ব্যাংকার থেকে জননেতা, চারবারের এমপি এখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্ণধার
Advertisement
মো. হারুন অর রশিদ, মনোহরদী (নরসিংদী)
প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:৩৯ পিএম
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নরসিংদীর মাটি থেকে উঠে আসা এক জননেতার দীর্ঘ রাজনৈতিক ও পেশাগত পথচলার নতুন অধ্যায় রচিত হলো। বিএনপির নবগঠিত সরকারে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল ।
তার মন্ত্রিত্ব পাওয়ার পর নরসিংদীর সাধারণ মানুষের মনে নতুন করে প্রত্যাশা দানা বাঁধতে শুরু করে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নরসিংদী-৪ (মনোহরদী-বেলাবো) আসন থেকে ধানের শীষের প্রার্থী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল ১ লাখ ৬১ হাজার ৯১২ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে জাহাঙ্গীর আলম ৭৬ হাজার ৪৪৫ ভোট পেয়েছেন। প্রায় ৯০ হাজার ভোটের ব্যবধানে তিনি জয়ী হয়েছেন।
শেকড় থেকে শিখরে
সাখাওয়াত হোসেন ১৯৫১ সালের ৩০ আগস্ট নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার হাফিজপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মরহুম সর্দার আসমত আলী এবং মাতা মরহুমা বেগম সালেহা খাতুনের সন্তান হিসেবে ছোটবেলা থেকেই তিনি মেধা ও নেতৃত্বগুণের স্বাক্ষর রাখেন।
শিক্ষাজীবনে তিনি ধারাবাহিক সাফল্য অর্জন করেন। এসএসসি ও এইচএসসিতে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে অর্থনীতিতে বিএ (অনার্স) ও এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএল.বি সম্পন্ন করেন এবং ব্যাংকিং ডিপ্লোমাও লাভ করেন।
ছাত্রজীবনে তিনি নরসিংদী সরকারি কলেজের জিএস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যা তার নেতৃত্বের প্রথম আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।
ব্যক্তিজীবনে তিনি তিন সন্তানের জনক। সন্তানরা উচ্চশিক্ষিত এবং দেশ-বিদেশে নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত।
ব্যাংকার থেকে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে
১৯৭৬ সালে তিনি BCCI (Overseas) Ltd.-এ অফিসার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। নিষ্ঠা ও দক্ষতায় অল্প সময়েই তিনি সহকারী ব্যবস্থাপক পদে উন্নীত হন। দীর্ঘ ১৫ বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা তাকে অর্থনীতি ও আর্থিক প্রশাসনে বাস্তবভিত্তিক জ্ঞান অর্জনে সহায়তা করে।
সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
পরিচালক, সোনালী ব্যাংক (১৯৯১–১৯৯৩); চেয়ারম্যান, ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (১৯৯৩–১৯৯৬); চেয়ারম্যান, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি (২০০১–২০০৬); সদস্য, অর্থ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি, সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (২০০২–২০০৬)।
১৯৯১ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) যোগ দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হন। একই বছর ৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নরসিংদী-৪ (মনোহরদী-বেলাবো) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন।
দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের পথ পেরিয়ে তিনি ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ এবং সর্বশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সর্বশেষ নির্বাচনে প্রায় এক লাখ ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ তার জনপ্রিয়তারই প্রতিফলন।
‘ব্যাংকার থেকে জননেতা, জননেতা থেকে বহুবারের জনপ্রিয় এমপি’-এই দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিযাত্রায় তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আস্থাভাজন হিসেবে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব লাভ করেন।
মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার প্রথম কর্মদিবসেই তিনি নরসিংদী জেলায় একটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি ইস্যু করেন। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয় এবং তার প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও আস্থা আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
তার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড গুলোর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একাডেমিক ভবন নির্মাণ, ১১টি দীর্ঘ সেতুসহ অসংখ্য কালভার্ট নির্মাণ, গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগ,মনোহরদী পৌরসভা প্রতিষ্ঠা ও গ্যাস সংযোগ স্থাপন। এছাড়াও মনোহরদীতে নারী শিক্ষার অগ্রগতির জন্য সর্দার আসমত আলী মহিলা ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠা,ফায়ার সার্ভিস স্টেশন, ডাকবাংলো, অডিটোরিয়াম ও মহিলা হোস্টেল স্থাপন, হাসপাতালগুলোতে অ্যাম্বুলেন্স সরবরাহের কার্যক্রম তাকে জনমানুষের নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা
নরসিংদীর জনপদ থেকে জাতীয় নেতৃত্বের কেন্দ্রে পৌঁছানো সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের এই যাত্রা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়—এটি একটি অঞ্চলের আশা, আস্থা ও উন্নয়নের স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি। এখন সময়ই বলে দেবে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্ণধার হিসেবে তিনি কীভাবে তার অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা দিয়ে জাতিকে আরও সুস্থ ও সমৃদ্ধ পথে এগিয়ে নিয়ে যান।
চালাকচর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি সরদার মাহমুদ হাসান ফোটন বলেন, সাখাওয়াত হোসেন বকুল শুধু একজন রাজনীতিবিদ নন, তিনি মনোহরদী-বেলাবোর উন্নয়নের রূপকার। তার নেতৃত্বে এই জনপদে শিক্ষা, অবকাঠামো ও নাগরিক সুবিধার যে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে, তা তাকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ের আসনে স্থান দিয়েছে। চারবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য হিসেবে তার জনপ্রিয়তাই প্রমাণ করে তিনি কতটা আস্থার প্রতীক।
মনোহরদী উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আমিনুর রহমান সরকার দোলন বলেন, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম ও রাজনৈতিক কর্মদক্ষতার মাধ্যমেই আজ তিনি এই অবস্থানে পৌঁছেছেন। মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম কর্মদিবসেই নরসিংদীবাসীর স্বার্থ বিবেচনা করে একটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য চিঠি ইস্যু করা তার দূরদর্শিতা ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
