যুগান্তর ডেস্ক    |    
প্রকাশ : ২০ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
এবার পদ্মাতীরবর্তী অঞ্চলে বন্যার শঙ্কা
ফারাক্কায় দৈনিক ৫ সেমি. পানি বাড়ছে * ১০ জেলায় অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ লণ্ডভণ্ড * ভারত থেকে ভেসে আসছে লাশ ও মৃত পশু : কুড়িগ্রামে পচা গন্ধে বাতাস ভারি * ৭ দিনে মারা গেছে ৮১ জন * উন্নতি : কুড়িগ্রাম, জামালপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জ * অবনতি-স্থিতিশীল : মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, মুন্সীগঞ্জ ও শরীয়তপুর

এবার রাজশাহীসহ দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের দিকে ধেয়ে আসছে বন্যা। নেপাল-বিহারসহ গঙ্গা অববাহিকার উজান থেকে নেমে আসা পানি এই বন্যা তৈরি করবে। ২৫ আগস্টের পর রাজশাহী বিভাগে পদ্মা বিপদসীমা পাড়ি দেবে। ফলে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, পাবনা, কুষ্টিয়া এবং রাজবাড়ীতে বন্যা দেখা দিতে পারে। বর্তমানে বন্যা আক্রান্ত নীলফামারী-গাইবান্ধা-সিরাজগঞ্জসহ উত্তরাঞ্চলের জন্যও সুখবর তেমন নেই। ওই অঞ্চলে বর্তমানে বন্যার পানি নামছে। কিন্তু অমাবস্যার কারণে সাগর থেকে জোয়ারের পানি ঢুকবে দক্ষিণাঞ্চলে। এর ফলে ২২ আগস্টের পর বন্যার পানি নেমে যাওয়ার গতি কমে যাবে। শুধু তাই নয়, ২৬ আগস্টের পর উত্তরাঞ্চলে ফের বন্যা দেখা দিতে পারে। এমন পরিস্থিতি হলে ওই অঞ্চলের জন্য এটা হবে তৃতীয় দফা বন্যা। বর্তমানে দ্বিতীয় দফা বন্যায় ভাসছে অঞ্চলটি। বন্যা বিশেষজ্ঞ ও গবেষকরা এসব তথ্য জানিয়েছেন।

এদিকে বন্যায় উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের ১০ জেলার অভ্যন্তরীণ সড়ক ও রেল যোগাযোগ লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। বন্যার পানির তোড়ে দিনাজপুর-পার্বতীপুর রেললাইন এমনভাবে এঁকেবেঁকে গেছে দেখলে মনে হবে যেন সাগরের ঢেউ। এছাড়া রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, গাইবান্ধা, নীলফামারী, জয়পুরহাট ও জামালপুরে কাঁচা-পাকা সড়ক ও সেতু ভেঙেচুরে খানখান হয়ে গেছে। এসব জেলার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বাড়িঘর ভেঙে পড়েছে। কোনো কোনোটি ধসে গেছে। দেখলে মনে হবে, যেন কোনো বিধ্বস্ত নগরী। এদিকে বন্যায় শনিবার আরও ৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এ নিয়ে ৭ দিনে মারা গেছেন ৮১ জন।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইমেইলে বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম যুগান্তরকে জানান, ‘ফারাক্কা পয়েন্টে গঙ্গার পানি বর্তমানে দৈনিক ৫ সেন্টিমিটার করে বাড়ছে। এ কারণে ২৫ আগস্টের পর রাজশাহীতে পদ্মার পানি বিপদসীমা পার করতে পারে। ২৪ আগস্ট নাগাদ হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে বিপদসীমা পার করতে পারে। এসব লক্ষণে মনে হচ্ছে, বাংলাদেশে এরপরের বড় বন্যা ধেয়ে আসছে গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকায়। আর তেমনটি ঘটলে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, পাবনা, কুষ্টিয়া এবং রাজবাড়ীতে বন্যা দেখা দিতে পারে।’ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের (এফএফডব্লিউসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশের উত্তরাঞ্চলের (কুড়িগ্রাম, জামালপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জ) বর্তমান বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি অব্যাহত থাকবে। তবে উত্তরাঞ্চল থেকে নেমে আসা পানির কারণে দেশের মধ্য ও দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলে বন্যা চলছে। সরকারি এই সংস্থাটির মতে, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুরসহ দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চল এবং নিন্মাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি কিছু জায়গায় স্থিতিশীল ও কিছু জায়গায় অবনতিশীল থাকবে।

এদিকে উত্তরাঞ্চলের বন্যার পানি রাজধানীর আশপাশেও চাপ সৃষ্টি করছে। ঢাকার চতুর্দিকের ৫টি নদীর পানি বিপদসীমা বর্তমানে ৩ সেমি. থেকে ১২০ সেমি. নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধির প্রবণতা অব্যাহত আছে। তবে এই পানি নদীকে কানায় কানায় পূর্ণ করলেও রাজধানীতে ১৯৯৮ বা ১৯৮৮ সালের মতো বন্যার আশঙ্কা নেই। যুগান্তর ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

কুড়িগ্রাম, নাগেশ্বরী, ফুলবাড়ী ও চিলমারী : নাগেশ্বরীতে বন্যার পানিতে ভেসে আসা মানুষ ও পশুর মৃতদেহের দুর্গন্ধে ভারি হচ্ছে বন্যার্ত এলাকার বাতাস। বন্যায় উজানের পানির ঢলে ভেসে আসে বেশ কিছু মানুষ, শতাধিক গরু, ছাগল, ভেড়া, ঘোড়ার মৃতদেহ ও অসংখ্য মরা হাঁস-মুরগি। পানি কমতে থাকায় সেগুলো কচুরিপানার সঙ্গে উঁচু জায়গা বা নদীনালার ব্রিজ ও কালভার্টের মুখে আটকে গেছে। কোথাও কোথাও সেগুলো আটকে গেছে জাগ দেয়া পাটের সঙ্গে। শনিবার বামনডাঙ্গার বোয়ালেরডারা ও পাগলীর ব্রিজের মুখে এবং পাটেশ্বরী বিলে কর্কসিটের বাক্সবন্ধি ১টি শিশুসহ ৩টি লাশ দেখা যায়। অর্ধগলিত লাশগুলোর একজনের পরনের পোশাক দেখে মনে হচ্ছিল সেটি মহিলার। ধারণা করা হচ্ছে, মৃতদেহগুলো ভারত থেকে ভেসে এসেছে। পাগলীর ব্রিজের পাশে আটকে থাকা কর্কসিটের যে বাক্সটিতে শিশুর লাশ ছিল সেটির গায়ে হিন্দিতে লেখা কিছু কাগজ সাঁটানো আছে।

এদিকে নাগেশ্বরীতে বন্যায় অর্ধশতাধিক ব্রিজ-কালভার্ট ও প্রায় সবগুলো কাঁচা-পাকা সড়ক ভেঙে গেছে। বন্ধ হয়ে গেছে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। শুক্রবার সন্ধ্যায় নাগেশ্বরীর বেরুবাড়ীতে বানের পানিতে ডুবে বাবু ইসলাম নামে এক শিশু মারা গেছে। এদিকে পানি কমতে শুরু করায় ভাটির টানে ভাঙছে চিলমারী। এক সপ্তাহে প্রায় ৫শ’ বাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। নদীভাঙনের শিকার পরিবারগুলো খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এদিকে জেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রামে বন্যায় শুধু কৃষিতে পৌনে ৫শ’ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

রংপুর : বন্যায় রংপুর বিভাগের ১০০ কিলোমিটার রেলপথজুড়ে ধ্বংসের ছাপ। লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা। দুটি আন্তঃনগর ট্রেনসহ ২২টি ট্রেনে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সড়কপথের পাশাপাশি দেশজুড়ে উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থায় মারাত্মক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। ঈদের আগে এই রেলপথগুলো সারিয়ে তোলা সম্ভব নয়, এমনটি জানিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ। ফলে ঈদের মৌসুমে যাত্রী ও পণ্য পরবিহন নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়বে এ অঞ্চলের মানুষ। পশ্চিমাঞ্চলীয় রেলওয়ে প্রধান অফিস রাজশাহী সূত্রে জানা গেছে, এবারের বন্যায় রেলপথের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দিনাজপুর, লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁও ও কুড়িগ্রাম জেলায়। প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ না হলেও প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, শুধু রেললাইনের ক্ষতির পরিমাণ ২০ কোটি টাকার ওপর। এদিকে জেলায় ত্রাণ বিতরণ নিয়ে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। দুর্গতদের চাহিদার তুলনায় সিকিভাগ ত্রাণও বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থায় জনপ্রতিনিধিরা ত্রাণ বিতরণ নিয়ে নাজেহাল অবস্থায় পড়েছেন।

জয়পুরহাট : শনিবার সকালে আক্কেলপুর উপজেলার তুলসীগঙ্গা নদীর শহর রক্ষা বাঁধের ‘পাড়ঘাটি’ এলাকায় পশ্চিম পাশে প্রায় ৬০ ফুট দীর্ঘ বাঁধ ভেঙে আশপাশের আরও নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, আকস্মিক বন্যার পানিতে ডুবে গেছে ওই বাঁধের পার্শ্ববর্তী নিন্মাঞ্চলের বিহারপুর-পাড়ঘাটি এলাকায় বসবাসরত ২ শতাধিক পরিবারের বসতবাড়ি। জলমগ্ন হয়ে পড়েছে নিকটবর্তী আক্কেলপুর উপজেলা শহরের ডাকবাংলোর সামনের আক্কেলপুর-বগুড়া সড়কের প্রায় ২০০ হাত নিচু এলাকা। ওই সড়কে যানবাহন চলাচলে ব্যাপক দুর্ভোগের সৃষ্টি হয়। অপরদিকে ঘরদোর ডুবে যাওয়ায় বিহারপুর-পাড়ঘাটির গৃহহীনরা নিকটবর্তী বাঁধসহ নিরাপদ উঁচু স্থানে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন।

জামালপুর, দেওয়ানগঞ্জ, সরিষাবাড়ী ও মাদারগঞ্জ : মাদারগঞ্জের বন্যাকবলিত ৭ ইউনিয়নে ৭টি মেডিকেল টিমের মাধ্যমে খাবার স্যালাইন, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ওষুধ বিতরণের কাজ শুরু হলেও এখনও বীরভাটিয়ানি, হাটমাগুড়া, ফুলজোড়, খামারমাগুড়াসহ অনেক গ্রামে মেডিকেল টিমের লোকজন যায়নি। মাদারগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মেহেদী ইকবাল জানান, মেডিকেল টিমের জন্য সরকারিভাবে নৌকা ভাড়া পরিশোধের সুযোগ না থাকায় অনেক এলাকায় কর্মীরা পৌঁছতে পারছে না। অন্যদিকে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার প্রদ্যুৎনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেয়া বানভাসি লোকজনের হাতে-পায়ে ঘাসহ নানা রোগবালাই দেখা দিয়েছে। তারা জানান, মাঠে জমে থাকা বন্যার পানি পচে গন্ধ হয়েছে। হাতে-পায়ে ঘা, মরিচের মতো শরীর জ্বালাপোড়া করে। স্কুলগেটে এসে পচা পানি দেখে কোনো স্বাস্থ্যকর্মী এখানে আসে না। রেলস্টেশন সংলগ্ন রেলওয়ে উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে পৌর এলাকার শতাধিক বানভাসি পরিবারের মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। এই কেন্দ্রে শিশু আপনের বাবা জানান, আশ্রয় কেন্দ্রে অধিকাংশ শিশুর জ্বর ও শরীরে ফোঁড়া দেখা দিয়েছে। এদিকে জেলায় বন্যার পানি কিছুটা কমলেও বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণের জন্য হাহাকার দেখা দিয়েছে। শনিবার সরেজমিন মেলান্দহ উপজেলায় গিয়ে দেখা গেছে বানভাসিদের আর্তনাদ। মেলান্দহ পৌরসভা বাশুদেব এলাকার মৃত রেহান আলীর ৭৫ বছর বয়সী স্ত্রী রামিছা বেওয়া বলেন, ‘উমির উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ত্রাণমন্ত্রী আসার কথা হুইনা বুকটা ভইরা আশা নিয়ে আইছিলাম ত্রাণ নিবার। কিন্তু কিছুই পেলাম না।’ এদিকে সরিষাবাড়ীতে পানিতে পড়ে মিম নামে এক শিশু মারা গেছে।

রাজশাহী : ভারত থেকে আসা ঢলে ফুলে-ফেঁপে উঠছে পদ্মার পানি। প্রতিদিনই নদীতে পানি বাড়ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, চলতি মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত পদ্মায় পানি বাড়া অব্যাহত থাকবে। ফলে নিন্মাঞ্চলে বন্যা দেখা দিতে পারে। আর গবেষকদের আশঙ্কা গেল বছরের মতো এবারও ভারত ফারাক্কার সবকটি গেট খুলে দিলে রাজশাহী তলিয়ে যেতে পারে। কারণ বর্তমানে নদী তলদেশ অন্তত ১৮ মিটার ভরাট হয়ে গেছে। এ কারণে পদ্মার বুকে এত পানি চাপ ধারণের সক্ষমতা নেই। রাজশাহীতে পদ্মার বিপদসীমা ১৮ দশমিক ৫০ মিটার।

নীলফামারী ও সৈয়দপুর : জেলায় এক সপ্তাহের বন্যায় একাধিক কালভার্ট, একটি বাঁধ ও একাধিক কাঁচা রাস্তা ভেঙে গেছে। এতে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সৈয়দপুরে উঁচু এলাকা থেকে বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে। তবে এখনও উপজেলার অনেক বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ ও হাসপাতালের সামনে হাঁটুসমান পানি রয়েছে। শহরের ১০নং ওয়ার্ডের পাটোয়ারীপাড়া ও কাজিহাট রোড এবং দিনাজপুর রোডটির বিভিন্ন স্থান ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। খুব সাবধানে চলাচল করছে দূরপাল্লাসহ ছোট-বড় যানবাহন। এ সড়কের কুন্দল দহলা ব্রিজটি যে কোনো মুহূর্তে ধসে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। ব্রিজের উভয়পাশের মাটি সরে গেছে। ভেঙে গেছে রেলিং।

গাইবান্ধা : শনিবার বিকালে বাঙালি নদীর পানির তোড়ে নুরুল্যা বিল বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের প্রায় ১শ’ মিটার ভেঙে গেছে। এতে পার্শ্ববর্তী বেশ কয়েকটি গ্রাম নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। জেলার সবকটি উপজেলাই প্লাবিত হওয়ায় লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে পল্লী সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ দফতর জানিয়েছে, এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী এবারে জেলায় বন্যা উপদ্রুত এলাকায় ৫২৬ কিমি. কাঁচা সড়ক ধ্বংস হয়ে গেছে। শুধু পলাশবাড়ী উপজেলায় মাত্র ১২ কিমি. পাকা সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পঞ্চগড় : বর্তমানে পঞ্চগড়ে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে বন্যার আঘাতে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট ভেঙে গেছে। পঞ্চগড়-দিনাজপুর রেলপথের নয়নীবুরুজ থেকে কিসমত পর্যন্ত প্রায় ২ কিলোমিটার সড়কের স্লিপারের পাথর সরে গিয়ে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে রেললাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে রেল যোগাযোগ।

মাদারীপুর : পদ্মার পানি অস্বাভাবিক হারে বাড়তে থাকায় ডুবে গেছে কাঁঠালবাড়ীর ৩টি ফেরিঘাট সংলগ্ন পন্টুন ও সড়ক। এতে যাত্রী দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। সে াতের গতিবেগ বেড়ে যাওয়ায় প্রতিটি ফেরিসহ নৌযান পারাপারে আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা বেশি সময় লাগছে। ফলে উভয় পাড়ে দেখা দিয়েছে যানজট।

সিংড়া (নাটোর) : শনিবার সিংড়ার আত্রাই নদীর পানি বিপদসীমার ৭১ সেন্টিমিটার ওপর। এতে নতুন করে সিংড়া পৌর শহরের বাজার এলাকা ও পল্লী বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র হুমকির মুখে পড়েছে। বন্যাদুর্গতদের জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৭টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে।

টাঙ্গাইল ও গোপালপুর : বঙ্গবন্ধু সেতু এলাকার দক্ষিণ পাশে শনিবার রাতে যমুনা নদীর দ্বিতীয় গাইড বাঁধের ১০ থেকে ১২ ফুট পর্যন্ত কিছু পাথর ধসে পড়েছে। পরে তাৎক্ষণিক স্থানীয় এলাকাবাসী বালির বস্তা ফেলে বাঁধ রক্ষার চেষ্টা শুরু করেন। তবে এ বাঁধের পাথর ধসের কারণে কোনো বড় ধরনের ক্ষতি হবে না বলে বিবিএ’র সহকারী প্রকৌশলী ওয়াসিম জানিয়েছেন। শুক্রবার রাত ১০টার দিকে পানির চাপে গোপালপুরের ঝাওয়াইল-ভেঙ্গুলা সড়কের দড়িসয়া দক্ষিণপাড়া নামক স্থানে একটি কালভার্টসহ প্রায় ২০-২৫ মিটার সড়ক ধসে গেছে। এতে ১০ গ্রামের মানুষের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। শনিবার দুপুরে এলাকাবাসীকে ওই স্থানে বাঁশের সাঁকো মেরামতের চেষ্টা করতে দেখা গেছে।

শেরপুর : শেরপুর সদর, নকলা ও শ্রীবরদী উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের ৭৪টি গ্রামের নিন্মাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। প্রতি মুহূর্তে এসব গ্রামের নিন্মাঞ্চলের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বন্যাকবলিত এলাকার অনেক উচ্চ বিদ্যালয় ও প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেছে।

ফরিদপুর : জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল। বন্যায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে সদর উপজেলা ছাড়াও তিনটি উপজেলার প্রায় ৫০টি স্কুল ও মাদ্রাসা বন্ধ ঘোষণা করে আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। শনিবার বানভাসি মানুষের মাঝে শুকনা খাদ্য সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসেন ঝিনাইদহ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কাজী আশরাফুজ্জামান।

সিরাজগঞ্জ : সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও যমুনার শাখা ফুলজোড়, করতোয়া, ইছামতি, দইভাঙ্গা ও বড়াল নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। বন্যাকবলিত এলাকায় ২৮৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখনও বন্ধ রয়েছে। চর ও দুর্গম অঞ্চলের বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে।

বগুড়া : বগুড়ায় কয়েকদিন বৃষ্টি না হওয়া ও উজান থেকে ঢল কম আসায় সারিয়াকান্দিতে যমুনা নদীতে পানি কমতে শুরু করেছে। তবে যমুনার পশ্চিম পাশে বাঙালি নদীতে পানি বাড়ছে। এতে বাঙালি তীববর্তী এলাকায় বসবাসকারীদের মাঝে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।

অন্যান্য জেলার বন্যা পরিস্থিতি ও ত্রাণ বিতরণ : মৌলভীবাজারের বড়লেখায় চার ঘণ্টার টানা বৃষ্টিতে বন্যার ফের অবনতি হয়েছে। তলিয়ে গেছে রোপা আমনের ক্ষেত। চাঁদপুরে বন্যার পানি হঠাৎ বৃদ্ধি পাওয়ায় ধনাগোদা নদীতে মতলব ফেরির দু’পাড়ের গ্যাংওয়ে তলিয়ে গেছে। এতে মতলবের ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। গাইবান্ধায় পানিতে ডুবে আদুরি (৩) নামে এক শিশু মারা গেছে। মেহেরপুরে পানিতে ডুবে ও সাপের কামড়ে সোহান হোসেন (১০) ও শফিকুল ইসলাম (১৩) নামে দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। কুলাউড়ায় রাজনগরে নৌকাডুবিতে নিখোঁজ মানির মিয়ার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে তিন নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত। শরীয়তপুরে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। মাদারীপুরের শিবচরে ত্রাণ বিতরণ শুরু করেছে স্থানীয় প্রশাসন। ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীতে ত্রাণ বিতরণে দুর্নীতির অভিযোগ। শেরপুরের শ্রীবরদীতে স্থানীয় এমপি প্রকৌশলী একেএম ফজলুল হক চাঁন ত্রাণ বিতরণ করেছেন। শনিবার দুপুরে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ একেএম কলেজ চত্বরে উপজেলা আওয়ামী লীগের উদ্যোগে বন্যাদুর্গতদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেন সাবেক খাদ্যমন্ত্রী ড. আ. রাজ্জাক এমপি। এ ছাড়া এদিন রাজশাহীর বাগমারা, সিরাজগঞ্জ, নওগাঁ, সিলেট, নাটোরের সিংড়া, গাইবান্ধা, শেরপুর ও কুড়িগ্রামে বন্যার্ত মানুষের মাঝে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধির উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ করা হয়।


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত