অভিন্ন সমৃদ্ধির লক্ষ্যে বিগ-বি উদ্যোগ আরও জোরদার চায় ঢাকা-টোকিও
Advertisement
বাসস
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪৩ পিএম
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ছবি: পিএমও
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
শিল্পায়ন ত্বরান্বিত, যোগাযোগব্যবস্থা শক্তিশালী এবং বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ (বিগ-বি) উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত করে কৌশলগত সহযোগিতা কাঠামো ‘বিগ-বি ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি’তে রূপান্তর করতে সম্মত হয়েছে বাংলাদেশ ও জাপান।
নতুন এই উদ্যোগের আওতায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) অবকাঠামোকে সমন্বিত করা হবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশকে শিল্পের মূল্যশৃঙ্খলের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কৌশলগত প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর চার দিনের সরকারি জাপান সফরের দ্বিতীয় দিনে টোকিওতে তার সঙ্গে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে এ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়।
শীর্ষ বৈঠক শেষে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, দুই নেতা উদীয়মান অর্থনৈতিক সুযোগ কাজে লাগানো, সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে এবং ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় বিগ-বি উদ্যোগের পরিধি বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছেন।
নতুন কাঠামোর আওতায় দুই প্রধানমন্ত্রী চারটি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেন। এগুলো হলো- যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানো, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বিধি প্রণয়নে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব উৎসাহিত করা এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা সম্প্রসারণ।
এই উদ্যোগ বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনবে। ভবিষ্যৎ সহযোগিতায় শিল্পের বহুমুখীকরণ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
মাতারবাড়ী হবে শিল্প ও পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র
বিগ-বি উদ্যোগের সম্প্রসারিত কাঠামোর অন্যতম প্রধান অংশ হলো মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে মাতারবাড়ী-মহেশখালী এলাকাকে সমন্বিত পণ্য পরিবহন, জ্বালানি ও শিল্পকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা।
দুই নেতা বাংলাদেশের আঞ্চলিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের প্রবেশদ্বার হিসেবে অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে অবকাঠামো ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
যৌথ বিবৃতিতে শিল্পের মূল্যশৃঙ্খলকে শক্তিশালী করতে গভীর সমুদ্রবন্দরের সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে শিল্পাঞ্চল, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো এবং আধুনিক পরিবহন নেটওয়ার্কের সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ধরনের সমন্বয়ের ফলে পণ্য পরিবহন আরও কার্যকর হবে, সরবরাহব্যবস্থার যোগাযোগ উন্নত হবে এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভবিষ্যতে সহযোগিতার বিষয়েও আলোচনা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন দুই নেতা।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানের গুরুত্ব স্বীকার করে তারা একমত হয়েছেন যে, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বৃহত্তর আঞ্চলিক সমৃদ্ধিতে অবদান রাখবে।
বিগ-বি উদ্যোগে তৃতীয় টার্মিনাল ও মেট্রোরেল
বিগ-বি’র সম্প্রসারিত কাঠামোতে বাংলাদেশের আকাশপথ ও নগর পরিবহন অবকাঠামোর উন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
দুই প্রধানমন্ত্রী ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালুর লক্ষ্যে প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়ে নিতে সম্মত হয়েছেন।
আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও পর্যটনের প্রসারে আধুনিক বিমানবন্দর অবকাঠামোর গুরুত্বের বিষয়টি এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে।
তারা ঢাকায় গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিটের (এমআরটি) লাইনগুলোর নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি পরিবহন অবকাঠামোতে আরও সহযোগিতার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরকে সহায়তা এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে দেশের সংযোগ জোরদার করতে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন দুই নেতা।
বাংলাদেশ-জাপান সহযোগিতার ভবিষ্যৎ গড়বে বিগ-বি
বিগ-বিকে ‘অভিন্ন সমৃদ্ধির জন্য বিগ-বি’ কাঠামোতে উন্নীত করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক নতুন কৌশলগত দিকনির্দেশনা পেয়েছে। এতে অবকাঠামো বিনিয়োগের সঙ্গে শিল্প প্রবৃদ্ধি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আঞ্চলিক যোগাযোগের সমন্বয় ঘটানো হবে।
এই কাঠামো পৃথক উন্নয়ন প্রকল্পের গণ্ডি পেরিয়ে সরকার, বেসরকারি বিনিয়োগকারী ও শিল্প খাতের অংশীজনদের নিয়ে আরও সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দুই দেশের অভিন্ন আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, জ্বালানি অবকাঠামো, শিল্পাঞ্চল, বিমান যোগাযোগ, নগর পরিবহন ও ডিজিটাল রূপান্তরের উন্নয়নকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে আঞ্চলিক উৎপাদন নেটওয়ার্ক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য রয়েছে এ উদ্যোগের।
দুই প্রধানমন্ত্রী তাদের জনগণের জন্য বাস্তব অর্থনৈতিক সুফল নিশ্চিত করতে নেওয়া অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়নে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার দৃঢ় সংকল্প পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ও দেশটির জনগণকে আতিথেয়তার জন্য ধন্যবাদ জানান। একই সঙ্গে তিনি সুবিধাজনক সময়ে জাপানের প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।
জাপানের এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে স্বাগত
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে জাপানের বেসরকারি বিনিয়োগের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বও শীর্ষ বৈঠকে উঠে এসেছে।
প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে জাপানের বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ এক ট্রিলিয়ন ইয়েন পর্যন্ত হতে পারে এমন সম্ভাবনাকে স্বাগত জানান। এ বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ রয়েছে।
বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন তিনি।
সফরকে কেন্দ্র করে ঘোষিত বড় বিনিয়োগগুলোকে স্বাগত জানিয়েছেন দুই নেতা। তারা আরও স্থিতিশীল সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং পূর্বানুমানযোগ্য বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করতে সম্মত হয়েছেন।
সহযোগিতামূলক ও স্থিতিশীল সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য তারা উৎপাদনশিল্প, খাদ্য ও কৃষি, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) এবং ওষুধশিল্পকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ আরও উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দেন সানায়ে তাকাইচি। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে স্বচ্ছতা, পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং ব্যবসাবান্ধব বিধিবিধান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তাঁর সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান করব্যবস্থা, শুল্ক ছাড়, অর্থ প্রেরণ ও লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে কার্যপ্রণালি উন্নত করে বিনিয়োগ সহজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার এবং ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়নে জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মধ্যে একটি সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরকে দুই নেতা স্বাগত জানান।
কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা এবং জাপানি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে স্বাক্ষরিত সহযোগিতা চুক্তিগুলোকেও তারা স্বাগত জানান।
সহযোগিতার এই গতি ধরে রাখতে দুই প্রধানমন্ত্রী জাপানের একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলকে বাংলাদেশ সফরে পাঠানো এবং আরও অর্থনৈতিক সংলাপ আয়োজনের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
এ ছাড়া জাপান-বাংলাদেশ যৌথ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব প্ল্যাটফর্ম এবং বাংলাদেশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের মাধ্যমে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতেও তারা সম্মত হয়েছেন।



-6ae0d7fbab076.jpg)