প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটে ত্রুটি, তিন প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্ত দল
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১০:১৭ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বহনকারী উড়োজাহাজে বারবার যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ার ঘটনায় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের গঠিত তদন্ত কমিটি।
কেন একাধিক সচল উড়োজাহাজ থাকা সত্ত্বেও ত্রুটির ইতিহাস থাকা নির্দিষ্ট উড়োজাহাজটি প্রধানমন্ত্রীর সফরের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল, অতীতে শনাক্ত হওয়া ত্রুটিগুলো যথাযথভাবে মেরামত করা হয়েছিল কি না এবং জাপানের নারিতা বিমানবন্দরে কারিগরি ত্রুটি সারাতে কেন পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা সময় লেগেছিল—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের সময় ভিভিআইপি ফ্লাইটে যান্ত্রিক ত্রুটির ঘটনায় এসব প্রশ্নকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে তদন্ত কমিটি। এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী দল, নারিতা স্টেশনের কান্ট্রি ম্যানেজার ও বিমানের মেইনটেন্যান্স কন্ট্রোল সেন্টারের (এমসিসি) কর্মকর্তাদের দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কারিগরি নথিপত্রও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
তদন্তের প্রথম প্রশ্ন, বিমানের বহরে একাধিক সচল উড়োজাহাজ থাকা সত্ত্বেও কেন এস২-এজেওয়াই উড়োজাহাজটি প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের জন্য নির্বাচন করা হয়েছিল।
এ ক্ষেত্রে উড়োজাহাজটির কারিগরি সক্ষমতা, সাম্প্রতিক রক্ষণাবেক্ষণের অবস্থা, অতীতের ত্রুটির ইতিহাস এবং বিকল্প উড়োজাহাজ প্রস্তুত রাখার বিষয়গুলো যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়েছিল কি না, তা যাচাই করছে কমিটি। উড়োজাহাজ নির্বাচনের সিদ্ধান্তে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা ও দাপ্তরিক নথিও পর্যালোচনায় রয়েছে।
দ্বিতীয় প্রশ্নটি উড়োজাহাজটির রক্ষণাবেক্ষণ ও কারিগরি ছাড়পত্র নিয়ে। নারিতায় একের পর এক ত্রুটির সংকেত পাওয়ার আগে উড়োজাহাজটির কারিগরি অবস্থার যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ জন্য গত তিন থেকে ছয় মাসের টেকনিক্যাল লগবুক, ত্রুটি শনাক্তের প্রতিবেদন, মেরামতের নথি এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশের রক্ষণাবেক্ষণ রেকর্ড পরীক্ষা করা হচ্ছে।
প্রতিটি ত্রুটির বিপরীতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, মেরামতের পর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছিল কি না এবং কার অনুমোদনে উড়োজাহাজটিকে উড্ডয়নযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছিল, সেসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
তৃতীয় প্রশ্নটি নারিতা বিমানবন্দরে কারিগরি ত্রুটি সমাধানে অস্বাভাবিক দীর্ঘ সময় লাগা নিয়ে। তদন্তসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রায় দুই ঘণ্টায় সমাধানযোগ্য কাজ সম্পন্ন করতে কেন পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা লেগেছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নারিতা বিমানবন্দরে বিমানের নিয়মিত ফ্লাইট না থাকায় সেখানে নিজস্ব স্থায়ী প্রকৌশলী ছিলেন না। ফলে স্থানীয় গ্রাউন্ড সার্ভিস এজেন্সির ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।
প্রয়োজনীয় কারিগরি ও লজিস্টিক সহায়তা পেতে বিলম্ব, ঢাকার এমসিসির সঙ্গে যোগাযোগ এবং কারিগরি নির্দেশনা পাওয়ার প্রক্রিয়ায় কোনো সমন্বয়হীনতা ছিল কি না, তা যাচাই করছে কমিটি।
এদিকে, নারিতায় প্রাক্-ফ্লাইট পরিদর্শন শেষে প্রকৌশলী সাদেকুল ইসলাম উড়োজাহাজটির এয়ারওয়ার্দিনেস ও রিলিজ সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন। অন্যদিকে যাত্রী পরিবহনের ছাড়পত্র দেন ক্যাপ্টেন ইমামুল। কিন্তু উড্ডয়নের উদ্দেশ্যে রানওয়ের দিকে যাওয়ার সময় ককপিটে স্পয়লার, ফ্লাপ কমান্ড, বাম পাশের পিটোট হিট ও র্যাম ফ্যানের একাধিক ত্রুটির সংকেত দেখা দেয়। পরে ক্যাপ্টেন ইমামুল উড্ডয়ন বাতিল করে উড়োজাহাজটিকে পার্কিং বে-তে ফিরিয়ে নেন।
এ ঘটনায় প্রকৌশল বিভাগের পরিচালককে ইতোমধ্যে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমাও তিন কার্যদিবস বাড়ানো হয়েছে। চার কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে তা জমা দিতে পারেনি কমিটি।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিভিআইপি ফ্লাইটের ক্ষেত্রে উড়োজাহাজ নির্বাচন, কারিগরি পরীক্ষা ও উড্ডয়নযোগ্যতার ছাড়পত্র দেওয়ার প্রতিটি ধাপে কঠোর নিয়ম অনুসরণ করা জরুরি। শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ বা দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিলেই ঘটনার প্রকৃত কারণ বের হবে না। বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি পর্যায়ে কার কী ভূমিকা ছিল, তা চিহ্নিত করে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
বিমানের জনসংযোগ মহাব্যবস্থাপক শাহনূর আহমেদ জানিয়েছেন, যান্ত্রিক ত্রুটির বিষয়টি স্বীকার করে তদন্ত কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিস্তারিত ও দাপ্তরিক ব্যবস্থা জানানো হবে।

