নতুন কৌশলে ছিনতাই, বাইকারদের জন্য মৃত্যুফাঁদ
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:২৮ পিএম
ছবি: এআই।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজধানীর ফ্লাইওভারগুলোতে ছিনতাইয়ের নতুন কৌশল ‘সুতা ডাকাতি’ আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। রাতের অন্ধকারে ফ্লাইওভারের দুই পাশে নাইলনের শক্ত সুতা টানিয়ে মোটরসাইকেলচালকদের ফাঁদে ফেলা হচ্ছে। সুতায় আটকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন বাইকাররা। এরপরই অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে তাদের টাকা, মোবাইল, ল্যাপটপ এমনকি মোটরসাইকেলও ছিনিয়ে নিচ্ছে ছিনতাইকারীরা। প্রাণঘাতী এই কৌশলে বাড়ছে দুর্ঘটনা ও নিরাপত্তাঝুঁকি। সম্প্রতি এরকম কয়েকটি রোমহর্ষক ঘটনার পর নগরীতে ফ্লাইওভার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
জানা গেছে, ফ্লাইওভারগুলোর অন্ধকারাচ্ছন্ন অংশ, বিশেষ করে যেখানে সড়কবাতি নষ্ট থাকে বা কম আলো থাকে, সেই স্থানগুলোকে অপরাধীরা বেছে নিচ্ছে। গভীর রাতে ফ্লাইওভারের দুই পাশের রেলিংয়ের সঙ্গে শক্ত নাইলনের মোটা সুতা বেঁধে দেওয়া হয়। দ্রুতগামী মোটরসাইকেলগুলো ওই রাস্তা অতিক্রমের সময় কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারটি তার কপাল, গলা বা বুক বরাবর আঘাত করে। পুরো ঘটনার আকস্মিকতায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ছিটকে পড়েন চালক। অনেকের আবার টানানো সুতা গলায় প্যাঁচিয়ে যাওয়ায় মারাত্মক জখম হন। মাটিতে লুটিয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই চারপাশ থেকে ৫-৭ জন সশস্ত্র ছিনতাইকারী ছুটে আসে। আহত চালক তখন যে অবস্থাতেই থাকুক না কেন তার সঙ্গে থাকা নগদ টাকা, মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ, স্বর্ণালংকার এমনকি মোটরসাইকেলটি পর্যন্ত ছিনিয়ে নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে পালিয়ে যায়।
ফেসবুক ঘাঁটাঘাঁটি করে দেখা যায়। দ্য ইউসুফ শো নামক একটি পেসবুক আইডিতে শনিবার বিকালে এক পোস্টে বলা হয়, ‘বাইকার ভাইরা সাবধান! ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও হানিফ ফ্লাইওভারে চরম আতঙ্ক সুতা ডাকাতি।’ আল ওয়ালিউর রহমান নামক এক ফেসবুক আইডি থেকে ১৪ অক্টোবর বেলা ৩টা ১৩ মিনিটে দেওয়া এক পোস্টে বলা হয়, ‘গতকাল বিকাল ৫টা ৩০ মিনিটে বাসায় আসার পথে যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভারের ওপর, সায়েদাবাদের দিকে বাইকে বসে থাকা অবস্থায় এক ভাইয়ের কপাল ধারালো নাইলনের সুতায় কেটে যায়। ওই একই স্থানে টানানো ওই সুতা দিয়ে আরেক বাইকারের গলার সামনে অংশ কেটে যায়। গত ফ্রাইডেতে আমার সঙ্গে একই ঘটনা ঘটে, একই জায়গাতেই, আমার মাথায় হেলমেট ছিল বিধায় আমি বেঁচে গিয়েছিলাম সেদিন। তবে আমার হাতে গ্লাভস পরা ছিল তারপরও গ্লাভস কেটে গিয়ে আমার হাত কেটে যায়। আমরা যারা সব সময় বাইক চালাই, ফ্লাইওভারে চলাচলের ক্ষেত্রে সবার সতর্ক থাকা উচিত।’
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী সাইফুর রহমান সম্প্রতি গভীর রাতে মহাখালী ফ্লাইওভার দিয়ে বাসায় ফিরছিলেন। ফ্লাইওভারের মাঝামাঝি পৌঁছতেই হঠাৎ তার গলায় কিছু একটা এসে লাগে এবং এতে তিনি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। তিনি বলেন, ‘মনে হয়েছিল কেউ যেন ধারালো কোনো কিছু দিয়ে গলা কেটে দিয়েছে। মোটরসাইকেল থামানোর আগেই ৪-৫ জন যুবক রামদা দেখিয়ে মানিব্যাগ ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব হারান সাইফুর। প্রায়ই এমন সব ঘটনা ঘটলেও পুলিশের কান পর্যন্ত তা পৌঁছে না।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ফ্লাইওভারের এই নৃশংস রাহাজানি রোধে কেবল পুলিশের তৎপরতাই যথেষ্ট নয়, এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। প্রতিটি ফ্লাইওভারের প্রতিটি ইঞ্চি সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারির আওতায় আনতে হবে এবং তা নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে। রাতের বেলা ফ্লাইওভারগুলোতে কোনো অবস্থাতেই যেন সড়কবাতি বন্ধ না থাকে, সে বিষয়ে সিটি করপোরেশনকে কঠোর নজর রাখতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ ফ্লাইওভারগুলোর প্রবেশ ও প্রস্থান মুখে পুলিশের স্থায়ী বা অস্থায়ী চেকপোস্ট স্থাপন করতে হবে। রাইড শেয়ারিং ড্রাইভার ও মোটরসাইকেল চালকদের সংগঠনগুলোকে এ বিষয়ে সচেতন করতে হবে।
জানতে চাইলে শনিবার সন্ধ্যায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্তি কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) ওসমান গণি যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা অপরাধীদের এই নতুন কৌশল সম্পর্কে অবগত ছিলাম না। এ ধরনের ঘটনার কথা আপনার কাছ থেকেই প্রথম শুনলাম। আমি আজই ডিএমপি সব অপরাধ বিভাগের ডিসিদের এ বিষয়ে সতর্ক করে দিচ্ছি। ফ্লাইওভারগুলোতে রাতের বেলায় মোবাইল পেট্রোল দল এবং সাদা পোশাকে পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হবে। যারা এই প্রাণঘাতী ফাঁদ পাতার সঙ্গে যারাই জড়িত, তাদের সবাইকে শিগগিরই আইনের আওতায় আনা হবে।’
ফ্লাইওভারে কোনো সিসিটিভি নেই। তাছাড়া অপর্যাপ্ত আলো ছিনতাইকারীদের জন্য বড় সুযোগ। তাছাড়া ঘটনার পর ফ্লাইওভারের সংযোগস্থলগুলো থেকে মুহূর্তের মধ্যে অলিগলিতে বা ভিন্ন সড়কে পালিয়ে যাওয়া সহজ হয়। এছাড়া রাতে ফ্লাইওভার ফাঁকা থাকায় মোটরসাইকেলগুলো অনেক বেশি গতিতে চলে, ফলে হঠাৎ কোনো বাধা আসলে চালকের পক্ষে নিজেকে রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
১৫ সেপ্টেম্বর রাত আড়াইটায় উত্তরা মোটরসাইকেলে করে মোহাম্মদপুরের বাসায় ফিরছিলেন আইটি পেশাজীবী তানভীর আহমেদ (৩২)। ফাঁকা ফ্লাইওভার পেয়ে তিনি মহাখালী ফ্লাইওভারে কিছুটা গতি বাড়িয়েছিলেন। হুট করে তার গলা ও বুক বরাবর শক্ত কিছু একটা এসে আঘাত করে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাইকসহ তিনি রাস্তায় আছড়ে পড়েন। এতে তিনি হাতে ও মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পান। তানভীর মাটিতে লুটিয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই অন্ধকার থেকে ধারালো অস্ত্র হাতে ৪-৫ জন যুবক তাকে ঘিরে ধরে। তার পকেটে থাকা দুটি দামি স্মার্টফোন, ল্যাপটপ ব্যাগ এবং মানিব্যাগে থাকা নগদ ১৫ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয়। বাধা দিতে গেলে তাকে কিল-ঘুসি মেরে পালিয়ে যায় চক্রটি।
১৮ সেপ্টেম্বর রাত সোয়া ১টা। এক যাত্রীকে নামিয়ে শ্যামপুরের বাসায় ফিরছিলেন মোটরসাইকেলচালক মো. রনি (২৬)। হানিফ ফ্লাইওভারের ঢালের একটু আগে রাস্তায় অদ্ভুত এক বাধার মুখে পড়েন তিনি। দেখেন, রাস্তার দুই পাশ থেকে দুজন লোক খুব দ্রুত একটি নাইলনের মোটা সুতা বা তার টানটান করে ধরে আছে। রনি ব্রেক করার চেষ্টা করলেও চাকা স্লিপ করে রাস্তায় পড়ে যান। এ সময় ৩ জন অপরাধী এসে তাকে চাপাতির মুখে জিম্মি করে। রনির গলায় রামদা ঠেকিয়ে তার বাইকের চাবি, পকেটের ক্যাশ টাকা এবং মোটরসাইকেলটি ছিনিয়ে নেয়। মাত্র ২ থেকে ৩ মিনিটের মধ্যে তারা কাজ শেষ করে উধাও হয়ে যায়।

