লন্ডনে ১২৭ কোটি টাকার বাড়ি নাসার নজরুলের
Advertisement
সাদ্দাম হোসেন ইমরান
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
লন্ডনে তিনতলা বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের। ২০১৯ সালে যুক্তরাজ্যে ‘নাসা প্রপার্টিজ লিমিটেড’ নামে একটি কোম্পানি নিবন্ধন করে ৮০ লাখ পাউন্ড বা প্রায় ১২৭ কোটি টাকা দিয়ে বাড়িটি কেনা হয়। এই বাড়ির মালিকানায় তার মেয়ে আনিকা ইসলামও রয়েছেন। এছাড়া স্ত্রী নাসরিন ইসলামের নামে যুক্তরাজ্যের স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপ আইল অব ম্যান-এ শেল কোম্পানি গঠন করে ৮৬ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন নজরুল। এ টাকার পুরোটাই দেশ থেকে পাচার করেছেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলের (সিআইসি) অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
আয়কর আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশি করদাতাদের বিদেশে থাকা সম্পদের তথ্য আয়কর রিটার্নে প্রদর্শন বাধ্যতামূলক। কোনো ব্যক্তি আয়কর রিটার্নে সম্পদের তথ্য উল্লেখ না করলে সম্পদের ন্যায্য বাজারমূল্যের সমপরিমাণ জরিমানা আরোপের বিধান রয়েছে। যদিও জরিমানা আরোপের আগে করদাতাকে যুক্তিসঙ্গত শুনানির সুযোগ দেওয়ার কথা বলা আছে। জরিমানা আদায়ের জন্য করদাতার নিজস্ব সম্পদ বা তার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি ধারণ করছেন-এমন সম্পদ বিক্রি কিংবা বাজেয়াপ্ত করার বিধান রয়েছে আইনে।
সিআইসি সূত্র জানায়, লন্ডনে শুধু নজরুল ইসলাম মজুমদারের বাড়ি নয়, সেখানে একাধিক কোম্পানি ও ব্যাংক হিসাবে বিপুল অর্থ রয়েছে। নজরুল ও তার স্ত্রী নাসরিন ইসলামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ‘ওয়ান ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড’ নামে একটি কোম্পানির সন্ধান মিলেছে। আইল অব ম্যান-এ ২০১৯ সালে নিবন্ধিত এই কোম্পানির নামে ইউবিএস জার্সি ব্যাংকে ৫ দশমিক ৩০ মিলিয়ন ব্রিটিশ পাউন্ড পাওয়া গেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৮৬ কোটি টাকা।
এছাড়া লন্ডনের অভিজাত আবাসিক এলাকা কেনসিংটনের ব্রান্সউইক গার্ডেনসে তিনতলা বাড়িটি কেনার জন্য ২০১৯ সালে যুক্তরাজ্যে নাসা প্রপার্টিজ লিমিটেড নামে কোম্পানি খোলেন নজরুল। ওই কোম্পানির মাধ্যমে ৮০ লাখ পাউন্ড ব্যয়ে বাড়িটি কেনেন তিনি। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার মূল্য প্রায় ১২৭ কোটি টাকা। বাংলাদেশের বাইরে একাধিক কোম্পানি খুলে বিপুল মূল্যের স্থাবর সম্পদ গড়েন নজরুল; কিন্তু সেই সম্পদের তথ্য আয়কর রিটার্নে প্রদর্শন করেননি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিআইসি ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ’২৪-এর আগস্ট পরবর্তী সময়ে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কালে সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের কর ফাঁকির অনুসন্ধান শুরু করে সিআইসি। যার মধ্যে নজরুল ইসলাম মজুমদার রয়েছেন। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা অবস্থায় তিনি বিদেশে অর্থ পাচার করে অঢেল সম্পদ গড়েছেন। যার কিছু অংশ অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে। আয়কর আইন অনুযায়ী বাংলাদেশি করদাতার বিদেশে সম্পদ থাকলে তা রিটার্নে প্রদর্শন বাধ্যতামূলক। কিন্তু নজরুল সম্পদের কোনো তথ্য আয়কর বিভাগে জমা দেননি।
তিনি আরও বলেন, নজরুল ইসলাম মজুমদারের কর সার্কেলে ইতোমধ্যে সিআইসি থেকে কর ফাঁকি ও বিদেশে সম্পদের তথ্য উল্লেখ করে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সার্কেল আয়কর আইন অনুযায়ী পাচারকৃত অর্থের সমপরিমাণ জরিমানা আরোপ এবং জরিমানার টাকা আদায়ে সম্পদ জব্দ ও বিক্রির মাধ্যমে কর আদায়ের ব্যবস্থা নিতে পারে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, আয়কর নথিতে নজরুল ইসলাম এক হাজার ১২৭ কোটি টাকার সম্পদ দেখিয়েছেন। অথচ কর দিয়েছেন নামমাত্র সাড়ে তিন কোটি টাকা। নথিতে প্রদর্শিত সম্পদের মধ্যে অকৃষি সম্পদ ৫৩২ কোটি টাকা, ব্যাংক এফডিআর ৪৪০ কোটি টাকা, বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার ৯৮ কোটি টাকা, নগদ অর্থ ৩০ কোটি টাকা, ব্যবসার মূলধন ২৬ কোটি টাকা এবং সম্পদের বিপরীতে তার ব্যক্তিগত ঋণ ৩০০ কোটি টাকা দেখানো হয়েছে।
কর ফাঁকি ও অবৈধ সম্পদ বৈধ করতে নজরুল হঠাৎ মাছচাষি বনে যান। যা নিয়ে তখন আয়কর বিভাগ প্রশ্ন তুললেও ক্ষমতার দাপটে উৎরে যান তিনি। ২০১৯-২০ অর্থবছরের মজুমদার ফিশারিজ নামে কোম্পানি গঠন করে ভুয়া কাগজপত্র ও ভুয়া দলিলের মাধ্যমে মাছের খামার থেকে ২১৫ কোটি টাকা আয় দেখান এই ব্যবসায়ী নেতা। রিটার্নে জমা দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, খুলনা জেলার দাকোপ ও সাতক্ষীরায় ৪৫০ হেক্টর জমিতে চিংড়ি ও কার্প জাতীয় মাছ চাষ করেন তিনি। এই খামারের মাছ বিক্রি করে এক বছরেই তার আয় দেখানো হয় ২০২ কোটি টাকা, যার বিপরীতে খরচ দেখানো হয় ৯১ কোটি টাকা। তখন মৎস্য চাষের আয়ের এই উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও বেশি বেগ পেতে হয়নি তাকে। পরের অর্থবছর অর্থাৎ ২০২০-২১ অর্থবছরেও মৎস্য খামার থেকে আরও ১৩ কোটি টাকা আয় দেখান নজরুল। মাছ চাষের নাম ভাঙিয়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ বৈধ করার বিষয়ে এনবিআরের অনেকেই আপত্তি তোলেন। বিষয়টি পরবর্তীতে আয়কর আপিল ট্রাইব্যুনাল পর্যন্ত গড়ায়। শেষ পর্যন্ত এনবিআর কর্মকর্তাদের সহায়তায় পার পেয়ে যান তিনি।
আমদানি-রপ্তানির আড়ালে অর্থ পাচার : নজরুল ইসলাম মজুমদারের অর্থ পাচারের তদন্ত করছে বিএফআইইউ ও দুদক। তদন্তে নাসা গ্রুপের নামে যুক্তরাজ্য, হংকং, আইল অব ম্যান ও জার্সিতে মোট ১৮টি শেল কোম্পানি বা বেনামি কোম্পানি শনাক্ত করা হয়েছে। এগুলোতে বিনিয়োগের তথ্য অনুসন্ধান চলছে। এসব কোম্পানির মাধ্যমে আমদানি, রপ্তানি, হাউজিং ও ট্রেডিং ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে। তার জালিয়াতির সম্পদের মধ্যে এখন পর্যন্ত সরকারের কব্জায় নেওয়া হয়েছে ছয় হাজার ৯৫১ কোটি টাকার সম্পদ। এর মধ্যে দেশে থাকা সম্পদ রয়েছে ছয় হাজার ৩৪১ কোটি টাকার এবং বিদেশে রয়েছে ৬২০ কোটি টাকার সম্পদ। ’২৪ সালের আগস্ট পরবর্তী সময়ে আদালতের আদেশের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ৫২টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করা হয়েছে। এসব ব্যাংক হিসাবে স্থিতি রয়েছে ৫২২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।
