বারবার উদ্যোগেও মেলেনি স্থায়ী সুফল
ঢাকার বাসে শৃঙ্খলার পথে পুরোনো বাধা
রাজনৈতিক সদিচ্ছায় এবার বাস্তবায়নের প্রত্যাশা * সরকারের কাছে ২০০ থেকে ৫০০ নতুন বাস চান মালিকরা * ছয় মাসে ৩২ রুটে শৃঙ্খলা দৃশ্যমান হবে : সড়কমন্ত্রী * যাত্রী ধরার ওপর চালক-সহকারীর আয়ে লাগামের পরামর্শ
Advertisement
যাত্রী উঠানোর প্রতিযোগিতায় রাজধানীর সড়কে যেখানে সেখানে এলোমেলোভাবে বাস দাঁড় করানো হয়। এতে গণপরিবহণের গতি কমার পাশাপাশি যাত্রাপথে তৈরি হয় চরম বিশৃঙ্খলা। যেন দেখার কেউ নেই। উত্তরার আজমপুর থেকে তোলা -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ঢাকার বাসে শৃঙ্খলা ফেরানোর আলোচনা যখন নতুন গতি পেয়েছে, তখনই দুই বাসের গতির লড়াইয়ের মধ্যে পড়ে প্রাণ গেল আরেক পথচারীর। সোমবার টিকাটুলিতে রাস্তা পার হওয়ার সময় দোয়েল পরিবহণের বাসের ধাক্কায় নিহত হন রীনা রানী ঘোষ (৪০)। পরিবারের অভিযোগ, দোয়েল ও বন্ধন পরিবহণের বাসের বেপরোয়া গতির মধ্যে পড়েন তিনি। পুলিশ দোয়েলের বাসটি জব্দ এবং চালককে আটক করেছে।
এ মৃত্যু ফিরিয়ে আনে পুরোনো ক্ষত। ২০১৮ সালের এপ্রিলে কাওরান বাজারে দুই বাসের চাপে হাত হারান তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী রাজীব হোসেন। কিছুদিন পর তিনি মারা যান। একই বছরের জুলাইয়ে বিমানবন্দর সড়কে বাসের রেষারেষিতে নিহত হন শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী দিয়া খানম মিম ও আবদুল করিম রাজীব। এরপর নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাগুলোর পরিস্থিতি আলাদা হলেও প্রশ্ন একটাই-যাত্রী ধরার অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ করে নিরাপদ বাসসেবা নিশ্চিত হবে কবে?
৮ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সভায় সাত কার্যদিবসে দুটি রুট র্যাশনালাইজেশন (পুনর্বিন্যাস) করে বাস চালু, দুই মাসে ৩২ রুট র্যাশনালাইজেশন এবং ছয় মাসে পুরো ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্য নেওয়া হয়। বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ঢাকা পরিবহণ সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ), ঢাকা মহানগর পুলিশ ও বাসমালিক সমিতিকে। তবে আগের অভিজ্ঞতা বলছে, রুট র্যাশনালাইজেশন করেও মালিকদের এক ব্যবস্থাপনায় আনা যায়নি। অর্থায়ন ও সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের সমস্যাও রয়ে গেছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও গণপরিবহণ বিশেষজ্ঞ ড. মো. শামসুল হক যুগান্তরকে বলেন, ‘ঢাকায় বাস রুট র্যাশনালাইজেশনের কোনো বিকল্প নেই। এর কারিগরি সমাধান ২০০৫ সালে করা হয়েছে, বিস্তারিত করা হয় ২০১৩ সালে। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ায় আশা করা যায়, এবার বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।’
পাশাপাশি তিনি ঘাটারচর রুটের নগর পরিবহণের ব্যর্থতার কারণ বিশ্লেষণ করে চ্যালেঞ্জগুলোর সমাধানের পরামর্শ দেন। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম যুগান্তরকে বলেন, ‘সরকারের উদ্যোগ বাস্তবায়নে পরিবহণ মালিকরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করবেন। তবে আমরা সরকারের কাছে ২০০ থেকে ৫০০ নতুন বাস দাবি করছি। তাহলে উদ্যোগটি বাস্তবায়ন সহজ হবে। এ ব্যাপারে এখনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।’
আনিসুল হকের পরিকল্পনায় ছিল বিনিয়োগের ব্যবস্থা : ২০১৫ সালে ঢাকার তৎকালীন মেয়র আনিসুল হক বিভিন্ন মালিকের বাস কয়েকটি কোম্পানির অধীনে আনার উদ্যোগ নেন। ২০১৭ সালে তার মৃত্যুর পর সেই প্রচেষ্টার গতি কমে যায়। পরে মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন ও শেখ ফজলে নূর তাপসের নেতৃত্বে বাস্তবায়নের চেষ্টা হয়। প্রাথমিক পরিকল্পনায় ১ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব ছিল।
এর মধ্যে নতুন বাস কেনায় ৬৫০ কোটি টাকা ভর্তুকি এবং বাকি অর্থ অবকাঠামোয় ব্যয়ের কথা ছিল। মালিকদের স্বল্পসুদে ঋণের প্রস্তাবও ছিল। ২০২১ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্ষদ ১০০ কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। তবে পুরোনো বাস কেনা এবং নতুন বাসের অর্থায়ন নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হয়। পরিবহণ বিশেষজ্ঞ ড. এসএম সালাহউদ্দিনের তৎকালীন বক্তব্য ছিল, পুরোনো বাস কিনে নেওয়া ও স্বল্পসুদে ঋণের পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছেন দায়িত্বপ্রাপ্তরা।
মেয়র তাপসের অবস্থান ছিল, এত ভর্তুকি সম্ভব নয়; সেবার মান বাড়াতে নতুন বাস প্রয়োজন। ২০২১ সালের ২৬ ডিসেম্বর ঘাটারচর কাঁচপুরে নগর পরিবহণ চালু হয়। পরের বছর আরও দুটি রুট যুক্ত হয়। কিন্তু একই পথে অন্য বাসের চলাচল বন্ধ হয়নি। প্রতিযোগিতা ও লোকসানে বেসরকারি বাস সরে যায়। ফলে কোম্পানিভিত্তিক সেবার উদ্দেশ্য পূরণ হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও টেকেনি নতুন চেষ্টা : অন্তর্বর্তী সরকারের সময় উদ্যোগটি আবার নেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি গাবতলী থেকে চাষাঢ়া রুটে ৩৫টি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাস নামে। সেই সেবাও পরে বন্ধ হয়। কাউন্টার ও ই-টিকিটিংভিত্তিক গোলাপি বাসেও প্রত্যাশিত সুফল মেলেনি।
তখন কাউন্টারভিত্তিক পরিচালনা নিয়ে ডিটিসিএ, মালিকপক্ষ ও পুলিশের ভিন্ন অবস্থান প্রকাশ পায়। কমিটির বাইরে কার্যক্রম শুরুর অভিযোগ করে ডিটিসিএ। মালিকরা বলেন, কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে সুফল না পাওয়ায় ব্যবস্থা নিয়েছেন তারা। পুলিশ জানায়, সিদ্ধান্ত অমান্য হয়নি। এ মতপার্থক্য সমন্বয়ের দুর্বলতা সামনে আনে।
সমীক্ষা এগোলেও পরিচালনার হিসাব অস্পষ্ট : ডিটিসিএ-এর হিসাবে, অনুমোদিত ৪১৮ রুটের মধ্যে সচল রয়েছে ৯৮টি। এগুলো সমন্বয় করে ৩২ রুট করার পরিকল্পনা হয়েছে। ৬৬ কোম্পানির প্রায় সাড়ে সাত হাজার বাসের তথ্য রয়েছে। সমীক্ষায় সংযোগকারী বাস, ডিপো, পার্কিং ও টার্মিনালের প্রয়োজনও উঠে এসেছে।
ডিটিসিএ-এর ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ার ধ্রুব আলম যুগান্তরকে বলেন, ‘যাত্রীচাহিদা অনুযায়ী প্রতিটি রুটে বাসের সংখ্যা নির্ধারণ করা হবে। রুটভিত্তিক ব্যবসায়িক কাঠামো তৈরির কাজ চলছে। বাসের তালিকা ও অবস্থা যাচাইয়ের পর যোগ্য বাস চলাচলের সুযোগ পাবে।’ তবে মালিকদের বিনিয়োগ ও পরিচালনব্যয় আলাদা হলে আয় বণ্টন কীভাবে হবে, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। চালক-সহকারীর আয় যাত্রী ধরার ওপর নির্ভর করলে প্রতিযোগিতাও কমবে না।
নিয়মিত বেতন ও জবাবদিহি জরুরি। অর্থায়নও বড় প্রশ্ন। বৈদ্যুতিক বাসের জন্য প্রস্তাবিত গণপরিবহণ তহবিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ সময়ে অনুমোদন পায়নি। পরিচালন ব্যয় ও ঘাটতি মেটানোর ব্যবস্থা না থাকলে আবার বাস প্রত্যাহারের ঝুঁকি থাকবে। ধ্রুব আলম বলেন, সরু সড়ক, অবৈধ দখল, নির্ধারিত স্টপেজে ওঠানামায় অনীহা ও ফিটনেসবিহীন বাস বড় চ্যালেঞ্জ।
ডিটিসিএ-এর নির্বাহী পরিচালক মাহাম্মদ মসিউর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ‘দ্রুত ৩২ রুটে কোম্পানিভিত্তিক বাস চলাচল শুরু করা হবে। তবে এটি একবারে নয়, ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।’ সড়ক পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম যুগান্তরকে বলেন, ‘ছয় মাসের মধ্যে ৩২ রুটে শৃঙ্খলা দৃশ্যমান হবে। তবে চক্রাকার ২৫টি রুটের বিষয়টি এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। ওই ব্যাপারে সিদ্ধান্ত পরে হবে।’

