গাজী নজরুলের এমপি পদ কি শেষ পর্যন্ত থাকছেই?
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫৪ পিএম
গাজী নজরুল ইসলাম। ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে নৈতিক স্খলনের অভিযোগে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। গত ২২ জুলাই বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের পরদিন বিষয়টি জানিয়ে স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনে চিঠি দেয় দলটি। তবে শুধু দল থেকে বহিষ্কারের কারণে তার সংসদ সদস্য পদ শূন্য হবে কি না, তা নিয়ে সাংবিধানিক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এদিকে এদিকে দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মকে আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলায় দুই দফা ৮ দিনের রিমান্ড শেষে নজরুল ইসলামের জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বিকালে শুনানি শেষে এ আদেশ দেওয়া হয়।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত সংসদ সদস্য দল থেকে পদত্যাগ করলে অথবা সংসদে ওই দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তার আসন শূন্য হবে। তবে দলীয়ভাবে বহিষ্কারের বিষয়টি ওই অনুচ্ছেদে সরাসরি উল্লেখ নেই। এ কারণে শুধু বহিষ্কারের ভিত্তিতে গাজী নজরুলের এমপি পদ শূন্য হবে কি না, তা নিয়ে আইনজীবীদের মধ্যে ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সিনিয়র আইনজীবী ব্যরিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন যুগান্তরকে বলেন, সংবিধান ও আইন অনুযায়ী গাজী নজরুল সংসদ সদস্য পদে থাকতে পারবেন না। কারণ নৈতিক স্খলনের কারণে তার দল তাকে বহিষ্কার করেছে। এক্ষেত্রে সংবিধানের ৬৬(৪) অনুচ্ছেদ কার্যকর হবে। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত এক্ষেত্রে চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে।
উদাহরণ হিসেবে তিনি ১৯৯৬ সালের পার্লামেন্টে বিএনপির তৎকালীন সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের প্রসঙ্গ টেনে আনেন। ব্যারিস্টার খোকন জানান, ফ্লোর ক্রসিংয়ের কারণে আখতারকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। তিনি কোর্টে গিয়েছিলেন। তখন আমি বিএনপি পক্ষে লড়েছিলাম। ওই মামলায় আখতার হেরে গিয়েছিলেন, তথা তার সংসদ সদস্য পদ হারাতে হয়েছিল।
গাজী নজরুল ইসলামের বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের পর তাকে নিয়ে একটি পোস্ট দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। তিনি লেখেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে আছে ‘পদত্যাগ’। তিনি (গাজী নজরুল ইসলাম) হয়েছেন ‘বহিষ্কার’। জামায়াত আজকেই নির্বাচন কমিশনকে জানিয়ে (তাকে বহিষ্কারের বিষয়ে) দিচ্ছে। কারণ ‘নৈতিকস্খলন’। প্রশ্ন হচ্ছে সংসদ সদস্য থাকতে পারবেন কি না? আমার মতে না।
তবে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান ভিন্ন মত পোষণ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য যে রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে নির্বাচিত হয়েছেন, সেই দল থেকে পদত্যাগ করলে, দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিলে বা ভোটদান থেকে বিরত থাকলে, কিংবা অনুচ্ছেদে বর্ণিত অন্যান্য পরিস্থিতির উদ্ভব হলে তার সংসদ সদস্যপদ শূন্য হতে পারে। তবে অনুচ্ছেদ ৭০-এ দল কর্তৃক বহিষ্কার (expulsion) কে সংসদ সদস্যপদ শূন্য হওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে, কেবল নৈতিক স্খলনের অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার কারণে কোনো সংসদ সদস্যের সদস্যপদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে এমনটি সংবিধানের ভাষা থেকে বলা যায় না। তবে বহিষ্কারের পর যদি তিনি অনুচ্ছেদ ৭০-এ বর্ণিত অন্য কোনো পরিস্থিতির মধ্যে পড়েন, তাহলে বিষয়টি ভিন্নভাবে বিবেচিত হতে পারে। অতএব, বিদ্যমান সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী, শুধুমাত্র বহিষ্কারই সংসদ সদস্যপদ শূন্য করার জন্য যথেষ্ট আইনগত ভিত্তি নয়। কোনো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সদস্যপদ শূন্য হওয়ার প্রশ্ন সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী নির্ধারিত হবে এবং প্রয়োজনে তা আদালতের বিচারিক পর্যালোচনার বিষয় হতে পারে।
যদি কোনো বিরোধ সৃষ্টি হয়— কোনো এমপি অনুচ্ছেদ ৭০ অনুযায়ী আসন হারিয়েছেন কিনা— তাহলে সংবিধানের ৬৬(৪) অনুযায়ী বিষয়টি নির্বাচন কমিশন (ইসি) নিষ্পত্তি করবে এবং কমিশনের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। এ বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান বলেন, এক্ষেত্রে ইসির সিদ্ধান্তই অ্যাবসলিউট না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দল কিংবা ইসির সিদ্ধান্ত মেনে নিতেও পারেন। আবার না মানলে হাইকোর্টে রিটও করতে পারেন। সেখানেও সমাধান না হলে আপিলেট ডিভিশনে যাওয়ার সুযোগ আছে।
তবে গাজী নজরুলের ক্ষেত্রে ইসির অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। গত ২৩ জুলাই নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেছিলেন, শুধু দল থেকে বহিষ্কারের চিঠির ভিত্তিতে ইসির কিছু করার সুযোগ নেই। স্পিকার বা সংসদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক রেফারেন্স পেলে বিষয়টি পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
পরবর্তীতে গত ২১ সেপ্টেম্বর ইসি সচিব আখতার আহমেদও জানান, গাজী নজরুলের বিষয়ে স্পিকারের কাছ থেকে ইসি কোনো চিঠি পায়নি। তার ভাষ্য, সংসদ সচিবালয় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি জানানো হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ওই সময় পর্যন্ত গাজী নজরুল সংসদ সদস্য পদে বহাল ছিলেন।
গাজী নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের লাশ গত ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় করা আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় গাজী নজরুলকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ঘটনাটি সামনে আসার পর তার সংসদ সদস্য পদ নিয়ে আলোচনাও নতুন করে শুরু হয়।
ফলে গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদ নিয়ে এখন মূল প্রশ্ন হচ্ছে, তার বহিষ্কারকে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের আওতায় কীভাবে দেখা হবে এবং স্পিকার বিষয়টি নির্বাচন কমিশনে পাঠাবেন কি না। এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তই পরবর্তী অবস্থান নির্ধারণ করবে।


