হজ এজেন্সির প্রতারণা, হাজিদের থাকা, খাওয়া ও যাতায়াতে ভোগান্তি
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বেসরকারি হজ এজেন্সির বিরুদ্ধে সৌদি আরবে হাজিদের সঙ্গে অব্যবস্থাপনা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়সহ প্রতারণার বিস্তর অভিযোগ উঠেছে। নির্ধারিত হোটেলে হাজিদের থাকার ব্যবস্থা না করা, নিম্নমানের খাবার সরবরাহ, যাতায়াতে দুর্ভোগ এবং লাগেজ হারানোসহ নানা সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন গতবারের হজযাত্রীরা। মিনায় তাঁবুতে জায়গা না পেয়ে হাজিদের খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করতে হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী সেবা না দেওয়া, অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে একাধিক এজেন্সির বিরুদ্ধে। এসবের প্রতিকার চেয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ে ২০২৬ সালের হজ নিয়ে ৯৮টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে সৌদি আরব পর্বের ৪০টি এবং বাংলাদেশ পর্বের ৫৮টি অভিযোগ। ইতোমধ্যেই ৩৬টি অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়েছে।
নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে ৬২টি অভিযোগ। এর বাইরে আগের ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও ২০টি অভিযোগ প্রক্রিয়াধীন। অভিযোগের নথি পর্যালোচনায় এসব চিত্র উঠে এসেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে কয়েকটি এজেন্সির বিরুদ্ধে টাকা ফেরত ও ক্ষতিপূরণের নির্দেশসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ নিষ্পত্তি, ক্ষতিপূরণ আদায় এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা নিয়ে ভুক্তভোগীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।
এই প্রসঙ্গে ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ যুগান্তরকে বলেন, হজ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও হয়রানি বরদাশত করা হবে না। হজযাত্রীদের সঙ্গে প্রতারণা কিংবা চুক্তি অনুযায়ী সেবা দিতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট এজেন্সির বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো এজেন্সিকে ছাড় দেওয়া হবে না। অভিযোগগুলো তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।
হজযাত্রীদের অভিযোগ-হজে যাওয়ার আগে এজেন্সিগুলো উন্নত আবাসন, খাবার, পরিবহণ ও সার্বিক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিলেও সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর অনেক ক্ষেত্রে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। নির্ধারিত হোটেলে কক্ষ না পাওয়া, প্রতিশ্রুত হোটেলের পরিবর্তে দূরবর্তী ও নিম্নমানের হোটেলে রাখা এবং মক্কার মসজিদুল হারামে যাতায়াতের জন্য পর্যাপ্ত পরিবহণ না থাকার দুর্ভোগও রয়েছে।
বয়স্ক ও অসুস্থ হজযাত্রীদের ভোগান্তি ছিল আরও বেশি। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিশ্রুতির পরও হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা না করা, লাগেজ হারানো বা সময়মতো হাতে না পাওয়ার ঘটনায়ও এজেন্সিগুলোর অবহেলা ও অসহযোগিতার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
মিনায় নির্ধারিত দিনগুলোতে হজযাত্রীদের জন্য তাঁবুর ব্যবস্থা নিশ্চিত না করায় বেশ কয়েকজনকে রাস্তায় অবস্থান করতে হয়েছে। খাবার সরবরাহ নিয়েও অসন্তোষের অভিযোগ একাধিক এজেন্সির বিরুদ্ধে। চুক্তি অনুযায়ী দিনে তিন বেলা খাবার না দেওয়া, নিম্নমানের খাবার সরবরাহের অভিযোগ করেছেন হজযাত্রীরা। কোনো কোনো এজেন্সির বিরুদ্ধে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার পর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে জমা পড়া অভিযোগের মধ্যে কয়েকটি এজেন্সির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে। দাউদ এয়ার ট্রাভেলস ও তাহসিন এয়ার ট্রাভেলসের বিরুদ্ধে মক্কায় পৌঁছানোর পর হজযাত্রীদের হোটেলকক্ষ ও আবাসনের সুবিধা না দেওয়া এবং মিনা-আরাফাতে প্রয়োজনীয় গাইড ও পরিচর্যার ব্যবস্থা না রাখার অভিযোগ করেন মেহেদী হাসান ও মো. মাসুদুর রহমান মাসুদ নামের হজযাত্রীরা। মন্ত্রণালয়ে শুনানির সময় সংশ্লিষ্ট এজেন্সির স্বত্বাধিকারী দায় স্বীকার করে বাকি টাকা ফেরত দেওয়ার অঙ্গীকার করায় অভিযোগটি নিষ্পত্তি করা হয়।
নাইন স্টার ট্রাভেলসের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম নামের এক হজযাত্রী। তার অভিযোগ, নির্ধারিত দূরত্বের চেয়ে বেশি দূরের হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করা এবং চুক্তি অনুযায়ী সুবিধা না দেওয়া এবং নিম্নমানের খাবার পরিবেশন। শুনানি শেষে এক লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশের মাধ্যমে অভিযোগটি নিষ্পত্তি করা হয়।
শামস মিডিয়া ট্রাভেলস ও মুনমুন ট্রাভেলসের বিরুদ্ধে হজযাত্রীদের বিমানবন্দরে ফেলে রাখা, লাগেজ না পাওয়া এবং প্রতিশ্রুত সুবিধা না দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। মিরপুর টুর অ্যান্ড ট্রাভেলস ও আজমল ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামে দুই এজেন্সির বিরুদ্ধে চুক্তি ভঙ্গ ও প্রতারণার অভিযোগ করেন পাঁচজন হজযাত্রী।
তাদের অভিযোগ-মদিনার এক কিলোমিটারের পরিবর্তে পাঁচ কিলোমিটার দূরের হোটেলে রাখা হয়েছে। হোটেলের লিফট ঠিকভাবে কাজ না করা ও নিম্নমানের খাবার দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এটিও সমাধান করে ধর্ম মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয়ের হজ অধিশাখার উপসচিব মোহাম্মদ সফিউজ্জামান ভূঁইয়া যুগান্তরকে বলেন, আমরা এজেন্সির বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছি। অনেকের বিরুদ্ধে জরিমানা ও নানা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অনেক হজযাত্রীর সঙ্গে এজেন্সিগুলো উদ্যোগী হয়ে মীমাংসার চেষ্টা করলেও অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। ধারাবাহিকভাবে অভিযোগগুলো নিষ্পত্তির চেষ্টা করছি। সব অভিযোগ আমলে নিয়ে যথাযথ প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ভুক্তভোগী হজযাত্রীদের দাবি, জরিমানা করলেই হবে না, যেসব এজেন্সির বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে লাইসেন্স বাতিল, জামানত বাজেয়াপ্ত এবং আইন অনুযায়ী কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। গুরুতর অনিয়মে জড়িত এজেন্সিগুলোকে ভবিষ্যতে হজ কার্যক্রম থেকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করার দাবিও জানিয়েছেন কেউ কেউ।
হজসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী হজের আগেই অনিষ্পন্ন অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তি, অভিযুক্ত এজেন্সির বিরুদ্ধে তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং হজযাত্রীদের সেবার মান যাচাইয়ে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় পবিত্র হজ পালনে গিয়ে প্রতারণা, অব্যবস্থাপনা ও চরম ভোগান্তির শিকার হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে। ক্ষুণ্ন হবে দেশের ভাবমর্যাদা।

