Logo
Logo
×
   

Advertisement

জাতীয়

একান্ত সাক্ষাৎকারে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শামীম কায়সার

আমাকে ‘কট্টরপন্থি’ বললে জুলুম করা হবে

Advertisement

তানজিল আমির

তানজিল আমির

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:১২ পিএম

আমাকে ‘কট্টরপন্থি’ বললে জুলুম করা হবে

ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শামীম কায়সার লিংকন।

Advertisement

শামীম কায়সার লিংকন। ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নতুন প্রতিমন্ত্রী। মাত্র ২৬ বছর বয়সে বাবার মৃত্যুর পর রাজনীতিতে এসে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরপর রাজনীতির নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ব্যক্তিজীবনে বড় ধরনের পরিবর্তন—ধর্মীয় অনুশীলন, আরবি ভাষা ও ইসলামি জ্ঞান অর্জনের দীর্ঘ পথচলা। একসময় যিনি ছিলেন তরুণ রাজনীতিক, সময়ের পরিক্রমায় সেই শামীম কায়সার লিংকন এখন ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে।

সম্প্রতি ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন যুগান্তরের সঙ্গে। এতে ব্যক্তিজীবনের পরিবর্তন, নিজের ধর্মীয় অবস্থান নিয়ে বিতর্ক ও ধর্ম মন্ত্রণালয় নিয়ে নিজের ভিশন-মিশন তুলে ধরেছেন তিনি।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন— তানজিল আমির

যুগান্তর: ২০০৬ সালে তরুণ বয়সেই আপনি ছাত্র অবস্থায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেই প্রেক্ষাপটটা জানতে চাই।

শামীম কায়সার লিংকন: আমি তখন এমবিএর ছাত্র। সেই সময় আমার বাবা মারা যান। তার মৃত্যুর পর দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আমাকে বাবার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে উপনির্বাচনে মনোনয়ন দেন। তখন আমার বয়স ছিল ২৬ বছর দুই মাসের মতো। আমি নির্বাচনে অংশ নিই এবং অষ্টম জাতীয় সংসদের ওই সময়ে সর্বকনিষ্ঠ সংসদ সদস্য হই। সংসদ সদস্য হিসেবে অবশ্য এক বছরেরও কম সময় পেয়েছিলাম। তবুও আলহামদুলিল্লাহ, ওই অল্প সময়ের মধ্যেই অনেক কিছু দেখা ও শেখার সুযোগ হয়েছে। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অনেক অস্থির হয়ে পড়ে। নানা চড়াই-উতরাই ও ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে দেশ গেছে। একপর্যায়ে বিরাজনীতিকরণের প্রবণতাও শুরু হয়।

যুগান্তর: ব্যক্তিগত জীবনে আপনি একজন প্র্যাকটিসিং মুসলিম। শুরু থেকেই কি আপনার জীবনধারা এমন ছিল?

শামীম কায়সার লিংকন: ২০০৬ সালে যখন আমি এমপি ছিলাম, সেই সময়কার ছবি যদি এখনকার ছবির সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন, তাহলে হয়তো আমাকে একেবারেই ভিন্ন একজন মানুষ মনে হবে। আমার জীবনযাপন, পোশাক-পরিচ্ছদ—সবকিছুর মধ্যেই একটা বড় পরিবর্তন এসেছে। তবে এই পরিবর্তন হঠাৎ করে হয়নি; এর পেছনে দীর্ঘ একটা যাত্রা আছে।

যুগান্তর: আপনার জীবন পরিবর্তনের সেই গল্পটা শুনতে চাই।

শামীম কায়সার লিংকন: ২০০৬ সালে আমার বাবা মারা যান। ২০০৭ সালে দাদা, ২০০৮ সালে চাচা এবং ২০০৯ সালে আমার মামাশ্বশুর ইন্তেকাল করেন। অল্প কয়েক বছরের মধ্যে এতগুলো মৃত্যু আমাদের পুরো পরিবারকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

মানুষ যখন খুব কাছের মানুষের একের পর এক মৃত্যু দেখে, তখন মন স্বাভাবিকভাবেই নরম হয়ে যায়। আমার ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছিল। আল্লাহ তায়ালা একপর্যায়ে আমাকে আরও বেশি দ্বীন পালন করার তাওফিক দিলেন।

২০১৩ সালের ১৪ আগস্ট আমার মা ইন্তেকাল করেন। ঘটনাটি আমাদের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং বেদনাদায়ক ছিল। বাবা মারা যাওয়ার পর আমি অনেক কেঁদেছি। খুব খারাপ লেগেছিল। কিন্তু মা মারা যাওয়ার পর অনুভূতিটা একেবারেই অন্য রকম ছিল। তখন মনে হয়েছিল—মা বিছানায় পড়ে থাকলেও যদি শুধু তার শ্বাসটা চলত, তাহলেও যেন যথেষ্ট ছিল। মা আসলে কী জিনিস, সেটা তার চলে যাওয়ার পর খুব গভীরভাবে অনুভব করেছি।

২০১৪ সালে স্ত্রী ও একমাত্র মেয়েকে নিয়ে আমি প্রথম ওমরাহ করতে যাই। কাবাঘর দেখার পর মন আরও নরম হয়ে যায়। একজন মুসলিম হিসেবে ওই ঘরের সামনে দাঁড়ালে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মধ্যে গভীর আবেগ তৈরি হয়।

ওমরাহ থেকে ফেরার পর ওই বছরই সিদ্ধান্ত নিই—যেভাবেই হোক, টাকা-পয়সা ব্যবস্থা করে এবার হজও করব। আল্লাহ তায়ালা সেই সুযোগও করে দেন।

হজের পর আমার ভেতরে একটা উপলব্ধি আরও শক্তভাবে তৈরি হলো। মনে হলো, আমার বাবা-মা পরিবারে এত প্রভাবশালী মানুষ ছিলেন, অথচ আজ তারা নেই। আমরাও একদিন থাকব না। তখন মনে হলো, আগে যা করেছি করেছি; এখন আখেরাতের জন্য আরও কিছু করা দরকার। একই সঙ্গে মনে হয়েছিল, দ্বীন সম্পর্কে কিছুটা গভীরভাবে পড়াশোনা করা দরকার। কারণ মানুষ যত জানে, তার অহংকার তত কমার সুযোগ তৈরি হয়। নিজের সীমাবদ্ধতা বোঝা যায়।

যুগান্তর: আমরা দেখি আপনি জুমার খুতবা দেন, মাহফিলে বয়ান করেন, এটি কবে থেকে শুরু করলেন?

শামীম কায়সার লিংকন: সাবেক সংসদ সদস্য ও রাজনীতিবিদ হিসেবে বিভিন্ন সময়ে দেড়শ থেকে দুইশর মতো মাহফিলে প্রধান অতিথি হওয়ার সুযোগ হয়েছে। সেখানে দুই মিনিট, পাঁচ মিনিট করে বক্তব্য দিতে হতো। আগে ছোটবেলা থেকে বিভিন্ন জায়গায় যা শুনেছি—তালিম, ওয়াজ বা বিভিন্ন ইসলামি ধারার আলোচনা—সবকিছু মিলিয়ে নিজের মতো করে কিছু কথা বলার চেষ্টা করতাম। কিন্তু দ্বীনি পড়াশোনা শুরু করার পর উপলব্ধি করি, ইসলাম ও দ্বীন নিয়ে কথা বলা খুবই দায়িত্বশীল একটি বিষয়। এখানে যা মনে এলো, তা বলে দেওয়ার সুযোগ নেই। তখন থেকে জিহ্বা যেন আরও ভারী হয়ে গেল। মনে হতে লাগল—কথা বলার আগে অনেক হিসাব করতে হবে, নিশ্চিত হতে হবে। আনুষ্ঠানিকভাবে ২০১৯ সাল থেকে মসজিদে খুতবা দেওয়া শুরু করেছি। 

যুগান্তর: এ তাগিদ থেকেই কি ধর্মীয় বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করলেন?

শামীম কায়সার লিংকন: এই যে আমার জীবন ও চিন্তাধারায় পরিবর্তন হলো, এরপর ধর্মীয় বিষয়ে জানার আগ্রহে আমি পড়াশোনা শুরু করি। প্রথমে মাওলানা আবু তাহের মিসবাহর ‘এসো আরবি শিখি’ বইটি একজন আলেমের কাছে পড়তে শুরু করি। পরবর্তীতে জানতে পারি, সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত ও বয়স্কদের জন্য দ্বীনি শিক্ষার একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেখানে গিয়ে জানতে পারি, আমাদের শিক্ষক কাতার থেকে নন-নেটিভ আরবি শিক্ষার্থীদের জন্য তৈরি একটি বিশেষ কারিকুলাম অনুসরণ করে পড়ান। এর মধ্যে ছিল ‘আল-আরাবিয়্যাতু লিন-নাশিঈন’—অর্থাৎ নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য আরবি শিক্ষা।

এটি মূলত এমন একটি সমন্বিত পদ্ধতি, যা আরবি ভাষাভাষী নন এমন শিক্ষার্থীদের দ্রুত ও পদ্ধতিগতভাবে আরবি শেখানোর জন্য তৈরি। এর ছয়টি খণ্ড রয়েছে। কারিকুলামটি সম্পর্কে জানার পর আমার আগ্রহ অনেক বেড়ে যায়।

যুগান্তর: ধর্মীয় বিষয়ে আপনার পড়াশোনা কতটুকু?

শামীম কায়সার লিংকন: প্রায় দুই বছর আরবি শেখার পর ধীরে ধীরে নাহু-সরফ ও আরবি ব্যাকরণের বিভিন্ন কিতাব পড়ানো হয়। এরপর তাফসির, উসুলুত তাফসির এবং শাইখ মুহাম্মাদ ইবন সালিহ আল-উসাইমীনের তাফসির পড়ার সুযোগ হয়। এরপর বালাগাহ বা উচ্চতর আরবি ভাষাশাস্ত্র পড়েছি। বিভিন্ন বালাগাহর কিতাব ও দীর্ঘ দারস অনুসরণ করেছি। পরে মুসতালাহুল হাদিস, আরবাঈন আন-নববী এবং ‘হিলইয়াতু তালিবিল ইলম’-সহ আরও বিভিন্ন বিষয় পড়ানো হয়।

এই শিক্ষাব্যবস্থার একটা বৈশিষ্ট্য আমার খুব ভালো লেগেছিল। এটা পরীক্ষানির্ভর ছিল না। একটা বই শুরু করলে পুরো বই শেষ করা হতো—তা দুই বছর লাগুক বা চার বছর লাগুক। এতে পড়াশোনার প্রতি আমার আগ্রহ ক্রমেই বাড়তে থাকে।

যুগান্তর: সরাসরি এভাবে ইসলামি জ্ঞান অর্জনের পর আপনার দৃষ্টিভঙ্গিতে কি কোনো পরিবর্তন এসেছে?

শামীম কায়সার লিংকন: এই পড়াশোনার বড় উপকার হয়েছে, উম্মাহর বিভিন্ন মতপার্থক্যের ব্যাপারে আমার দৃষ্টিভঙ্গি প্রশস্ত হয়েছে। বুঝতে শিখেছি, প্রত্যেক পক্ষের বক্তব্যের পেছনে তাদের কিছু ব্যাখ্যা ও দলিল থাকে। এই উপলব্ধিটা আল্লাহর রহমতে আমার মধ্যে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে। জানার সঙ্গে সঙ্গে আমল করার আগ্রহও বাড়ে। আমরা গুনাহগার মানুষ; আমাদের ভুলত্রুটি থাকবে। কিন্তু চেষ্টা হলো—নিজে দ্বীন পালন করা, পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে চলা এবং প্রতিনিয়ত আরও জানার চেষ্টা করা। এটাই আমার জীবনের মূল পরিবর্তন বা ‘ট্রানজিশন’ বলতে পারেন।

যুগান্তর: আপনার আগের ও বর্তমান জীবনের কেমন পার্থক্য অনুভব করেন?

শামীম কায়সার লিংকন: মানুষের কাছে ন্যায়-অন্যায়ের ধারণা অনেক সময় আপেক্ষিক মনে হতে পারে। একই কাজ একজনের কাছে ঠিক, অন্যজনের কাছে ভুল মনে হতে পারে। কিন্তু একজন মানুষ যত বেশি ধর্মীয় অনুশীলনের মধ্যে প্রবেশ করেন, তার নিজের ভেতরেই একটা সতর্কতাবোধ তৈরি হয়।

উদাহরণ হিসেবে বলি, আমি যদি এই লম্বা দাড়ি নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ধূমপান করি, তাহলে আমার নিজের মধ্যেই একটা সংকোচ তৈরি হবে। মনে হবে, পাশ দিয়ে যাওয়া মানুষ আমাকে দেখে কী ভাববে? যদি কারও এমন কোনো অভ্যাস থেকেও থাকে, সে হয়তো সেটা প্রকাশ্যে করার আগে অন্তত দ্বিতীয়বার চিন্তা করবে।

অর্থাৎ দ্বীনি অনুশীলন নিজের মধ্যেই একটা ‘স্ক্রিনিং’ তৈরি করে—নিজেকে নিজেই মনে করিয়ে দেয়, ‘তোমার এটা করা উচিত নয়।’ গুনাহের কাজে যাওয়ার আগে এটা একটা মানসিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। এই জায়গাটা আমি ইতিবাচকভাবে দেখি।

যুগান্তর: আপনি আধুনিক শিক্ষায় একজন উচ্চশিক্ষিত, এরপর ধর্মীয় জ্ঞানও অর্জন করেছেন, এ দুটি ধারার সমন্বয়ের বিষয়ে আপনি কি মনে করেন? 

শামীম কায়সার লিংকন: আমার অভিজ্ঞতায় ধর্ম ও প্রযুক্তিকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখার কোনো কারণ নেই। প্রযুক্তি কেন, যেকোনো শিক্ষাবিষয়ের সঙ্গেই ধর্মীয় মূল্যবোধের সম্পর্ক ও ব্যাখ্যার সুযোগ রয়েছে। আমি যেহেতু আইসিটি ও কম্পিউটার সায়েন্সের মানুষ, কুরআন-সুন্নাহ অধ্যয়ন করতে গিয়ে প্রযুক্তি, যোগাযোগ এবং অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ সম্পর্কিত নানা বিষয়ের সঙ্গে চিন্তার যোগসূত্র দেখতে পাই।

একইভাবে অন্য ধর্মের একজন মানুষও তার ধর্মগ্রন্থে নিজের দৈনন্দিন জীবন বা অধ্যয়নের বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো না কোনো দিকনির্দেশনা খুঁজে পেতে পারেন। আমার কাছে ধর্মীয় অনুশীলন উচ্চশিক্ষার প্রতিবন্ধক নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে পরিপূরক।

যুগান্তর: আপনার জীবনাচারে এমন পরিবর্তনের সামাজিক প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?

শামীম কায়সার লিংকন: ধর্মীয় জীবনচর্চার কারণে বড় ধরনের কোনো সামাজিক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি আমি হইনি, আলহামদুলিল্লাহ। তবে কেউ কেউ প্রথমে অবাক হয়েছেন। হয়তো বলেছেন, ‘তুমি তো আগে এমন ছিলে, এখন হঠাৎ এমন হয়ে গেলে!’ যারা আমার জীবনের পুরো পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটা দেখেছেন, তারা সাধারণত এমন বলেন না। যারা দীর্ঘদিন পর হঠাৎ আমাকে দেখেছেন, তাদের কাছেই পরিবর্তনটা বেশি আকস্মিক মনে হয়েছে।


যুগান্তর: বিগত আওয়ামী সরকারের সময় আপনার রাজনৈতিক অবস্থান ও পরিস্থিতি কেমন ছিল?

শামীম কায়সার লিংকন: বিগত বছরগুলোতে রাজনৈতিক কারণে অবশ্যই অনেক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। মামলা-হামলা—এসব নিয়েই আমাদের বেঁচে থাকতে হয়েছে এবং রাজপথে সংগ্রাম করতে হয়েছে। পরিবারের ওপরও নানা ধরনের আঘাত এসেছে। তবে সব ত্যাগের কথা মানুষকে মুখে বলে বেড়াতে হয় না। যাদের জানার প্রয়োজন, তারা জানেন।

দ্বীনি বিষয়ে কেউ যদি আমার বিরুদ্ধে কোনো তোহমত দেয়, সেখানে আল্লাহ তায়ালাই চূড়ান্ত বিচারক। একইভাবে রাজনৈতিক জীবনেও দল ও দেশের জন্য কার কী অবদান রয়েছে, সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের মানুষ তা জানেন। আমার কাছে সেটাই যথেষ্ট।

যুগান্তর: মন্ত্রিপরিষদে আপনি যুক্ত হতে পারেন—এমন খবর প্রকাশের পর থেকেই বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া আসছিল। আপনাকে কট্টরপন্থি লা-মাজহাবি দাবি করে বিবৃতিও এসেছিল, এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

শামীম কায়সার লিংকন: আমি পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে বলতে চাই—আমি কোনো কট্টরপন্থি লা-মাজহাবি নই। এভাবে আমাকে চিহ্নিত করা আমার প্রতি তোহমত, অপবাদ এবং জুলুম হবে। আমি এমন একটি পরিবারে জন্ম নিয়েছি, যেখানে আমার মাতৃকুল হানাফি মাজহাবের অনুসারী এবং পিতৃকুল জমিয়তে আহলে হাদিসের অনুসারী। এটা তো আমার দোষ নয়। আমি জন্ম থেকেই দুই ধারার চর্চা দেখে বড় হয়েছি। আহলে হাদিসের মধ্যেও বিভিন্ন মত ও ধারা আছে। একইভাবে হানাফিদের মধ্যেও বিভিন্ন দাওয়াতি ও শিক্ষামূলক ধারা রয়েছে।

তাবলিগ জামাত একটি দাওয়াতি পদ্ধতিতে কাজ করে, দেওবন্দি ও কওমি ওলামায়ে কেরামেরও নিজস্ব দাওয়াতি মানহাজ রয়েছে।

পরবর্তী সময়ে যখন দ্বীন নিয়ে পড়াশোনা করেছি, তখন মূলত আলেমদের মতপার্থক্যের ক্ষেত্রে আমাদের করণীয় কী—সেটা বোঝার চেষ্টা করেছি। দেশের শীর্ষস্থানীয় ওলামায়ে কেরাম, বায়তুল মোকাররমের সম্মানিত খতিবসহ যারা ফিকহ ও দ্বীনি বিষয়ে আমাদের চেয়ে অনেক বেশি জ্ঞানী, তাদের দিকনির্দেশনাকে আমি গুরুত্ব দিই। আমাকে নিয়ে যে আলোচনা বা চাপ তৈরি হয়েছে, সেটার একটি ইতিবাচক দিকও আমি দেখি। এ ধরনের চাপ থাকলে আমি আমার দায়িত্বের জায়গা থেকে আরও সতর্ক থাকব, যাতে কোনোভাবেই সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত না হই।

তবে অপবাদ বা তোহমত অবশ্যই কষ্ট দেয়। কারও যদি আমাকে নিয়ে প্রশ্ন থাকে, আমার সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পারেন। আলোচনা হলে অনেক ভুল বোঝাবুঝিই দূর হয়ে যাবে। কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে আলেমদের মধ্যে আমাকে নিয়ে ভুল ধারণা তৈরির চেষ্টা করে থাকেন, তাহলে তার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও থাকতে পারে। তবে আমি বিশ্বাস করি, যত সময় যাবে এবং কথাবার্তা বাড়বে—ভুল বোঝাবুঝিও কমে যাবে।

যুগান্তর: ধর্মীয় দুই চিন্তাধারার মাঝে আপনি গড়ে উঠেছেন, পারিবারিকভাবে ধর্মীয় পরিবেশ আপনি কেমন পেয়েছেন?

শামীম কায়সার লিংকন: আমার নানার পরিবার হানাফি মাজহাবের অনুসারী, আর আমার দাদার পরিবার বাংলাদেশ জমিয়তে আহলে হাদিসের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। ছোটবেলা থেকেই আমি দুই ধরনের চর্চা দেখে বড় হয়েছি। দেখতাম, মামা নামাজে আস্তে ‘আমিন’ বলেন, আর বাবা-চাচারা জোরে ‘আমিন’ বলেন। অর্থাৎ মতপার্থক্য আমাদের পরিবারের মধ্যেই ছিল, কিন্তু এটাকে নিয়ে কোনো বিরোধের পরিবেশ ছিল না। বাবা-মা, দাদা-নানা—সবাই মোটামুটি ধর্মপ্রাণ ছিলেন। আমাদের জন্য কুরআনের শিক্ষক রাখা হতো, ধর্মীয় শিক্ষার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা হতো। পাশাপাশি স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে দেশের প্রচলিত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও আমার সম্পৃক্ততা ছিল। ফলে সমাজের বিভিন্ন ধারা কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে।

স্কুলজীবনে তাবলিগের মারকাজে গিয়েছি। বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে আমাদের দেশে মাজারকেন্দ্রিক সুফি-সুন্নি ধারার পরিবেশেও যাওয়া হয়েছে এবং তাদের কিছু বই পড়ার সুযোগ হয়েছে। রাজনীতির কারণে জামায়াতে ইসলামী আমাদের জোটে থাকায় তাদেরও কিছু বইপত্র পড়েছি এবং তাদের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে ওঠাবসার সুযোগ হয়েছে। আবার বন্ধু ও মুরব্বিদের মাধ্যমে দেওবন্দি ও কওমি ঘরানার আলেমদের সোহবতও পেয়েছি। অর্থাৎ বিভিন্ন ইসলামি ধারার মানুষকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে।

যুগান্তর: ধর্ম মন্ত্রণালয় নিয়ে আপনার ভাবনা কী?

শামীম কায়সার লিংকন: ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় নিয়ে আমাদের ভিশন ও মিশন পরিষ্কার। এর মূল ভিত্তি হলো ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। আমাদের কাছে সবার আগে বাংলাদেশ—সবার জন্য বাংলাদেশ। জাতীয় নিরাপত্তা ও জাতীয় প্রতিরক্ষার প্রশ্নে কোনো ধরনের আপস না করে দেশের সব ধর্ম, বর্ণ ও মতের মানুষের জন্য রাষ্ট্রীয় পরিসর নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

এটা ‘ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়’। তাই শুধু একটি ধর্ম বা একটি মাজহাব নিয়ে কাজ করার প্রতিষ্ঠান নয়। যারা কোনো ধর্ম অনুসরণ করেন না, রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে তাদের বিষয়ও রাষ্ট্রকে বিবেচনায় নিতে হবে। এই মন্ত্রণালয়ের কাজ কোনো নির্দিষ্ট মতবাদ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া নয়। ধর্ম মানুষের ন্যায়-অন্যায় ও নৈতিকতার প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সেই কারণে ধর্মীয় মূল্যবোধকে সমাজে জাগ্রত রাখা অবশ্যই মন্ত্রণালয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। একই সঙ্গে সবকিছু করতে হবে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে।

আমার চেষ্টা থাকবে, দেশের সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষের অনুভূতি এবং মতপ্রকাশের ন্যায্য পরিসর তাদের প্রাপ্যতা অনুযায়ী নিশ্চিত করা।

যুগান্তর: ‘প্রাপ্যতা’ বলতে আপনি কী বোঝাতে চাচ্ছেন?

শামীম কায়সার লিংকন: ‘প্রাপ্যতা’ একটি বাস্তব বিষয়। যেমন বাংলাদেশ ও উপমহাদেশে মুসলমানদের মধ্যে ইমামে আজম আবু হানিফার (রহ.) মাজহাব ও ফিকহের অনুসারী সবচেয়ে বেশি। স্বাভাবিকভাবেই সংখ্যার বিবেচনায় তাদের পরিসরও বেশি থাকবে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কাজ কোনো একটি মতবাদ প্রতিষ্ঠা করা।

ধর্ম মন্ত্রণালয় মূলত একটি প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান। দেশের সব ধর্ম এবং ধর্মসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়কে অ্যাড্রেস করা, প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা এবং ন্যায্য প্রাপ্যতা অনুযায়ী সবাইকে ফ্যাসিলিটেট করাই এর দায়িত্ব। প্রত্যেক ধর্মের মানুষ যেন নিজ নিজ ধর্মগ্রন্থ ও বিশ্বাস অনুযায়ী নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ ধারণ করতে পারেন, সে পরিবেশ তৈরিতে আমরা কাজ করতে চাই। আর যিনি কোনো ধর্ম পালন করেন না, নাগরিক হিসেবে তারও ন্যায্য পরিসর থাকবে।

সব মিলিয়ে আমাদের লক্ষ্য থাকবে—ধর্মীয় মূল্যবোধ, পারস্পরিক সম্মান, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং জাতীয় স্বার্থকে সমুন্নত রেখে সবার জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ধর্মবিষয়ক প্রশাসন গড়ে তোলা।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম