Logo
Logo
×

Advertisement

শেষ পাতা

নাসিরাবাদে সাইফুলের বেপরোয়া চাঁদাবাজি

Advertisement

Icon

চট্টগ্রাম ব্যুরো

প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

কেউ বাড়ি নির্মাণ করলে, ইট-সিমেন্ট, রড-বালু কিনতে হবে তার কাছ থেকে। বাড়ি রং করালে কাজ দিতে হবে তার লোকজনদের। পুরোনো বাড়ি ভাঙার কাজও দিতে হবে তাকেই। গার্মেন্টের ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণও তার হাতে। তবে বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামেই তার সঙ্গে সব ধরনের হিসাবনিকাশ করতে হবে। কারখানায় পণ্যবাহী ট্রাক ঢুকলে তাকে চাঁদা দিতে হবে। এভাবে নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী ও নাসিরাবাদ শিল্প এলাকাজুড়ে চলছে বিএনপি (বহিষ্কৃত) নামধারী সাইফুল ইসলাম ওরফে বার্মা সাইফুলের চাঁদাবাজি। পুলিশের খাতায় একসময়ের শীর্ষ সন্ত্রাসী, দুই ডজন মামলার আসামি বার্মা সাইফুলের অত্যাচারে অতিষ্ঠ এখানকার সাধারণ মানুষ এবং ব্যবসায়ীরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাইফুলের কথা না শুনলেই আটক করা হয় পণ্যবাহী ট্রাক। সেখান থেকে লুটে নেওয়া হয় মালামাল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাইফুলের লোকজন আবার কখনো সাইফুল নিজেই হাজির হন ঘটনাস্থলে। চাঁদা না পেয়ে অনেক সময় ব্যবসায়ীদের বাড়িতেও দলবল নিয়ে হানা দেন সশস্ত্র সাইফুল।

বার্মা সাইফুল ও তার সহযোগীরা গত বছরের ১৮ নভেম্বর হাসান নামে এক এস্কেভেটর ব্যবসায়ীর কাছে চার লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। তিনি চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় সন্ত্রাসীরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তার নাসিরাবাদের অফিসে হাজির হন। এ ঘটনায় হাসান বার্মা সাইফুলসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে খুলশি থানায় মামলা করেন।

সাইফুলের লোকজন ৫ অক্টোবর গার্মেন্টস এক্সেসরিজ পণ্য-গামটেপবাহী একটি ট্রাক বায়েজিদ এলাকায় আটকে দেয়। এসব পণ্য চোরাই বলে তারা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা না দেয়ায় ট্রাক থেকে তারা বেশকিছু রোল বের করে নিয়ে যায়। এরপর খবর দেয়া হয় বায়েজিদ বোস্তামী থানা পুলিশকে। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, পণ্য চোরাই হলে সন্ত্রাসীরা ধরার কে। ধরবে পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট সংস্থা। কিন্তু দেখা গেছে, উলটো পুলিশ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে এক্সেসরিজবাহী ট্রাকটি থানায় নিয়ে যায়। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এই সন্ত্রাসী বাহিনীর ভয়ে অনেক শিল্পমালিক কারখানায় যান না। প্রতিনিধিদের দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। হিলভিউ আবাসিকে একটি ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেন প্লট মালিক। কিন্তু বার্মা সাইফুলের লোকজন গিয়ে কাজ বন্ধ করে দেন। তাদের দাবি ইট-বালি, সিমেন্ট-রড তাদের কাছ থেকেই নিতে হবে। অনন্যোপায় হয়ে তাদের মালামাল সরবরাহের কথা বললেও তারা দাবি করেন বাজারদরের চেয়ে অতিরিক্ত মূল্য। হিলভিউ আবাসিক সমিতির একাধিক নেতা ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এখানে ভবনে রং করতে হলে মিস্ত্রি নিতে হবে তাদের কাছ থেকে। ভবন ভাঙতে হলে কন্ট্রাক্টরের কাজ দিতে হবে তাদের। তাদের যন্ত্রণায় আবাসিক এলাকার বাসিন্দারা অতিষ্ঠ।

সাইফুল ইসলাম বায়েজিদ বোস্তামী থানার বার্মা কলোনির নুরুল আমিনের ছেলে। তার বিরুদ্ধে বায়েজিদ বোস্তামী থানা, খুলশি ও পাঁচলাইশ থানাসহ বিভিন্ন থানায় ৩৪টি মামলা রয়েছে। একসময়ে নগর ছাত্রদলের সহসভাপতি ছিলেন সাইফুল। তবে অপকর্মের কারণে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। সাইফুলের দুই ভাই সবুজ ওরফে বার্মা সবুজ ও মো. ফাহিম তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। তাদের নেতৃত্বে শতাধিক সদস্যের আলাদা বাহিনী রয়েছে। সবুজ পাঁচলাইশ থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক। তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে অন্তত ৩৫টির মতো। ২০১০ সালে চাঁদাবাজির মাধ্যমে অপরাধে হাতেখড়ি সাইফুলের। এরপর নানা অপরাধে জড়িয়ে কয়েকবার গ্রেফতার হন। কিন্তু প্রতিবার জামিনে বেরিয়ে আরও বেপরোয়া হয়েছেন। ২০২১ সালে তাকে গ্রেফতার করতে গেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে তার বন্দুকযুদ্ধ হয়। এতে গুলিবিদ্ধ হন সাইফুল। তার একটি পা কেটে ফেলতে হয়। এরপর কৃত্রিম পা সংযোজন করেন। সর্বশেষ ৫ জানুয়ারি ঢাকার ধানমন্ডি থেকে তিন সহযোগীসহ গ্রেফতার হন সাইফুল। ২৯টি সোনার বার ছিনতাইয়ের ঘটনায় তার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়। এরপর আবারও কারাগার থেকে বের হয়ে লিপ্ত হন অপকর্মে। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে সক্রিয় হন সাইফুল। নগরীর ষোলশহর এলাকায় জুয়ার আসর ও মাদকের ডেরা খোলেন। স্থানীয়দের সহায়তায় মাদকের আখড়া ও জুয়ার আসর বন্ধ করে পুলিশ। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সাইফুল ও তার বাহিনীর সদস্যরা ১২ জানুয়ারি দিন-দুপুরে লোকজনকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, নগরের বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ, খুলশী থানা ও আশপাশের এলাকায় জমি দখল, চাঁদাবাজি, ছিনতাইসহ সবকিছুরই নিয়ন্ত্রণ করেন তিন ভাই। অভিযোগ রয়েছে, বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন হিলভিউ আবাসিক এলাকার মুখে সরকারি জায়গা দখল করে সাইফুল একটি অফিস গড়ে তুলেছেন। সেই অফিসের আশপাশে কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে লাগানো হয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরা। অফিসে বসেই তিনি চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করেন। খোঁজ নিয়ে এবং সরেজমিন দেখা গেছে, তার অফিসের সামনে সবসময় ৩০-৪০টি মোটরসাইকেল, ১০-১২টি প্রাইভেটকার দাঁড়ানো থাকে। অফিস থেকে সবসময় দলবল ও বহর নিয়ে বের হন সাইফুল। যেন গুরুত্বপূর্ণ কোনো রাজনৈতিক নেতার শোডাউন।

বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সাইফুলের দুইটি মোবাইলে ফোন করে তা বন্ধ পাওয়া গেছে। অন্য কোনোভাবেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। এ কারণে তার বক্তব্য নেওয়া যায়নি।

সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজি থেকে রক্ষা ও ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি ও বিপিএএমইএ’র প্রথম সহসভাপতি বরাবর পৃথক চিঠি দিয়েছেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী ও তাদের সংগঠন। পুলিশ কমিশনারের কাছেও একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। এসব চিঠিতে বার্মা সাইফুলের নাম উল্লেখ করা না হলেও নাসিরাবাদে সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্যের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

বিএনপির নাম ভাঙিয়ে বার্মা সাইফুলের বেপরোয়া চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, তাকে একবার ছাত্রদল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। ৫ আগস্টের পর একবার গ্রেফতারও হয়েছে। জামিনে বের হয়ে যদি আবারও চাঁদাবাজি করে তবে ভুক্তভোগীরা আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারেন।

বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি ইখতিয়ার উদ্দিন বলেন, আমাদের কাছে অপরাধী শুধুই অপরাধী হিসাবে বিবেচিত। অপরাধীকে দলীয় বিবেচনায় দেখার সুযোগ নেই। সাইফুল নন, যে কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

শুধু অতিপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনে টিকে থাকার চেষ্টা বাজারজুড়ে শুধুই দীর্ঘশ্বাস

বাজারজুড়ে শুধুই দীর্ঘশ্বাস

মেগা সংস্কারে হারানো রূপে ‘সিন্দুরমতি’

মেগা সংস্কারে হারানো রূপে ‘সিন্দুরমতি’

অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আইএমএফের বৈঠক আর্থিক খাত সংস্কারের শর্তে মিলবে ঋণ

আর্থিক খাত সংস্কারের শর্তে মিলবে ঋণ

নাসিরাবাদে সাইফুলের বেপরোয়া চাঁদাবাজি

নাসিরাবাদে সাইফুলের বেপরোয়া চাঁদাবাজি

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম