থাকেন ইউরোপে, বিমানে দেশে এসে ‘ভাড়ায়’ ডাকাতি করেন তিনি!
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০২:১০ পিএম
প্রতীকী ছবি: এআই
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে ডাকাত চক্র। ডাকাত দল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে টার্গেট করা ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে গাড়ি থেকে নামিয়ে হাতকড়া পরিয়ে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। তারা বরাবরই অধরা থেকে যায়। ডাকাতির পর চক্রের সদস্যরা দ্রুত ঢাকা ছেড়ে চলে যায় বিদেশে বা প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে। গোয়েন্দারা বলছেন, পেশাদার ডাকাতরাই এখন ভাড়ায় খাটছে। তাদের অনেকের নামে রয়েছে একাধিক মামলা।
ভাড়াটে ডাকাতদের একজন পাবনার চাটমোহর থানার নবীন পূর্বপাড়ার বাসিন্দা মো. শহিদুল ইসলাম (৪৩)। সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশে তার ‘মেসার্স কৃষি ভান্ডার’ নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সবার কাছে সে ব্যবসায়ী হিসাবে পরিচিত হলেও বাস্তবে দুর্ধর্ষ ডাকাত। ডাকাতিতে ব্যবহৃত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পোশাক, হাতকড়া, ওয়াকিটকি সবই রয়েছে তার। শাহজালাল বিমানবন্দর ও এর আশপাশের এলাকায় ডাকাতিতে ভাড়ায় খাটেন তিনি। ডাকাতি শেষে ফের নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বসেন।
তার বিরুদ্ধে ঢাকার সাভার, সিরাজগঞ্জ ও বগুড়ায় তিনটি ডাকাতিসহ মোট পাঁচটি মামলা রয়েছে। শহিদুলের সঙ্গে আরও ছয় থেকে সাতজন রয়েছে, তারাও ভাড়াটে ডাকাত। চক্রটি গত ২৩ জুলাই উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকায় মোহাম্মদ রিয়াজ নামে এক ব্যবসায়ীর ১৫ লাখ টাকা লুটে নেয়। রতন চৌধুরী ওরফে ডালিম নামে এক মাফিয়া তাদের ভাড়া করেছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বিমানবন্দর এলাকায় ভাড়ায় ডাকাতি করাদের আরেকজন মো. জলিল মোল্লা। তার বাড়ি বরিশালের খানপুরে। তার বিরুদ্ধে সারা দেশে ৫টি ডাকাতির মামলা রয়েছে। এরমধ্যে রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর থানায় একটি, টাঙ্গাইলের মির্জাপুর থানায় দুটি, ডিএমপির ধানমন্ডি থানায় একটি ও মিরপুর মডেল থানায় একটি মামলা রয়েছে।
আরেক ভয়ংকর ডাকাত বাগেরহাটের বাসিন্দা সৈয়দ নাসির উদ্দিন। তিনি থাকেন ফ্রান্সে। সেখান থেকে ভারতে আসেন বিমানে। ভারত থেকে চোরাই পথে বাংলাদেশে প্রবেশ করে ডাকাতি করেন। তার সঙ্গে থাকেন শ্যালক শামীমসহ ভাড়াটে কিছু ডাকাত। ডাকাতি শেষে ফের একই রুটে চলে যান ফ্রান্সে। এভাবেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দেন নাসির। সবশেষ উত্তরায় এক স্বর্ণের দোকানে ডাকাতির ঘটনায় নাসির ডিবির হাতে ধরা পড়ে।
শুধু শহিদুল, জলিল বা নাসিরই নন, এমন বেশ কয়েকটি চক্র রয়েছে যারা শাহজালাল বিমানবন্দর ও এর আশপাশের এলাকায় ভাড়ায় ডাকাতি করে। এদের মধ্যে আল আমীন গ্রুপ, শাওন গ্রুপ ও ডিবির সাবেক সোর্স ডাকাত শহীদ গ্রুপ অন্যতম। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চাকরিচ্যুত কিছু সদস্যও জড়িয়ে পড়েছে এই ডাকাতিতে। তারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকে। চক্রের সদস্যরা ডাকাতি শেষে ফের গ্রামে ফিরে যায়। পাঁচ থেকে দশ লাখ টাকার বিনিময়ে ভাড়ায় ডাকাতি করে চক্রগুলো। তবে বিমানবন্দর দিয়ে চোরাচালানের মাধ্যমে বাংলাদেশে আসা স্বর্ণের বড় চালান ডাকাতিতে কোটি টাকাও নিয়ে থাকে এসব ভাড়াটে ডাকাত।
২০২৪ সালের ৬ এপ্রিল ভোরে সিঙ্গাপুর যাওয়ার উদ্দেশে বিমানবন্দরে পৌঁছান কুষ্টিয়ার মো. রাশেদুল ইসলাম। ফ্লাইটের আগে আনুষঙ্গিক কাজ সারতে তিনি ‘ওভারসিজ ট্রেনিং সেন্টার’-এর উদ্দেশে একটি বাসে ওঠেন। বাসের দরজা লক করে যাত্রীবেশে থাকা ৫-৬ জন ডাকাত তার চোখ-মুখ বেঁধে মারধর করে। সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে তাকে এমইএস ফ্লাইওভারসংলগ্ন জসিমউদ্দীন গোলচত্বরে নামিয়ে দেওয়া হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা উত্তরা বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. ইলিয়াস কবির বলেন, বিমানবন্দরসহ উত্তরা এলাকায় অপরাধ সংঘটিত করেই অপরাধীরা দ্রুত ঢাকার বাইরে চলে যায়। অনেক কষ্টে তাদের গ্রেফতার করলে অল্প সময়ে তারা জামিনে বের হয়ে ফের অপরাধে জড়াচ্ছে। তবে আমাদের তৎপরতা অব্যাহত থাকায় ডাকাতি অনেকাংশে কমেছে।
স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, বিমানবন্দর ও এর আশপাশের এলাকায় ডাকাতি, ছিনতাইসহ যে কোনো ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে এসআরবি নিয়মিত গোয়েন্দা নজরদারি, টহল ও অভিযান পরিচালনা করে আসছে। তিনি বলেন, অপরাধীরা অনেক সময় স্থান, সময় ও কৌশল পরিবর্তন করে অপরাধ সংঘটনের চেষ্টা করে। তাই এ ধরনের অপরাধ সম্পূর্ণ নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর সমন্বিত ও ধারাবাহিক কার্যক্রমের মাধ্যমে আমরা অভিযান পরিচালনা করে থাকি।
