৪৬ বছর পর ফিরছে গ্রাম সরকার
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৮০ সালে চালু হয়েছিল ‘স্বনির্ভর গ্রাম সরকার’। বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তন ও বিলুপ্তির পথ পেরিয়ে ২০০৩ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার নতুন গ্রাম সরকার আইন করে। তবে বাস্তবায়নের আগেই ২০০৯ সালে আইনটি বাতিল করা হয়। এর ১৭ বছর পর বর্তমান বিএনপি সরকার আবারও গ্রাম সরকার ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। এটি কার্যকর হলে ৪৬ বছর পর ফিরবে গ্রাম সরকারব্যবস্থা। ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিটি ওয়ার্ডে ১৭ জনের কাঠামো গঠনের প্রস্তাব দিয়ে আইনের খসড়া তৈরি করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। তবে ইউনিয়ন পরিষদ ও ওয়ার্ড সভার পাশাপাশি নতুন এই সংগঠন কতটা প্রয়োজন, মানুষের অংশগ্রহণ কতটা বাড়াবে এবং দায়িত্বের পুনরাবৃত্তি ঘটাবে কি না-সেসব নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ‘গ্রাম সরকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়ার ওপর মতামত চাওয়া হয়েছে। এটি এখনো প্রস্তাবিত আইন। ফলে গ্রাম সরকার গঠন, সদস্য নির্বাচন ও কার্যক্রমসংক্রান্ত বিধানগুলো চূড়ান্ত হবে জনগণের মতামতের ভিত্তিতে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) প্রধান নির্বাহী ড. বদিউল আলম মজুমদার এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, গ্রাম সরকার বর্তমান বাস্তবতায় প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। এ ধরনের ব্যবস্থা সাধারণত ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করতে করা হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেটা না হয়ে বরং সেখানে দলীয় নেতাকর্মীদের বসানো হবে। এটি কার্যকর হলে ভালোর চেয়ে মন্দ হওয়ার আশঙ্কা বেশি।
লেখক ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ এজাজ যুগান্তরকে বলেন, স্থানীয় সরকারের মূল দর্শন ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করা। এ প্রতিষ্ঠানগুলো সামাজিক, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এর দেখা মিলছে না। তবে বর্তমান সরকার স্থানীয় সরকারকে ধাপে ধাপে ক্ষমতায়িত করার কথা বলছে। সেটা উদ্দেশ্য হলে গ্রাম সরকার ইতিবাচক হবে। দেশে স্থানীয় সরকারের ৫টি কাঠামোর (সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ) কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন দরকার এসব কাঠামোকে ক্ষমতায়িত করা। সেটা না করে আরও একটি কাঠামো বানানো হলে সুফল নাও মিলতে পারে।
খসড়ায় যা আছে : খসড়া অনুযায়ী, প্রতিটি গ্রাম সরকারে একজন প্রধান, একজন উপদেষ্টা ও ১৫ জন সদস্য থাকবেন। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য (ইউপি মেম্বর) হবেন এর প্রধান। সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্য তার নির্বাচনি এলাকার গ্রাম সরকারগুলোর উপদেষ্টা হবেন। প্রথম সভা থেকে গ্রাম সরকারের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর।
সদস্যদের মধ্যে থাকবেন দুজন গণ্যমান্য ব্যক্তি বা সমাজসেবক, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর একজন পুরুষ ও একজন নারী সদস্য। এছাড়া দুজন কৃষক এবং একজন করে নিকাহ রেজিস্ট্রার, সমবায় সমিতির সদস্য, পল্লিচিকিৎসক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, শ্রমিক ও যুব প্রতিনিধি থাকবেন। সংশ্লিষ্ট এলাকায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী থাকলে তাদের একজন প্রতিনিধি রাখার প্রস্তাব রয়েছে। কোনো শ্রেণির প্রতিনিধি পাওয়া না গেলে গণ্যমান্য ব্যক্তি বা সমাজসেবকের সংখ্যা বাড়িয়ে তা পূরণ করা হবে।
ওয়ার্ডের ভোটার তালিকায় থাকা অন্তত ১০ শতাংশ ভোটারের উপস্থিতিতে হ্যাঁ-না ভোটে সদস্য নির্বাচনের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রক্রিয়াটি পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে হবে। খসড়ায় পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ বলতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা তার ক্ষমতাপ্রাপ্ত কমিটিকে বোঝানো হয়েছে।
উন্নয়ন থেকে সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধ : প্রস্তাবিত গ্রাম সরকারের কাজের পরিধি বিস্তৃত। গ্রামের রাস্তাঘাট ও কালভার্ট উন্নয়নের অগ্রাধিকার পরিকল্পনা তৈরি, চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি ও আর্থিক বিষয় পর্যালোচনা এবং সরকারি সেবা কার্যক্রমে সহযোগিতা করবে প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন, সন্ত্রাস, চুরি, মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং স্থানীয় বিরোধ মীমাংসায় উদ্যোগ নেওয়ার কথাও রয়েছে এতে।
শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে সহযোগিতা, পরিবার পরিকল্পনা, পুষ্টি, টিকাদান, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন কার্যক্রমেও ভূমিকা রাখবে গ্রাম সরকার। তারা কৃষি উপকরণের সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং সংকট সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাবে। সমবায়, কুটিরশিল্প, মৎস্যচাষ, পশু পালন, বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ সংরক্ষণে মানুষকে উৎসাহিত করবে।
প্রতি দুই মাসে অন্তত একটি সভা এবং প্রতি ছয় মাসে একটি সাধারণ সভার প্রস্তাব রয়েছে। সাধারণ সভায় ওয়ার্ডের অন্তত ১০ শতাংশ ভোটারের উপস্থিতি প্রয়োজন হবে। কার্যক্রম পরিচালনায় বিষয়ভিত্তিক কমিটি ও প্রয়োজনে উপকমিটি গঠনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
গ্রাম সরকারের পৃথক তহবিলে ইউনিয়ন পরিষদ ও অন্যান্য উৎস থেকে পাওয়া অর্থ জমা হবে। দাপ্তরিক উপকরণ কেনার ব্যয় নির্বাহে ইউনিয়ন পরিষদ নিজস্ব আয়ের একটি অংশ দেবে। কার্যক্রম পরিদর্শন ও তদন্তের বিধানও রয়েছে। দায়িত্ব পালনে ধারাবাহিক ব্যর্থতা, প্রশাসনিক বা আর্থিক অক্ষমতা, জনস্বার্থবিরোধী কাজ কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার পাওয়া গেলে জেলা প্রশাসক গ্রাম সরকার বাতিল করতে পারবেন। তবে আগে কারণ দর্শানোর সুযোগ দিতে হবে।
জিয়াউর রহমানের উদ্যোগ থেকে বর্তমান খসড়া : ১৯৮০ সালে স্বনির্ভর গ্রাম সরকার চালুর পেছনে গ্রামের মানুষকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সংগঠিত করাই ছিল মূল লক্ষ্য। সেই বছরের ২৪ মে প্রকাশিত সরকারি গেজেটে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, গণসাক্ষরতা, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও পরিবার পরিকল্পনা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাসহ স্থানীয় বিরোধ মীমাংসাকে প্রধান কাজ হিসাবে নির্ধারণ করা হয়। এর মাধ্যমে গ্রাম সমবায় ও সমবায় ব্যাংক গড়ে তুলতে উৎসাহ দেওয়ার কথাও ছিল।
১৯৮২ সালে এরশাদের সামরিক সরকারের শাসনামলে এই ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়। ১৯৯৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ‘স্থানীয় সরকার (গ্রাম পরিষদ) আইন, ১৯৯৭’ প্রণয়ন করেছিল। পরে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ‘গ্রাম সরকার আইন, ২০০৩’ প্রণয়ন করে। তখন ১৯৯৭ সালের আইনটি রহিত করা হয়। ২০০৩ সালের আইনে গ্রাম সরকারের প্রধান এবং উপদেষ্টার সঙ্গে ১৩ জন সদস্য রাখার বিধান ছিল। সাধারণ সভায় সমঝোতার ভিত্তিতে সদস্য মনোনীত হতেন। মতভেদ হলে পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হতো। অর্থাৎ, প্রধান ও উপদেষ্টা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হলেও অন্য সদস্যদের বাছাইয়ের ভিত্তি ছিল মনোনয়ন। বেসরকারি সংস্থা ব্লাস্টের এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৫ সালের ২ আগস্ট হাইকোর্ট আইনটি অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদের সঙ্গে মনোনীত সদস্যদের সংস্থার সম্পর্ক এবং সংবিধানের গণতান্ত্রিক চেতনা ছিল বিরোধের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পরে ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার রহিতকরণ অধ্যাদেশ জারি করে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সংসদে রহিতকরণ আইন পাশ হয়। তবে আইনটির কার্যকারিতা ধরা হয় ২০০৮ সালের ১ জুন থেকে।

