Logo
Logo
×

Advertisement

জাতীয়

হাসিনা চাইলেই কী দেশে ফিরতে পারবেন?

Advertisement

Icon

বিবিসি বাংলা

প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৩৮ পিএম

হাসিনা চাইলেই কী দেশে ফিরতে পারবেন?

শেখ হাসিনা। ফাইল ছবি

Advertisement

ভারতের নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের পর তার দেশে ফেরার বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। তিনি আসলে ফিরবেন কিনা, আর ফিরলে কবে ফিরবেন, কীভাবে ফিরবেন, ফিরলেই বা কী হবে- এই প্রশ্নগুলোই আসছে আলোচনায়।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর গত দুই বছরে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি একাধিকবার আলোচনায় আসলেও, এবারই প্রথম একটি সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন তিনি।

একদিকে শেখ হাসিনা যেমন দেশে ফেরার কথা বলেছেন, অন্যদিকে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রত্যর্পণ চুক্তির মাধ্যমে তাকে ভারত থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার কথা বলছে বর্তমান সরকার।

অতীতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও ভারতকে এ বিষয়ে বলা হয়েছিল। কিন্তু এ নিয়ে কখনই তেমন কোনো মন্তব্য করেনি প্রতিবেশী দেশটি। বরং প্রত্যর্পণ চুক্তিতে থাকা বিভিন্ন শর্ত ব্যবহার করে তাকে ফেরত দেওয়ার বিষয়টি ভারত যে এড়িয়ে যেতে পারে, এ নিয়ে নানা বিশ্লেষণ এসেছে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে।

আইন অনুযায়ী নিজে থেকে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়ে কোনো বাধা দেখছেন না আইন বিশেষজ্ঞরা। এ ক্ষেত্রে দেশে আসার পর আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই তাকে যেতে হবে। অবশ্য শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি যতটা না আইনি, তার থেকে বেশি রাজনৈতিক বলেই মনে করেন রাজনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।

এ ছাড়া বাংলাদেশ ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয়টিও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলেই মত তাদের। অর্থাৎ আইনি নানা প্রক্রিয়া থাকলেও, দিন শেষে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক দেনদরবারের ওপরই সবকিছু নির্ভর করছে।

যদিও এই মুহূর্তে বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় শেখ হাসিনা আসলেই দেশে ফিরতে চান কিনা, এমন প্রশ্নও তুলেছেন বিশ্লেষকদের কেউ কেউ। রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবেই বারবার দেশে ফেরার বিষয়টি তিনি সামনে আনছেন কিনা, এ নিয়েও ভাববার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন তারা।

প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া কী?

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২০১৩ সাল থেকেই একটি ‘প্রত্যর্পণ চুক্তি’ রয়েছে। ২০১৬ সালে যা সংশোধন করে প্রক্রিয়াটি আরও সহজ করা হয়েছিল। ওই চুক্তিতে প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া কী হবে, কোন কোন অপরাধে ফেরত পাঠানো যাবে- এমন নানা বিষয় উল্লেখ রয়েছে।

মূলত, ভারত ও বাংলাদেশ অপরাধীদের ধরপাকড় এবং সন্ত্রাস দমনে একে অপরকে সাহায্য করার জন্যই ২০১৩ সালে এই চুক্তি সই করেছিল। চুক্তি অনুসারে, যদি কোনো অপরাধী এক দেশে অপরাধ করে অন্য দেশে পালিয়ে যায়, তাহলে তাকে ধরে আগের দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য দুই দেশ একে অপরকে সাহায্য করবে।

এই চুক্তিতে কাউকে ফেরত আনার ক্ষেত্রে অপরাধীর শাস্তি হতে হবে কমপক্ষে এক বছর। এমনকি অপরাধ করার চেষ্টা বা সাহায্য করার অভিযোগ থাকলেও ফেরত পাঠানো যাবে। তবে ওই চুক্তিতে এমন কতগুলো বিধান বা শর্ত আছে, যা ব্যবহার করে প্রত্যর্পণের অনুরোধ প্রত্যাখ্যানের সুযোগও রয়েছে বলেই মনে করেন আইন বিশেষজ্ঞদের অনেকে। চুক্তি অনুসারে, যাকে হস্তান্তরের জন্য অনুরোধ জানানো হচ্ছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগটা যদি ‘রাজনৈতিক প্রকৃতি’র হয়, তাহলে সেই অনুরোধ খারিজ করা যাবে।

তবে, কোন কোন অপরাধের অভিযোগকে ‘রাজনৈতিক’ বলা যাবে না, সেই তালিকাও বেশ লম্বা। এর মধ্যে হত্যা, গুম, অনিচ্ছাকৃত হত্যা ঘটানো, বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো ও সন্ত্রাসবাদের মতো নানা অপরাধ আছে।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে হত্যা, গণহত্যা, গুম ও নির্যাতনের একাধিক মামলা হয়েছে। এই অভিযোগগুলো যেহেতু ফৌজদারি অপরাধের সঙ্গে জড়িত, তাই চুক্তির আওতায় একে ‘রাজনৈতিক মামলা’ বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন।

এছাড়া, ২০১৬ সালে এই চুক্তিটি সংশোধনের পর, মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ জমা না দিয়ে কেবল আদালতের জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানার কপি পাঠালেই হবে; সুতরাং প্রত্যর্পণের বিষয়টি আরও সহজ হয়েছে।

অর্থাৎ, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যে-কোনো মামলায় আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা দিলেই, সেই কাগজের ভিত্তিতে ঢাকা আনুষ্ঠানিকভাবে দিল্লির কাছে তাকে ফেরত চাইতে পারবে। এমনকি কূটনৈতিক চ্যানেলে আবেদনের মাধ্যমে অপরাধীকে অস্থায়ী গ্রেফতারের বিষয়টিও চুক্তিতে রয়েছে। এক্ষেত্রে যদি মনে হয় যে, অপরাধী পালাতে পারে, তাহলে ৬০ দিনের জন্য ‘অস্থায়ী গ্রেফতার’ করা যাবে।

তবে, যদি ভারতের মনে হয় যে, ‘অভিযোগগুলো শুধুমাত্র ন্যায় বিচারের স্বার্থে, সরল বিশ্বাসে আনা হয়নি’ তাহলে প্রত্যর্পণের আবেদন নাকচ করা যাবে। শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফেরানোর ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণ চুক্তিতে থাকা এই শর্তটিকেই সব থেকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।

ফিরতে চান নাকি কৌশল?

দেশে ফিরবেন বা ফিরতে চান, এমন বার্তা গত দুই বছরে বেশ কয়েকবার দিয়েছেন শেখ হাসিনা। কিন্তু জুলাই গণ-আন্দোলনের যে প্রেক্ষাপটে তার বিদায় হয়েছে এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তার দেশে ফেরার বাস্তবতা কতটা, এ নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে।

দেশি-বিদেশি বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, শেখ হাসিনা যদি ঢাকায় ফেরেন, তাহলে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। এমন প্রেক্ষাপটে বারবার দেশে ফেরার যে বার্তা শেখ হাসিনা দিচ্ছেন, তার মধ্যে অন্য রাজনৈতিক কৌশল দেখছেন বিশ্লেষকদের কেউ কেউ।

তারা বলছেন, শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পরপরই দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয় এবং সরকার পতনের পর থেকেই স্বস্তিতে নেই দলটির কর্মী-সমর্থকরাও। এমন প্রেক্ষাপটে বারবার দেশে ফেরত আসার বিষয়টি সামনে আনার পেছনে দলের নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙা করার বিষয়টি রয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. সাব্বির আহমদ বলছেন, ‘এটা হতে পারে, কারণ দীর্ঘদিন ধরে দলের নেতাকর্মীরা নানা ধরনের নির্যাতন ফেইস করছে।’

এছাড়া তার এই ঘোষণা বর্তমান সরকারকে এক ধরনের রাজনৈতিক চাপের মধ্যে রাখার কৌশলও হতে পারে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক সামিয়া জামান।

‘উনি দেশে আসতে চান বলছেন, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট দিন বা ক্ষণ বলেননি। দেশের একটি বড় দল যে অবস্থায় এখন আছে সেই অবস্থান থেকে আমার কাছে মনে হয়েছে এটি দলের নেতাকর্মীদের চাঙা করার জন্যই একটি মুভ।’

এছাড়া শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি যতটা না আইনি তার থেকে বেশি রাজনৈতিক বলেই মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক। তিনি বলছেন, ‘এটা পুরোপুরি ওনার ইনডিভিজুয়াল ডিসিশন (ব্যাক্তিগত সিদ্ধান্ত) কিনা এটিও দেখতে হবে। কারণ এখানে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয়টিও জড়িত আছে।’

দেশে ফিরে আইনি প্রক্রিয়া কী?

২০২৫ সালের ১৭ই নভেম্বর, জুলাই-অগাস্টের গণ-অভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এছাড়াও বাংলাদেশের বিভিন্ন আদালতে তার বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা রয়েছে। অর্থাৎ দেশে ফিরলে একটি আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই যেতে হবে শেখ হাসিনাকে।

এক্ষেত্রে তিনি যদি দেশে ফেরেন তাহলে অবশ্যই তাকে ট্রাইবুনালে আত্মসমর্পণ করে আইনি মোকাবিলা করতে হবে।

চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলছেন, ‘একজন ফিউজিটিভের পক্ষে কোনো আইনগত সুবিধা পাওয়ার কোনো সুযোগ নাই। তাকে অবশ্যই আসতে হবে, এই ট্রাইব্যুনালেই সারেন্ডার করতে হবে। এই ট্রাইব্যুনালে সারেন্ডার করেই তাকে জেলে যেতে হবে।’

তিনি বলছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩ এর ২১ ধারা অনুযায়ী রায়ের ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে হয়। সময় পার হলেও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ‘প্রিন্সিপল অব কমপ্লিট জাস্টিস’ নীতিতে আপিল নিতে পারে।

‘তার আসতে বাধা নেই। তিনি আসবেন, তারপর যে আইনি প্রক্রিয়াগুলো আছে সেটি মোকাবিলা করতে হবে। নিয়ম অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট ইস্যু আছে, এয়ারপোর্ট থেকেই তিনি গ্রেফতার হবেন,’ বলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আহসানুল করিম।

তিনি বলছেন, শেখ হাসিনার বৈধ পাসপোর্ট না থাকায় দেশে ফিরতে ‘ট্রাভেল পাশ’ নিয়ে তিনি দেশে আসতে পারেন। তবে সরকার তাকে ট্রাভেল পাশ বা ভ্রমণ অনুমতি দিবে কিনা বা দিলেও সেখানে বিবেচ্য বিষয়গুলো কি হবে সেটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করেন এই বিশ্লেষক।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টিকে কেবল তার ইচ্ছা বা বক্তব্য হিসেবেই দেখছেন না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক সামিয়া জামান।

‘উনি কী একা একাই আসলে এই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন কিনা? যে দেশে উনি আছেন সেই দেশের কোনোরকম সংকেত ছাড়া এ ধরণের কথা বলতে পারেন কিনা, সেটাও দেখার বিষয়।’

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

কথা রাখলেন ছেলে, মা-বাবাকে চড়ালেন বিমানে

কথা রাখলেন ছেলে, মা-বাবাকে চড়ালেন বিমানে

উত্তপ্ত মণিপুর, মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে লাশ রেখে বিক্ষোভ

উত্তপ্ত মণিপুর, মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে লাশ রেখে বিক্ষোভ

টাইগার শ্রফকে ঘিরে বিষ্ণোই গ্যাংয়ের হামলার ছক ফাঁস!

টাইগার শ্রফকে ঘিরে বিষ্ণোই গ্যাংয়ের হামলার ছক ফাঁস!

কে এই লরেন্স বিষ্ণোই,  নিশানায় কেন বলিউড তারকারা?

কে এই লরেন্স বিষ্ণোই, নিশানায় কেন বলিউড তারকারা?

‘গুলির জবাব হবে গুলিতে’

‘গুলির জবাব হবে গুলিতে’

টাইগার শ্রফের গাড়িতে গুলি: গ্রেফতার বিষ্ণোই গ্যাংয়ের ৩ শুটার

টাইগার শ্রফের গাড়িতে গুলি: গ্রেফতার বিষ্ণোই গ্যাংয়ের ৩ শুটার

আরও পড়ুন

এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের পে স্কেল নির্ভর করছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওপর

এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের পে স্কেল নির্ভর করছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওপর

প্রধানমন্ত্রীর ​জাপান সফরে ৮ চুক্তির লক্ষ্য, চারটি চূড়ান্ত: পররাষ্ট্র সচিব

প্রধানমন্ত্রীর ​জাপান সফরে ৮ চুক্তির লক্ষ্য, চারটি চূড়ান্ত: পররাষ্ট্র সচিব

রাজশাহীতে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

রাজশাহীতে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

চলতি মাসেই বড় সুখবর পাচ্ছেন সরকারি চাকরিজীবীরা

চলতি মাসেই বড় সুখবর পাচ্ছেন সরকারি চাকরিজীবীরা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম