সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আজ বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) দেশবরেণ্য প্রবীণ রাজনীতিক, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী, বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এমপি’র ৮১তম জন্মদিন। ৮০ পেরিয়ে ৮১বছরে পদার্পণ করলেন তিনি।
ড. খন্দকার মোশাররফ ১৯৪৬ সালের ১ অক্টোবর কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি উপজেলার গয়েশপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, প্রথিতযশা ভূ-বিজ্ঞানী, গবেষক, লেখক ও কলামিস্ট।
বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ও কর্মবহুল জীবনে তার ঝুলিতে অর্জনের ভাণ্ডার বিশাল। তিন মেয়াদে মন্ত্রী ও ৫ বার এমপি হয়ে নির্বাচনী এলাকায় দাউদকান্দি পৌরসভা ও নতুন উপজেলা তিতাস প্রতিষ্ঠা, ড. মোশাররফ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ২টি ডিগ্রী কলেজ, ৩টি হাইস্কুল, ১টি দাখিল মাদরাসা, ১টি নূরানী মাদরাসা ও এতিমখানা কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠা করেছেন।
যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য তিনি প্রয়োজনীয় ব্রিজ-কালভার্ট, প্রচুরসংখ্যক গ্রামীণ পাঁকা সড়ক নির্মাণ, দাউদকান্দিতে বিশাল পৌরভবন নির্মাণ, শহীদনগরে ট্রমা সেন্টার, নবগঠিত মেঘনা উপজেলা বাস্তবায়ন, দাউদকান্দি সদরে ২০ শয্যার হাসপাতাল, তিতাস ও মেঘনা উপজেলা কমপ্লেক্স ভবন, দুই উপজেলায় ৫০ শয্যার হাসপাতাল ও ২টি থানা কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণ, দাউদকান্দির ঢাকারগাঁওয়ে প্রতিবন্ধী উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা ও ফায়ার সার্ভিস ষ্টেশন স্থাপনসহ সর্বক্ষেত্রে প্রায় সহস্রাধিক কোটি টাকার উন্নয়ন করেছেন। এতে অনগ্রসর ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে। উন্নয়নের সুফল জনগণ এখন ভোগ করছেন। ড. মোশাররফ ৩ সহস্রাধিক শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতীর কর্মসংস্থান করেছেন।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটের ব্যবধানে কুমিল্লা-১ আসনে ৫ম বারের মতো এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। ইতোমধ্যে দাউদকান্দি ও মেঘনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০১ শয্যায় উন্নীত, ট্রমা সেন্টার চালু, অনেক সেতু ও সড়ক নির্মাণ, পাকাকরণ এবং মেরামতের কাজ সমাপ্ত করেছেন।
তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন ও মৎস্য খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের জন্য তিনি দেশ-বিদেশে স্বর্ণপদকসহ প্রচুর সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।
মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে বিশ্বজনমত সৃষ্টির জন্য খন্দকার মোশাররফ ১৯৭১ সালে বিলাত প্রবাসী বাঙালীদের সংগঠিত করেন। বিলেতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক খন্দকার মোশাররফ গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দিয়ে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের প্রশংসা অর্জন করেছেন।
‘প্রবাসে বিশ্বজনমত গঠন’ ক্যাটাগরিতে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে তার নাম গেজেটভুক্ত করা হয়েছে। অবশ্য স্বাধীনতার পর প্রকাশিত প্রথম গেজেট থেকেই ড. মোশাররফ বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে তালিকাভূক্ত রয়েছেন। পরবর্তীতে সরকার তাকে প্রবাসী কোটায় বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে নতুনভাবে সরকারি গেজেটভূক্ত করেন।
তিনি ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার হটানোর এক দফা এবং দেশ ও জনগণের স্বার্থরক্ষার প্রতিটি আন্দোলনে বীরোচিত ভূমিকা রেখেছেন। ড.মোশাররফ বিভিন্ন সরকারের প্রতিহিংসার শিকার হয়ে ষড়যন্ত্রমূলক রাজনৈতিক মামলায় ১৯৮৬, ১৯৯৬, ২০০৭, ২০১২ এবং ২০১৪ সালে গ্রেফতার হয়ে প্রায় ৫ বছর কারাভোগ করেন।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আহবানে সাড়া দিয়ে ১৯৭৯ সালে ঢাবির শিক্ষক অধ্যাপক ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বিএনপির রাজনীতিতে যোগ দেন। এরপর থেকে দলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৪ সাল থেকে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য পদে অধিষ্ঠিত রয়েছেন।
তিনি কুমিল্লা- ১ ও ২ আসন থেকে ৫ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৯১-৯৬ মেয়াদে বিএনপি সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী, ১৯৯৬ সালে স্বল্প মেয়াদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ২০০১-০৬ মেয়াদে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।
ড. মোশাররফ কুমিল্লার দাউদকান্দি হাইস্কুল থেকে ১৯৬২ সালে মেট্রিকুলেশন, চট্টগ্রাম সরকারী কলেজ থেকে ১৯৬৪ সালে আইএসসি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৮ সালে এমএসসি ডিগ্রী অর্জন করেন। তিনি ১৯৬৪-৬৫ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের এজিএস এবং ১৯৬৭-৬৮ শিক্ষাবর্ষে হাজী মুহাম্মদ মহসিন হলের ভিপি নির্বাচিত হন।
১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূ-তত্ত্ব বিভাগে জুনিয়র প্রভাষক পদে যোগ দেন এবং একই বছর কলম্বো-প্লান স্কলারশিপ নিয়ে উচ্চতর শিক্ষার (পিএইচ.ডি) জন্য লণ্ডন (বিলেত) গমন করেন। তিনি ১৯৭০ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইম্পেরিয়াল কলেজ থেকে এম.এসসি, ১৯৭৩ সালে ডিআইসি ডিপ্লোমা এবং ১৯৭৪ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন।
১৯৭৫ সালে বিলেত থেকে দেশে ফিরে পুনরায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসাবে যোগ দেন এবং পর্যায়ক্রমে অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। ১৯৮৭ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ভূ-তত্ত্ব বিভাগে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবার জন্য তিনি ঢাবির শিক্ষকতা থেকে পদত্যাগ করেন।
জাতীয়ভাবে মৎস্যখাতের উন্নয়নে ড. মোশাররফ ‘প্লাবন ভূমিতে মৎস্য চাষ পদ্ধতি’র উদ্ভাবন করেছেন। মৎস্য ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি জাতীয় পুরস্কার স্বর্ণপদক লাভ করেন।
২০০৩ সালে তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ৫৭তম সম্মেলনের সভাপতি নির্বাচিত হন। তার সভাপতিত্বে ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোবাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি) গৃহীত হয়। বাংলাদেশে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন এবং বিশ্বব্যাপী তামাক বিরোধী আন্দোলনে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ড. মোশাররফকে ‘ওয়ার্ল্ড নো টব্যাকো অ্যাওয়ার্ড ২০০৪’ পদকে ভূষিত করেন। ভূ-তত্ত্ব বিষয়ে স্ট্রাকচারাল এ্যানালাইসিসে তার মৌলিক উদ্ভাবন ‘হোসাইন্স মেথড অফ এক্সটেনশন’ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে।
ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের লেখা ‘মুক্তিযুদ্ধে বিলাত প্রবাসীদের অবদান’, ‘প্লাবন ভূমিতে মৎস্য চাষ: দাউদকান্দি মডেল’, ‘সংসদে কথা বলা যায়’, ‘এই সময়ের কিছু কথা’, ‘ফখরুদ্দিন- মইন উদ্দিনের কারাগারে ৬১৬ দিন’, ‘রাজনীতির হালচাল’, ‘সময়ের ভাবনা’, ‘জরুরী আইনের সরকারের দুই বছর (২০০৭ ও ২০০৮)’ ‘মূল্যবোধ অবক্ষয়ের খণ্ডচিত্র’, ‘প্রগতি ও সত্যের সন্ধানে’, ‘করোনাকালে বাংলাদেশ: সংক্রমণের দশ মাস’, ‘স্মৃতির অ্যালবাম’ এবং ‘আমার রাজনীতির রোজনামচা’ নামের ১৩টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি ২ পুত্র ও ১ কন্যা সন্তানের জনক। তার কনিষ্ঠ পুত্র ড. খন্দকার মারুফ হোসেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগের এডভোকেট।
জন্মদিনে এক প্রতিক্রিয়ায় ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, ‘দেশ রক্ষার জন্য আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারকে হটাতে দীর্ঘ ১৬ বছর আন্দোলন করেছি, মিথ্যা মামলায় ৫ বছর কারাবাস করেছি, নির্যাতিত হয়েছি। অবশেষে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। মাঝে আমি অসুস্থ ছিলাম, আল্লাহ আমাকে সুস্থ করেছেন। রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থার এই পরিবর্তন দেখার সুযোগ দেয়ার জন্য মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানাচ্ছি। আজকের এই দিনে কুমিল্লা-১ আসনের জনগণ, দেশ-বিদেশে অবস্থানরত বিএনপির নেতা-কর্মীসহ প্রিয় দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। আমি সকলের কাছে দোয়া চাই। যাতে আগামী দিনগুলোতে দেশ ও জনগণের কল্যাণে নিয়োজিত থাকতে পারি। মহান আল্লাহ আমাদের দেশ ও জাতির সহায় হোন,আমিন।’
