১৫৬ দিনের জরিমানা মওকুফ করা হয়েছে।
তদন্তে বলা হয়েছে, শতাধিক ঠিকাদারের কাছ থেকে লিকুইডেটেড ড্যামেজ বা বিলম্বজনিত জরিমানার প্রায় ৫৮ কোটি টাকা আদায় করা হয়নি। এ ঘটনায় দুদকের মাধ্যমে অধিকতর তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে। তবে জরিমানা মওকুফের প্রতিটি সিদ্ধান্তে কার অনুমোদন ছিল এবং কত টাকা আইনগতভাবে আদায়যোগ্য ছিল, তা পূর্ণাঙ্গভাবে নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট চুক্তি ও নথি যাচাই করার কথাও বলা হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রীর পছন্দের কিছু পৌরসভায় বিশেষ উন্নয়ন বরাদ্দ : ২০০৯-১০ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত পৌরসভাগুলোকে উন্নয়ন সহায়তার অর্থ বরাদ্দের বিষয়টি পর্যালোচনা করা হয়েছে। বিশেষ বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা না থাকায় তৎকালীন প্রতিমন্ত্রীর অভিপ্রায় অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়ার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এর ফলে কিছু পৌরসভা অন্য পৌরসভার তুলনায় বেশি বিশেষ বরাদ্দ পেয়েছে।
ঢাকা ওয়াসার নিয়োগ ও ক্রয়প্রক্রিয়ায় অনিয়ম : ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুস সালাম ব্যাপারীর নিয়োগপ্রক্রিয়া ঘাটতির বিষয়টি প্রতিবেদনে এসেছে। ব্যক্তিগত ও কর্মজীবনের পটভূমি যাচাইয়ের জন্য দুদকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন নথিতে পাওয়া গেলেও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) ও স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) অনুসন্ধানী প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।
নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১১ আগস্ট অনুষ্ঠিত ঢাকা ওয়াসার কর্মসম্পাদন সহায়তা কমিটির অষ্টম সভায় যোগ্য প্রার্থীদের সাক্ষাৎকারের আগে যাচাই প্রতিবেদন সংগ্রহের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। পরে তিন প্রার্থীর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিবেদন চেয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে চিঠি পাঠানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে আবদুস সালাম ব্যাপারীকে প্রধান উপদেষ্টার অনুমোদন সাপেক্ষে তিন বছরের জন্য ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগ দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া স্ট্যান্ডার্ড বিডিং ডকুমেন্ট অনুসরণ না করে কাজ সম্পাদন ও বিল পরিশোধের একটি ঘটনায় ৩০ লাখ টাকার দুর্নীতির তথ্য পেয়েছে কমিটি। ঢাকা ওয়াসার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ও তদন্তে উঠে এসেছে। তার নিয়োগের নথিতে ঘাটতি বা দরপত্রের বিধি অনুসরণ না করার বিষয়ও উঠে এসেছে তদন্তে।
সাবেক মন্ত্রী ও মেয়রদের দুর্নীতি : তদন্ত প্রতিবেদনে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের ১৪৩ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদকে মামলা, সাবেক স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও মো. তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলাম ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের কথাও তদন্তে বলা হয়েছে। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ১৩ হাজার কোটি টাকার অভিযোগের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

