Logo
Logo
×

Advertisement

শেষ পাতা

শুধু অতিপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনে টিকে থাকার চেষ্টা

বাজারজুড়ে শুধুই দীর্ঘশ্বাস

Advertisement

Icon

ইয়াসিন রহমান

প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

নিত্যপণ্যের দাম লাগামহীন। গ্যাস-বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, পরিবহণ, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা আর সন্তানের শিক্ষা ব্যয় বাড়ছে হু হু করে। এমন বাড়তি খরচের চাপে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষ। আয় না বাড়লেও প্রতিনিয়ত বাড়ছে সংসার চালানোর খরচ। পরিস্থিতি এমন-৪০ থেকে ৭০ হাজার টাকা মাসিক আয় করেও চার-পাঁচ সদস্যের পরিবারের ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন অনেকে। খোদ সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, এক বছর আগে ৩০ হাজার টাকায় যে পরিবার মাস পার করত, বর্তমানে সেই অর্থে চলছে মাত্র ২৭.৭ দিন। পাশাপাশি সার্বিক মূল্যস্ফীতি মজুরি বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে যাওয়ায় সঞ্চয় ভেঙে ধারদেনা করে দিন পার করছেন অনেকে। ব্যয় সংকোচনে চাহিদা পণ্য কেনা বাদ দিয়েছেন অনেকেই। এতে পুষ্টিতে টান পড়েছে। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে গিয়ে এভাবে ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। কেউ কেউ শহর ছেড়ে গ্রামে ফেরার মতো কঠিন সিদ্ধান্তও নিতে বাধ্য হচ্ছেন। আবার কেউ ব্যয় কমাতে পরিবার গ্রামে পাঠিয়ে নিজে শহরে থাকছেন। বাড়ছে টিকে থাকার লড়াই।

এদিকে দেশের সাধারণ মানুষের আর্থিক দৈন্যের শেষ নেই। বেসামাল বাজার পরিস্থিতি সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে ফেলে দিয়েছে চরম সংকটে। এরমধ্যে দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতে পড়েছে মধ্য ও নিুবিত্ত পরিবারগুলো। তাদের আয় বাড়েনি, বেড়েছে কেবল ব্যয়। এসব পরিবারের গল্প এমন জায়গায় ঠেকেছে, কাউকেই অভাবের কথাও বলতে পারছেন না। অনেক পরিবারে মেহমানদারিও বন্ধ হয়ে গেছে। রাজধানীর কমিউনিটি সেন্টারগুলোয় আগের মতো আর বিয়ের অনুষ্ঠানও হচ্ছে না। এ সংকট যে গত এক বছরের, এমনটি নয়। কয়েক বছর ধরেই এমন নাজুক পরিস্থিতির ওপর দিয়ে যাচ্ছে এসব পরিবারের জীবন। এছাড়া যারা দিন এনে দিন খান, তাদের কষ্ট বর্ণনা করার মতো নয়।

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) বুধবারের হালনাগাদ তথ্যমতে, রাজধানীর খুচরা বাজারে বছরের ব্যবধানে প্রতি কজি আটা-ময়দার ১২.৫০ থেকে ২৫ শতাংশ দাম বেড়েছে। প্রতি লিটার খোলা ও বোতলজাত সয়াবিন তেল ৬.৫৩ থেকে ১০.৫১ শতাংশ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এ সময়ের মধ্যে প্রতি কেজি আলুর দাম বেড়েছে ২২.২২ শতাংশ। কেজিপ্রতি গরুর মাংস ৭.৮৪ শতাংশ, খাসি ১৫.৯১, ব্রয়লার মুরগি ২.৭৮ ও দেশি মুরগির দাম বছরের ব্যবধানে ১২.৫০ শতাংশ বেড়েছে। পাশাপাশি প্রতি কেজি চিনির দাম বেড়েছে ৪.৬৬ শতাংশ, লবণ ১৬.৮৮ ও হালিপ্রতি ডিম ২.১১ শতাংশ দাম বেড়ে বিক্রি হচ্ছে। খুচরা পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে ৬০০-৭০০ টাকা। ৬০০ ইউনিটের বেশি প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১৪.৬১ টাকা থেকে বেড়ে ১৭.৩৫ টাকা হয়েছে। লিটারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে বছরে ৩৩-৪৩ টাকা।

বিবিএস প্রকাশিত ভোক্তা মূল্যসূচকের (সিপিআই) হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮.৩৪ শতাংশে উঠেছিল। একই সময়ে কমেছে মজুরি বৃদ্ধির হার। অর্থাৎ মানুষের ব্যয়ের চাপ বাড়লেও সেই তুলনায় আয় বাড়ার গতি কমেছে। মূল্যস্ফীতি ৮.৩৪ শতাংশের অর্থ হলো, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে যে পণ্য কিনতে ১০০ টাকা খরচ হয়েছিল, একই পণ্য কিনতে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে খরচ করতে হয়েছে ১০৮ টাকা ৩৪ পয়সা। এক বছরে আগে ৩০ হাজার টাকায় যে পরিবার মাস পার করত, বর্তমানে সেই অর্থে চলছে মাত্র ২৭.৭ দিন। সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮.৩৪ শতাংশের বিপরীতে মজুরি বৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৭.৯০ শতাংশ।

রাজধানীর কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়া এলাকার বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। মাসে পান ৪৫ হাজার টাকা। মা, স্ত্রী ও এক ছেলে নিয়ে তার সংসার। পরিবারের খাবার জোগাড় করতে মাসে ৫০ কেজির এক বস্তা চাল ৩ হাজার ২০০, পাঁচ লিটার তেল ১০০০, বাসাভাড়া ১৪ হাজার, বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল ৩ হাজার, সবজি, মাছ, ব্রয়লার মুরগিসহ তরকারি ও রান্নার উপকরণ কিনতে ৭ হাজার, সাবান-ডিটারজেন্ট ও শ্যাম্পু ৭০০, মুদি বাজার আরও ২ হাজার এবং মোবাইল টকটাইমে খরচ ও ইন্টারনেট বিল ১২০০ টাকা ব্যয় হয়। পাশাপাশি সন্তানের শিক্ষাব্যয় ৭ হাজার, পরিবারের যাতায়াত ব্যয় ৫ হাজার এবং মাসে গড়ে চিকিৎসা ব্যয় ২ হাজার টাকা ধরে ৪৬ হাজার ২৫ টাকা ব্যয় হয় তার। প্রতি মাসে তার ঘাটতি থাকে কম হলেও ১ হাজার ২৫ টাকা। তিনি বলেন, বেতন দিয়ে মাস চালাতে পারছি না, ফলে একটু ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছি। তিনি জানান, আগে মাঝেমধ্যে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘুরতে বের হলেও এখন তা পারছি না। ফলে কেনাকাটা কমিয়ে দিয়েছি। খাদ্যপণ্য কম করে কিনছি।

একই দশা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা হামিদুর রহমানের। দুই ছেলে, স্ত্রী ও বৃদ্ধ মাকে নিয়ে থাকেন মালিবাগে। বেতন পান ৭১ হাজার ৫০০ টাকা। ২ বছর আগে এ টাকায় বেশ ভালোই চলতেন। কিন্তু এখন আর পারছেন না।

কাওরান বাজারে কথা হয় দিনমজুর জহিরুলের সঙ্গে। তিনি বলেন, যেদিন কাজ পাই সেদিন ৬০০-৮০০ টাকা মজুরি পাই-যা ছয় বছর ধরে একই। মজুরি বাড়েনি। সব মিলে মাসে ১৫-১৬ হাজার টাকা আয় হয়। আমি ঢাকায় একটি মেসে থাকি। সেখানে ৬ হাজার টাকা দিতে হয়। খাবার ও অন্যান্য খরচ ৩ হাজার টাকা রেখে বাকি টাকা গ্রামে পাঠাই। সব মিলে সামনে কীভাবে সংসার চালাব, বুঝতে পারছি না। তাই কেনাকাটা কমিয়ে দিয়েছি। কারণ বাজারদরের দিকে হিসাব করলে আমার ক্রয়ক্ষতা অনেক কমেছে।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ব্যয় বাড়ছে। সেই ব্যয়বৃদ্ধিও সমস্যা হতো না যদি একই হারে আয় বাড়ত। আয় বাড়েনি। এতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। এক্ষেত্রে মানুষ টিকে থাকার জন্য সঞ্চয় ভেঙে অথবা ঋণ করতে হচ্ছে। কিন্তু যারা দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন তাদের তো কোনো সঞ্চয় নেই। কিংবা কেউ ধারও দেন না। এ অবস্থায় তারা আরও খারাপ অবস্থায় আছেন। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, প্রতিবছর পণ্য ও সেবার দাম বাড়ছে। কিন্তু সেভাবে আয় বাড়ছে না। অনেকে অপরিহার্য পণ্য ছাড়া অন্য কিছু কেনা বাদ দিয়েছেন। জীবনসংগ্রামে বেঁচে থাকার তাগিদে বাধ্য হয়ে কেউ কেউ শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যাচ্ছেন। তাই সংশ্লিষ্টদের উচিত পণ্য ও সেবার দাম কীভাবে কমানো যায় তা চেষ্টা করা।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

শুধু অতিপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনে টিকে থাকার চেষ্টা বাজারজুড়ে শুধুই দীর্ঘশ্বাস

বাজারজুড়ে শুধুই দীর্ঘশ্বাস

মেগা সংস্কারে হারানো রূপে ‘সিন্দুরমতি’

মেগা সংস্কারে হারানো রূপে ‘সিন্দুরমতি’

অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আইএমএফের বৈঠক আর্থিক খাত সংস্কারের শর্তে মিলবে ঋণ

আর্থিক খাত সংস্কারের শর্তে মিলবে ঋণ

নাসিরাবাদে সাইফুলের বেপরোয়া চাঁদাবাজি

নাসিরাবাদে সাইফুলের বেপরোয়া চাঁদাবাজি

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম