ইমরানের ঘাঁটি খাইবারে কেন জরুরি অবস্থা জারি করল শাহবাজের সরকার?
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০২:১৪ পিএম
পিটিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে পাকিস্তানের বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক লড়াই নতুন মোড় নিয়েছে। খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে ইমরানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) নেতৃত্বাধীন সরকার স্থগিত করে সেখানে গর্ভনরের শাসন জারি করেছে শাহবাজ শরিফের সরকার।
এ পদক্ষেপের ফলে ইমরান খানের অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক ঘাঁটি সরাসরি শাহবাজ শরিফের নেতৃত্বাধীন সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। এতে সামরিক বাহিনীর সমর্থনপুষ্ট সরকার ও পিটিআইয়ের মধ্যে বিরোধ আরও গভীর হয়েছে।
শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাহীনতার প্রেক্ষাপটে প্রায় চার কোটি মানুষের এ প্রদেশের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে ইমরান খানের দল। ফলে অঞ্চলটি পাকিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতার সর্বশেষ কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
অক্টোবরের শুরু থেকে খাইবার পাখতুনখাওয়ার রাস্তায় হাজারো মানুষ নেমে এসেছে। তারা ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে এবং আফগানিস্তান সীমান্তে সামরিক বাহিনীর সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের প্রতিবাদে বিক্ষোভ করছে।
পাকিস্তান সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কথা উল্লেখ করে এ পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি দিয়েছে। একই সঙ্গে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ তুলেছে প্রাদেশিক প্রশাসনের বিরুদ্ধে।
আফগান তালেবানের আদর্শিক মিত্র তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জঙ্গিরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হাজার হাজার নিরাপত্তাকর্মী ও বেসামরিক মানুষকে হত্যা করেছে।
প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের কার্যালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘খাইবার পাখতুনখাওয়ার অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রাদেশিক সরকারের ইচ্ছাকৃত উদাসীনতার কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতি নিয়ে মন্ত্রিসভা বিস্তারিত পর্যালোচনা করেছে।’
তবে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসলামাবাদভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (সিআরএসএস) সংকলিত পরিসংখ্যানে প্রদেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতির ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের প্রথম ৯ মাসে খাইবার পাখতুনখাওয়ায় বেসামরিক মানুষ ও নিরাপত্তাকর্মীদের মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৪৮৫। ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় এ সংখ্যা ১৬ শতাংশ কম।
গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, পুরো পাকিস্তানে এ ধরনের মৃত্যু ৯ শতাংশ বেড়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি জরুরি অবস্থা অনুমোদন করেছেন। প্রেসিডেন্টের কার্যালয় জানিয়েছে, প্রদেশটিতে পাকিস্তান সরকার ও পিটিআই নেতাদের মধ্যে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গভর্নর শাসনের অধীনে পাকিস্তান সরকার নিযুক্ত গভর্নর প্রদেশটির প্রশাসনের দায়িত্ব নেন।
পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রদেশটির প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়তা এবং সরকারি সম্পত্তি ও স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনা মোতায়েন করা হবে।
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তালাল চৌধুরী ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেছেন, এটি একটি ‘নিয়মিত পদক্ষেপ’। বিশেষ করে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রাদেশিক কর্তৃপক্ষকে তাদের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করাই এর উদ্দেশ্য।
জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর গ্রেফতার পিটিআই নেতারা
জরুরি অবস্থা ঘোষণার পরপরই রাজনৈতিক বিরোধ আরও তীব্র হয়ে ওঠেছে। এ সময় পিটিআইয়ের জ্যেষ্ঠ নেতাদের গ্রেফতারের খবর সামনে আসে।
পিটিআইয়ের প্রাদেশিক শাখার সভাপতি ও এমপি জুনায়েদ আকবরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি এক্স অ্যাকাউন্টে বলা হয়, তাকে এবং প্রদেশটির মুখ্যমন্ত্রী সোহাইল আফ্রিদিকে আটক করা হয়েছে।
৩৭ বছর বয়সি আফ্রিদি ইমরান খানের সমর্থনে এবং সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে প্রদেশজুড়ে লংমার্চের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। পিটিআইয়ের দাবি, এসব অভিযানে বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন এবং সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
আফ্রিদি পাকিস্তানের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সি মুখ্যমন্ত্রী। তার বাড়ি আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী উপজাতীয় এলাকায়।
তার সরকার স্থগিত হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে আফ্রিদি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বিক্ষোভকারীদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত লংমার্চ চলবে।
এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আফ্রিদি বলেন, ‘আমাদের দাবি মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা পিছপা হব না। আইন অনুযায়ী দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের লংমার্চ চলবে। এখানে শুধু ইমরান খানের নীতিই কার্যকর হবে।’
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বিষয়ে মন্তব্য চেয়ে যোগাযোগ করা হলেও পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী কোনো জবাব দেয়নি।
রাজনৈতিক লড়াইয়ের কেন্দ্রে ইমরান খানের ঘাঁটি
খাইবার পাখতুনখাওয়া ইমরান খানের দল পিটিআইয়ের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘাঁটি। ২০১৩ সাল থেকে প্রদেশটি শাসন করে আসছে দলটি।
২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রাদেশিক পরিষদের ৬০ শতাংশের বেশি আসনে জয় পেয়েছিল পিটিআই। এর দুই বছর আগে পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে অপসারিত হয়েছিলেন ইমরান খান।
বিশ্বকাপজয়ী সাবেক এই ক্রিকেট অধিনায়ককে এখনও পাকিস্তানের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনীতিক হিসেবে ব্যাপকভাবে বিবেচনা করা হয়।
২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে তার সমর্থিত প্রার্থীরা জাতীয় পরিষদে সর্বাধিক আসন পেয়েছিলেন। তবে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামরিক বাহিনী ও দেশের দুটি প্রধান বংশানুক্রমিক রাজনৈতিক দল নির্বাচনের পর ক্ষমতা ভাগাভাগির যে ব্যবস্থা গড়ে তোলে, তাতে ইমরান-সমর্থিত প্রার্থীরা ক্ষমতার বাইরে থেকে যান।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের বরাতে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সাধারণ নির্বাচন হলে পিটিআই সহজেই জয় পেতে পারে।
পিটিআইয়ের অভিযোগ, শাহবাজ শরিফের সরকার নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে প্রদেশের নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে।
দলটির মুখপাত্র শেখ ওয়াকাস আকরাম এক বিবৃতিতে বলেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী সোহাইল আফ্রিদি ও জুনায়েদ আকবরকে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে সরকারের পদক্ষেপের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়ে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলা করা নয়; বরং পিটিআইকে দুর্বল করা, খাইবার পাখতুনখাওয়ার নির্বাচিত সরকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং সেখানকার জনগণের গণতান্ত্রিক রায়কে উপেক্ষা করা।’ সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া


-6ab3fa181f103-6acc8bff38932.webp)