এমপি নজরুলের গ্রেফতারে স্পিকারকে চিঠি দেবে পুলিশ
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৫৭ পিএম
সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম। ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের গ্রেফতারের বিষয়টি জানিয়ে জাতীয় সংসদের স্পিকারকে পুলিশের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার কয়েকটি চিরকুট মরিয়মের লেখা কিনা, সে বিষয়ে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছেন ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের ডিসি মোহাম্মদ ইবনে মিজান।
ডিসি মোহাম্মদ ইবনে মিজান বলেন, ‘গাজী নজরুল ইসলামের গ্রেফতার ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে সংসদের স্পিকারকে পুলিশের পক্ষ থেকে চিঠি লেখা হচ্ছে। সেখানে শুধু স্পিকারকে এসব বিষয়ে অবগত করা হবে।’
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় রাজধানীর ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে গাজী নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের (১৯) ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। ফ্ল্যাটটিতে গাজী নজরুল ইসলাম প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে থাকতেন বলে জানা গেছে। মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের ঘটনায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে করা মামলায় তাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। একই মামলায় তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগমকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলার অপর আসামি মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমান এখনো গ্রেফতার হননি।
মরিয়ম খাতুনের লাশ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানোর সময় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গাজী নজরুল ও মাকসুদা বেগমকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। পরে তাদের গ্রেফতার দেখানো হয়।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) দুপুরে গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ ইবনে মিজান।
মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে গতকাল রাতে শেরেবাংলা নগর থানায় তিনজনের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলাটি করেন।
এদিকে লাশ উদ্ধারের পর ঘটনাস্থলে যায় শেরেবাংলা নগর থানা-পুলিশ, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ও গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সদস্যরা। ঘটনাস্থল থেকে কয়েকটি চিরকুট উদ্ধার করে সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট। এসব চিরকুটে মরিয়মের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, মানসিক কষ্ট, অভিমান ও ক্ষোভের কথা লেখা রয়েছে বলে জানা গেছে।
উদ্ধার হওয়া একটি চিরকুটে লেখা রয়েছে, ‘আমি অতি বিশ্বাস করে যুদ্ধে নেমেছিলাম তার সাথে, কিন্তু জিততে পারিনি হেরে গেলাম ময়দানে। জিতবই বা কেমনে যুদ্ধে—শেষ প্রান্তে এসে দেখি তুমিই তো ছিলে বিপক্ষ দলের সেনাপতি।’
অন্য একটি চিরকুটে লেখা রয়েছে, ‘আমি হেরেছি—তুমি জিতেছো—কারণ, আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম বলেই তো ঠকিয়ে জিততে পেরেছো।’
আরেকটিতে লেখা রয়েছে, ‘সে ছিল অন্য নারীর স্বামী—কাগজে কলমে অধিকার ছিল তার বউয়ের, আর আমি ছিলাম বোকা...!!! অন্য কারো স্বামীকে বানিয়েছিলাম নিজের শখের পুরুষ...!!! কাউকে অধিক পাওয়ার চেয়ে হারিয়ে ফেলা বেশি সম্মানের কারণ...... ভালোবাসা কখনোই ভাগ করে নেওয়ার বিষয় নয়..... ভালোবাসা হয় সম্পূর্ণ, না হয় অপূর্ণ!’
আরেক চিরকুটে মরিয়ম লিখেছেন, ‘শুধুই মায়ায় পড়েছি বলে বারবার তোমার কাছে নত হই.... তা না হলে যতটা সস্তা ভাবছো ততটা সস্তা আমি নই।’
তবে এসব চিরকুট সত্যিই মরিয়মের লেখা কিনা, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এ বিষয়ে ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের ডিসি মোহাম্মদ ইবনে মিজান বলেন, কিছু চিরকুট সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট উদ্ধার করেছে। ফরেনসিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর সিআইডি এগুলো পুলিশের কাছে হস্তান্তর করলে তা খতিয়ে দেখা হবে। হাতের লেখা মিলিয়ে দেখা কিংবা সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদন থেকে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।
পুলিশ জানায়, মামলার এজাহার অনুযায়ী, সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা গ্রামের মুদিদোকানি এস এম মাসুম বিল্লাহর বড় মেয়ে মরিয়মের সঙ্গে চলতি বছরের জুন মাসে ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী গাজী নজরুল ইসলামের বিয়ে হয়। বিয়ের পর তিনি ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাটে দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মকে নিয়ে বসবাস করতেন। সেখানে তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগমও থাকতেন।
মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, বিয়ের পর থেকেই গাজী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মরিয়মকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন। বিষয়টি মরিয়ম বিভিন্ন সময় মোবাইল ফোনে তার পরিবারকে জানিয়েছিলেন। এজাহারে আরও বলা হয়, আসামি ওবায়দুর রহমানের প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় মরিয়মের সঙ্গে গাজী নজরুলের বিয়ে হয়েছিল।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, গতকাল বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে মরিয়মের বাবাকে ফোন করে দ্রুত ন্যাম ভবনের বাসায় যেতে বলেন গাজী নজরুল। খবর পেয়ে মাসুম বিল্লাহ তার শ্যালিকা সুফিয়াকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে যান। বাসায় গিয়ে তারা অনেক মানুষের ভিড় দেখতে পান। পরে জানতে পারেন, একটি কক্ষে মরিয়ম গলায় ফাঁস দিয়েছেন।
পুলিশের সহায়তায় ও উপস্থিত লোকজনের মাধ্যমে ওই কক্ষের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করা হয়। সেখানে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ওড়না প্যাঁচানো অবস্থায় মরিয়মের লাশ পাওয়া যায়। তার বিছানার ওপর থেকে একটি ‘সুইসাইড নোট’ উদ্ধারের কথাও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় উদ্ধার হওয়া চিরকুট ও অন্যান্য আলামত সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট সংগ্রহ করেছে। চিরকুটের বক্তব্যের প্রেক্ষাপট এবং মরিয়মের মৃত্যুর সঙ্গে এর কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে কিনা, তা তদন্তের পর নিশ্চিত হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের ডিসি মোহাম্মদ ইবনে মিজান বলেন, গাজী নজরুলসহ গ্রেফতার দুই আসামিকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হবে কিনা, তা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।



