Logo
Logo
×

Advertisement

শেষ পাতা

বিশ্ব কন্যাশিশু দিবস আজ

ঘরে-বাইরে বাড়ছে শঙ্কা

বাল্যবিবাহ বন্ধ ও শিশুর অধিকারে বিনিয়োগের আহ্বান

Advertisement

Icon

শিপন হাবীব

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

একটি কন্যাশিশু মানেই একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ। তার চোখে থাকে বড় হওয়ার স্বপ্ন, পৃথিবীকে জানার আগ্রহ এবং নিজের মতো করে জীবন গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা। কেউ হতে চায় চিকিৎসক, কেউ শিক্ষক, কেউ বিজ্ঞানী কিংবা উদ্যোক্তা। কিন্তু সমাজের বৈষম্য, দারিদ্র্য, বাল্যবিবাহ ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক কন্যাশিশুর সেই স্বপ্ন পূরণের পথ কঠিন হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির মধ্যেও কন্যাশিশুর অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করা এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক চ্যালেঞ্জ। এমন বাস্তবতায় প্রতি বছরের মতো আজ ১১ অক্টোবর পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস। দিবসটির মূল লক্ষ্য হলো-কন্যাশিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং বৈষম্য ও সহিংসতা থেকে তাদের সুরক্ষা দেওয়া। দিবসটির এ বছরের প্রতিপাদ্য-‘বাল্যবিবাহ বন্ধ করুন, কন্যাশিশুর অধিকারে বিনিয়োগ করুন’।

কন্যারা দিন কিংবা রাত, কোনো সময়ই নিরাপদ নয়। ঘরে-বাইরে সর্বত্রই শঙ্কায় থাকে। বর্তমানে দেশে ৪৭ শতাংশের বেশি কন্যাশিশুর বাল্যবিবাহ হচ্ছে। ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, হত্যা এবং নানা ধরনের যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছে কন্যাশিশুরা। বাসা থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-কোথাও নেই শতভাগ নিরাপত্তা। চোখের আড়াল হলেই কন্যাশিশুরা শারীরিক ও যৌননির্যাতনসহ নানাভাবে নির্যাতিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কন্যাশিশুদের সুরক্ষায় এমন দিবসগুলোতে নানা আঙ্গিকে আলোচনা, সভা-সেমিনার হয়। কিন্তু কন্যাদের জীবন শঙ্কামুক্ত হয় না। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য-পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র প্রতিনিয়ত ব্যর্থ হচ্ছে কন্যাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে।

আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস উপলক্ষ্যে আগামীকাল ১২ অক্টোবর সোমবার মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম যৌথভাবে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে। সকাল সাড়ে ৯টায় রাজধানীর শিশু একাডেমি মিলনায়তনে ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ‘শিশু বিয়ে আর নয়, কন্যা করবে বিশ্বজয়’-স্লোগানের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করা হবে।

বাবার মৃত্যুর পাঁচ দিনের মাথায় শুক্রবার চার বছরের এক কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। শিশুটিকে ফরিদপুরের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। দেশে প্রতিদিন দুজনের বেশি কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। সেপ্টেম্বরে ৭৯ কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য বলছে, চলতি মাসে ১৩ শিশুকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়েছে। ধর্ষণের পর তিন শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে-চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৬৩ কন্যাশিশু ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৫ শিশুকে। যৌনহয়রানির শিকার হয়েছে শতাধিক শিশু। তবে কন্যাশিশুকে ধর্ষণ ও যৌননির্যাতনের ঘটনার বেশির ভাগই গণমাধ্যমে আসে না। ক্ষতিগ্রস্তদের বেশির ভাগই কন্যার ভবিষ্যদের কথা চিন্তা করে মামলা কিংবা ধর্ষণের ঘটনাটি এড়িয়ে যায়।

অপরাজেয় বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ওয়াহিদা বানু যুগান্তরকে বলেন, ‘দেশে পথশিশুর সংখ্যা ১৫ লাখের বেশি। এসব শিশুর মধ্যে কন্যাশিশুর সংখ্যা ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। এসব কন্যাশিশু সহজেই যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছে। পথশিশু কিংবা ভবঘুরে কন্যাশিশুরা সর্বত্রই নিরাপত্তাহীনতায় থাকে। পথ কিংবা ভবঘুরে সব শিশুকে উদ্ধার করা এবং তাদের অধিকার নিশ্চিত করা সরকার ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্ব কোনো সরকারই যথাযথভাবে পালন করছে না। তাছাড়া হারানো শিশু, কন্যাশিশু বিক্রি বা পাচারের ঘটনা আরও উদ্বেগের।’

রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়ুয়া তৃতীয় শ্রেণির এক ছাত্রী (মায়ের সঙ্গে থাকা) যুগান্তরকে বলে, তার পরিবার থেকে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে-কী করে যৌননির্যাতন থেকে বাঁচা যাবে। আপন কিংবা দূরের মানুষ-কাউকেই বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে বিশ্বাস করা যাবে না। যৌন সহিংসতার শিকার কিংবা শিকার হওয়ার সম্ভাবনা দেখলেই জোরে চিৎকার দিতে হবে। মা-বাবা এবং পরিবারের সদস্যদের জানাতে হবে।’ ছোট্ট এ শিক্ষার্থীর ভাষ্য-কন্যাশিশুর সুরক্ষার প্রথম ধাপটি ঘর থেকেই শুরু করতে হবে। অভিভাবকদের সবার আগে সচেতন হতে হবে।

রাজধানীর একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষিকা কামরুন্নাহার রুমী বলেন, কন্যাশিশুরা নানা সময় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কন্যাশিশুকে সর্বোচ্চ সতর্ক এবং অভিভাবকদেরও নজর বাড়াতে হবে। কন্যাদের সুরক্ষা খুব জরুরি। নিরাপত্তার ভাবনায় আপন-পরের কোনো মানদণ্ড নেই। মেয়ে আত্মীয়-স্বজন-পরিচিতদের কাছে সুরক্ষিত-এমন ভাবনা পোষণের চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হলো সতর্ক থাকা। ‘সাবধানের মার নেই’-এই নীতি প্রযোজ্য। ঘরে-বাইরে সব খানেই কন্যাশিশুর সুরক্ষায় সোচ্চার হতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুল ইসলাম খান বলেন, যখন কোনো দেশে কন্যাশিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত হয় না, সেসব দেশে বাল্যবিবাহও বেশি হয়। সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সোচ্চার হতে হবে-কন্যা তথা কোনো শিশুর জীবনই যেন অনিরাপদ না হয়।

এদিকে শিশু ধর্ষণ, হত্যা কিংবা যৌন সহিংসতার ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কন্যার প্রতি যৌন হিংসায় শিশুদের প্রতিবেশী, আত্মীয় কিংবা ঘনিষ্ঠজনরাই সবচেয়ে বেশি সম্পৃক্ত। বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকারকর্মীদের মতে, এসব ঘটনার পেছনে শুধু ব্যক্তিগত অপরাধ প্রবণতা নয়, দীর্ঘদিনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয় দায়ী। মাদকাসক্তির বিস্তার, অনলাইন কনটেন্টের সহজলভ্যতা, পরিবার ও শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি এবং অপরাধ করে পার পাওয়ার প্রবণতা এ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। অপরদিকে শিশু নির্যাতন ও হত্যার মামলাগুলোর বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার শঙ্কায় থাকে।

জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম মনে করছে, কন্যাশিশুরা কেবল ভবিষ্যৎ মা নয়, তারা দেশের ভবিষ্যৎ ও এক অবিচ্ছেদ্য মানবসম্পদ। তাই তাদের প্রতি বৈষম্য ও অবহেলার অবসান ঘটাতে হবে। কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা, ধর্ষণ ও নির্যাতন রোধে সরকারের পাশাপাশি পরিবার ও স্থানীয় কমিউনিটিকে সোচ্চার এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। বাল্যবিবাহ থেকে কন্যাশিশুদের রক্ষা করতে কঠোরভাবে ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন’ ও বিধিমালা বাস্তবায়ন করতে হবে।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

লন্ডনে ১২৭ কোটি টাকার বাড়ি নাসার নজরুলের

লন্ডনে ১২৭ কোটি টাকার বাড়ি নাসার নজরুলের

বিশ্ব কন্যাশিশু দিবস আজ ঘরে-বাইরে বাড়ছে শঙ্কা

ঘরে-বাইরে বাড়ছে শঙ্কা

সহিংসতা-যৌন নির্যাতন দশ বছরে ৫২৬৪ কন্যাশিশুর মৃত্যু

দশ বছরে ৫২৬৪ কন্যাশিশুর মৃত্যু

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব গুরুত্ব পাবে: হুমায়ুন কবির

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব গুরুত্ব পাবে: হুমায়ুন কবির

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম