সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে: চিফ হুইপ
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ১১:৩১ পিএম
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি। ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশে বাসাবাড়িতে স্থাপিত অর্ধেক সোলার সিস্টেমই এখন অকার্যকর। ৬৯ লাখ সোলার হোম সিস্টেমের মধ্যে ৩০ লাখ কাজ করছে না। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া জাতীয় গ্রিড এই সোলার সম্প্রসারণ করায় এই বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে সিপিডি আয়োজিত 'পাকিস্তানে সৌর বিপ্লব: জাতীয় বাজেটের দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা' শীর্ষক সংলাপে এসব তথ্য উঠে আসে। এতে বেশকিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির (সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ) গবেষণায় উঠে আসা তথ্যের বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের নীতিগত সমন্বয়হীনতার কারণে এই খাতে বিনিয়োগের বড় অংশ অকার্যকর হয়েছে। একই সঙ্গে সোলার সিস্টেম প্রকল্পের নষ্ট ব্যাটারি ও প্যানেল নতুন পরিবেশগত ঝুঁকিও তৈরি করছে।
সিপিডির সংলাপে পাকিস্তানের নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থা 'রিনিউয়েবলস ফার্স্ট'-এর প্রধান কর্মসূচি ও উদ্যোগ বিশেষজ্ঞ ব্যবস্থাপক মুহাম্মদ বাসিত গৌরী 'সোলার রাশ' শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সৌরবিদ্যুতের নতুন এক রূপান্তরের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। তবে উচ্চকর, অর্থায়নের সংকট এবং নীতিগত জটিলতা এই রূপান্তরের বড় বাধা।
সিপিডির 'এসএইচএস সার্ভে ২০২৫' অনুযায়ী, ২০০৩ সালে অবকাঠামো উন্নয়ন কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল) বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও জাইকার অর্থায়নে প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকায় বিদ্যুৎ পৌঁছানোর লক্ষ্যে সোলার হোম সিস্টেম কর্মসূচি শুরু করে। প্রায় ৩০টি সহযোগী এনজিওর মাধ্যমে পরিচালিত এ কর্মসূচি একসময় বিশ্বের বৃহত্তম অফগ্রিড সৌর কর্মসূচিতে পরিণত হয় এবং দুই কোটিরও বেশি মানুষকে বিদ্যুতের আওতায় আনা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৩ সালে এক বছরে রেকর্ড ৮ লাখ ৫৩ হাজার সোলার হোম সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া জাতীয় গ্রিডের দ্রুত সম্প্রসারণ শুরু হলে সোলারের চাহিদা কমতে থাকে। ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে দেশজুড়ে গ্রিড সম্প্রসারণের ফলে সোলার হোম সিস্টেমের প্রাসঙ্গিকতা দ্রুত কমে যায়। এর চূড়ান্ত প্রভাব দেখা যায় ২০১৮ সালে, যখন বার্ষিক নতুন সোলার স্থাপন ৯৯ দশমিক ৬ শতাংশ কমে মাত্র ৩ হাজার ৪৫৫টিতে নেমে আসে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশে স্থাপিত সোলার হোম সিস্টেমের প্রায় ৪৭ শতাংশ অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৩০ লাখ বা তারও বেশি সিস্টেম ব্যবহার অনুপযোগী। এ ব্যবস্থাকে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত বা আধুনিকায়নের জন্য কোনো রূপান্তরমুখী নির্দেশিকাও তৈরি হয়নি। ফলে নষ্ট ব্যাটারি ও প্যানেল গ্রামীণ এলাকায় পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি করছে।
তবে অফগ্রিড সোলারের চাহিদা কমলেও দেশে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের বিস্তার নীরবে বাড়ছে। সিপিডির গবেষণা সহযোগী আতিকুজ্জামান সাজিদ জানান, বর্তমানে দেশে নেট-মিটারিংভিত্তিক ৪ হাজার ৫৫১টি রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনা রয়েছে, যার মোট সক্ষমতা ২১৩ দশমিক ৩ মেগাওয়াট। শুধু ২০২৫ সালেই ১ হাজার ৫৩১টি নতুন স্থাপনা যুক্ত হয়েছে। দেশের মোট রুফটপ সৌরবিদ্যুতের ৬০ দশমিক ৪ শতাংশ ঢাকা বিভাগে কেন্দ্রীভূত।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অনেক দূর যেতে হবে। এক্ষেত্রে পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে।
দেশটি দেখিয়েছে কীভাবে জ্বালানি সংকটকে সুযোগে পরিণত করা যায়।
মোয়াজ্জেম জানান, বর্তমানে পাকিস্তানের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪১ শতাংশ আসে জীবাশ্য জ্বালানির বাইরে থেকে। এর মধ্যে ২৫ শতাংশ জলবিদ্যুৎ, ৯ শতাংশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ এবং ৭ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদিত হয়। তিনি বলেন, সরকারি সব প্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে প্রায় ৩ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাতিল হওয়া ৩১টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প পুনর্বিবেচনা করছে বর্তমান সরকার। এগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। দেশের টেকসই ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি একটি কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও এ খাতকে গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বর্তমানে চীন সফরে রয়েছেন। এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হলেও সৌরবিদ্যুৎ খাতে চীনের সঙ্গে বড় ধরনের একটি চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
চিফ হুইপ জানান, জাতীয় সংসদ ভবনেও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার শুরু হয়েছে। সরকার ইতোমধ্যে সব সরকারি ভবনের ছাদ এবং শিল্পকারখানাগুলোকে সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি গ্রামীণ মানুষের উপকারে এবং সেচ খরচ কমাতে সারা দেশের সেচপাম্প ও টিউবওয়েলগুলোকে ধাপে ধাপে সৌরশক্তিচালিত ব্যবস্থায় রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংলাপে রিনিউয়েবল এনার্জি ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (ইডকল) সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট আসিফ শাহরিয়ার জানান, আগামী পাঁচ বছরে ৫ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।
সংলাপ শেষে অংশগ্রহণকারী উদ্যোক্তা, শিক্ষাবিদ, বিনিয়োগকারী ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা সৌর প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারির ওপর শুল্ক প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনা, আবাসিক গ্রাহকদের জন্য নেট মিটারিং ব্যবস্থা সহজ ও ডিজিটাল করা, সৌর প্রকল্পে সহজ অর্থায়নের সুযোগ সৃষ্টি, সৌরসম্পদকে ব্যাংক ঋণের জামানত হিসাবে গ্রহণের ব্যবস্থা করা এবং পুরোনো সোলার হোম সিস্টেমগুলোকে হাইব্রিড বা গ্রিডসংযুক্ত ব্যবস্থায় রূপান্তরের দাবি জানান। তাদের মতে, পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে-সঠিক নীতি, কর-সুবিধা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে সৌরবিদ্যুৎ শুধু বিদ্যুৎ ঘাটতি কমাবে না, আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে সক্ষম হবে।

