নারীর গলিত লাশ উদ্ধার, সন্দেহের তির সাবেক সেনা কর্মকর্তার দিকে
Advertisement
প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৩০ পিএম
প্রতীকী ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজধানীর জুরাইনে শারমিন আক্তার শেলী (২৬) হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। হত্যার পর শেলীর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের হোয়াটসঅ্যাপে সন্দেহভাজন খুনিসহ একাধিক ব্যক্তির মধ্যে চ্যাট হওয়ার বিষয়টি সামনে আসায় রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, হত্যার পর কীভাবে ওই ফোনে বার্তা আদান-প্রদান হলো—তা নিয়ে তদন্ত চলছে। এ ঘটনার জট খুলতে মাঠে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ইতোমধ্যে তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্যও পেয়েছেন কর্মকর্তারা।
তদন্তে জানা গেছে, এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে শেলীর কথিত স্বামী আব্দুল্লাহ আল মামুন জড়িত থাকতে পারেন। চাকরিচ্যুত এই সেনা কর্মকর্তা হত্যার দায় এড়াতে ও নিজেকে আড়াল করতেই ভিন্ন কৌশলে হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটিংয়ের ঘটনা ঘটিয়েছেন বলে ধারণা করছে পুলিশ।
সোমবার আব্দুল্লাহ আল মামুনকে গ্রেফতার করা হয়। পরে আদালত তাকে দুই দিনের রিমান্ডে পাঠানোর নির্দেশ দেন। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচিত হতে পারে।
রোববার দুপুরে কদমতলী থানার জুরাইন কমিশনার মোড়ের ৯৮৪/১ নম্বর বাসার চতুর্থতলার ফ্ল্যাট থেকে শেলীর গলিত লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় শেলীর মা সাহানা বেগম কদমতলী থানায় মামলা করেছেন। এতে মামুনকে আসামি করা হয়েছে। বাড়িওয়ালা জানান, ৮-৯ মাস আগে শেলী ও মামুন স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে ফ্ল্যাটটি ভাড়া নেন।
জানতে চাইলে পুলিশের ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মল্লিক আহসান উদ্দিন সামী যুগান্তরকে বলেন, স্বামী পরিচয়ে বাসা ভাড়া নেওয়া মামুনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালত দুদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, বাসার সিসিটিভি ফুটেজ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২১ এপ্রিল রাতে মামুন ওই ফ্ল্যাটে যান এবং পরদিন সকাল সাড়ে ৮টার দিকে বেরিয়ে আসেন। বাইরে থেকে তাতে তালা দেওয়া হয়। ২৩ এপ্রিল ফ্ল্যাট থেকে দুর্গন্ধ বের হলে অন্য ভাড়াটিয়ারা বিষয়টি বাড়িওয়ালাকে জানায়। বাড়িওয়ালা শেলীর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে এসএমএস করে দুর্গন্ধের বিষয়টি জানান। তখন ওই ফোন থেকে উত্তর আসে- ‘তিনি বাইরে আছেন এবং বাসায় ফিরে দুর্গন্ধের কারণ খুঁজে বের করবেন।’ সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে-২১ এপ্রিল ছাড়াও আরও একদিন মামুন ওই ফ্ল্যাটে যান। মূলত বাড়িওয়ালা দুর্গন্ধের কথা বলায় তিনি বাসায় গিয়ে ব্লিচিং পাউডার ছিটিয়ে আসেন। লাশ উদ্ধারের সময় ঘরের ভেতরে ব্লিচিং পাউডার ছিটানো দেখা গেছে।
মামলার তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২২ এপ্রিল থেকে ২৬ এপ্রিল সময়ের মধ্যে শেলীকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার পর তার ব্যবহৃত ফোনটি নিয়ে যায় ঘাতক। এরপর এ ফোনে হোয়াটসঅ্যাপে বাড়িওয়ালাসহ কয়েকজনের সঙ্গে চ্যাট করা হয়। তারা আরও বলেন, ২২ এপ্রিল শেলী খুন হয়ে থাকলে তার ফোন দিয়ে পরবর্তী কয়েক দিন কীভাবে চ্যাট করা হলো-সেই চ্যাট কে করল-এসব বিষয় সামনে রেখে মাঠে নামে তদন্ত টিম। তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণে দেখা যায়-শেলীর মোবাইল ফোনের সর্বশেষ লোকেশন ছিল পল্লবীর স্বপ্নধারা আবাসিক এলাকা। একই এলাকায় মামুনের বাসা। পল্লবী থেকে বাড়িওয়ালার সঙ্গে চ্যাট করা হয়েছে। এমনকি অভিযুক্ত মামুন নিজেই সেটির উত্তর দিয়েছেন। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মামুন প্রযুক্তিতে অনেক দক্ষ। খুনের পর ধরা পড়া ও নিজের সম্পৃক্ততার বিষয়টি এড়িয়ে যেতেই তিনি শেলীর সঙ্গে চ্যাটের নাটক সাজিয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, মেজর হিসাবে মামুন কর্মরত ছিলেন। তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে মামুনের ছাড়াছাড়ি হয়েছে। সেই সংসারে তার দুটি সন্তান রয়েছে। শেলীরও আগে বিয়ে হয় এবং সে সংসারে একটি সন্তান রয়েছে। ২০২৩ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে শেলীর সঙ্গে মামুনের পরিচয় হয়। বিভিন্ন সময়ে তারা একত্রে থেকেছেন। ৮-৯ মাস আগে তারা স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে কদমতলীতে বাসা ভাড়া নেন। জিজ্ঞাসাবাদে শেলীর বাসায় আসা-যাওয়া, থাকা ও শারীরিক সম্পর্ক হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন মামুন। তদন্তে পুলিশ আরও জানতে পারে-শেলীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়ালেও দুজনের সামাজিক মর্যাদা এক না হওয়ায় তাকে বিয়ে করেননি মামুন। এর মধ্যে অন্য নারীকে বিয়ে করে মামুন পল্লবীতে বসবাস করছেন। নতুন সংসারে মাসখানেক আগে তার সন্তান হয়েছে। অন্যত্র বিয়ে করলেও শেলীর সঙ্গে সম্পর্ক চালিয়ে যান মামুন।
মামলার এজাহারে শেলীর মা শাহানা বলেছেন, তাদের গ্রামের বাড়ি বরিশালের বাকেরগঞ্জে। মেয়ের সঙ্গে তার প্রায় যোগাযোগ হতো। অসুস্থ অবস্থায় শেলী মামুনকে সঙ্গে তার (মায়ের) বাসায় বেড়াতে আসে। তখন শেলী তাকে জানায়, বিয়ের জন্য মামুনকে চাপ দেওয়ায় তাকে মারধর করা হয়েছে। এমনকি মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, ৩-৪ দিন মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তিনি পারেননি। পরে খবর পান-শেলীকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছে।

