আবরারের আত্মদান জাতিকে আগ্রাসনবিরোধী প্রতিরোধে জাগিয়েছে: রিজভী
Advertisement
ঢাবি প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৩৭ পিএম
বিএনপির মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিএনপির মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, শহীদ আবরার ফাহাদের আত্মদান গোটা জাতিকে জাগিয়ে তুলেছিল। তার হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে আগ্রাসী ও সম্প্রসারণবাদী শক্তির বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিরোধের শক্তি আরও সংগঠিত হয়েছে। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বুধবার (৭ অক্টোবর) বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের অডিটোরিয়ামে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল আয়োজিত ‘বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রনীতি: আধিপত্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য এবং স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা সুরক্ষার অঙ্গীকার’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে রিজভী এসব কথা বলেন।
দেশে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার পর আন্দোলন-সংগ্রাম নিয়ে হতাশা তৈরি হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদের করাল গ্রাসের মধ্যে একটি দেশ পড়ে যাওয়ার পর সেখান থেকে নিষ্কৃতি পাব কি না এই ধরনের আকাঙ্ক্ষা বা স্বপ্ন আর আমরা দেখতে পারছিলাম না। যখন দিনের পর দিন প্রত্যেকটি আন্দোলন ব্যর্থ হচ্ছে, আন্দোলনের কোনো ফল পাওয়া যাচ্ছে না, তখন অনেক সময় এটা মনে হয়েছে আমরা একটার পর একটা আন্দোলন করছি, কিন্তু ফল পাচ্ছি না।’
রিজভী বলেন, ‘তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বলছেন, আমি পার্শ্ববর্তী দেশে যা দিয়েছি, সেটা মনে রাখবে।’ কিন্তু কী দিয়েছে, যে তারা মনে রাখবে? এই কথার মধ্যে যে দেশ বিক্রি করা, সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করা এবং স্বাধীনতা বিক্রি করার যে মন্ত্র সেই কথার মধ্যে রয়েছে, সেই কথার অন্তর্নিহিত সুর হচ্ছে, আমার ভূখণ্ড, আমার পায়ের নিচে যে মাটি, সেটি আর নেই।’
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলেও ফ্যাসিবাদ ও নাৎসিবাদের সময়ে সেগুলোও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলে যায় বলে মন্তব্য করেন রিজভী। তিনি বলেন, ‘যখন ফ্যাসিজম, যখন নাৎসিবাদ চেপে বসে, তখন তারা সব জায়গাগুলোকে আত্মস্থ করে। সব জায়গার ওপর তাদের কামড় দেয়। সব জায়গা তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখে। কোথাও থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যায় না। যেটা আমরা জার্মানিতে দেখেছি, যেটা আমরা ইতালিতে দেখেছি।’
আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে রিজভী বলেন, ‘যখন আমরা আবরারের এই কাহিনি শুনলাম, এই মর্মান্তিক হৃদয়বিদারক ঘটনা যখন ঘটাল তখন এটা কিন্তু মানুষের মধ্যে তরঙ্গ তৈরি করেছে।’
লিও টলস্টয়ের একটি বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘তুমি যখন অন্য মানুষের ব্যথা-বেদনাটা অনুভব কর, তখন তুমি মানব প্রজাতি, তখন তোমার মধ্যে মানবীয় অস্তিত্ব আছে। তেমনি আবরারের এই নিষ্ঠুর হত্যার কাহিনি—এটি গোটা জাতি যে অনুভব করেছে, সেই অনুভবটাই হচ্ছে লিও টলস্টয়ের কথা।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের যে হতাশা এসেছে কিছুই হচ্ছে না, এত বড় অন্যায়, এত অত্যাচার, এত গুম, এত খুন, এত বিচারহীন হত্যা, তারপরও কারও দিকে আঙুল উঠছে না। কিন্তু আবরারের এই দেশপ্রেমিক পোস্টের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে যে নিষ্ঠুরতার মধ্যে দিয়ে হত্যা করা হয়েছে, গোটা জাতি যেভাবে কেঁদে উঠেছে, গোটা জাতি যেভাবে জাগ্রত হয়েছে, গোটা জাতি যেভাবে উদ্দীপ্ত হয়েছে প্রতিরোধের জন্য এটি একটি বিরল দৃষ্টান্ত।’
আবরারের আত্মদান শেখ হাসিনার সরকারের পতনের আন্দোলনেও প্রভাব ফেলেছে দাবি করে রিজভী বলেন, ‘এই জাতির অন্তরের মধ্যে, এর রক্তের তলদেশে লৌহকঠিনভাবে প্রোথিত হচ্ছে যে মৃত্যু-স্রোত, সে স্রোত শেখ হাসিনা আটকাতে পারেননি। এবং আটকাতে পারেননি বলেই আবরারের এই মৃত্যু, তার এই শহীদ আত্মদান, সেখানে একটি চূড়ান্ত করণ হচ্ছে ৫ আগস্টে শেখ হাসিনার দেশ থেকে পড়ায়।’
ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের আন্দোলন-সংগ্রামের প্রসঙ্গ তুলে রিজভী বলেন, ‘ছাত্রদলকে মেরে বারবার আঘাত করেছে। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছে, ক্যাম্পাসে মিছিল করার চেষ্টা করেছে, আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। আহত অবস্থায় তাদের কখনো ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে, কখনো ঢাকা মেডিকেল কলেজে আমরা ছুটে গেছি।’
তিনি বলেন, ‘এই আঘাতে তারা যেভাবে তাদের অস্তিত্ব, তাদের স্বতন্ত্র স্বাধীন সত্তা বিসর্জন দেয়নি, বলেই তাদেরকে কেউ গুপ্ত বলে না, তাদেরকে কেউ সুপ্ত বলে না। কারণ বেগম খালেদা জিয়ার যে আপসহীন ধারা সেই ধারা হচ্ছে, তুমি কোনো আত্মপ্রতারণার আশ্রয় নেবে না। তুমি যা, তাই নিয়ে তুমি লড়াই কর। তুমি তাই নিয়েই তোমার রাজনীতি কর।’
তিনি আরো বলেন, ‘আজকে জনগণের যখন রায় দেওয়ার বিষয় এসেছে, অবাধ ও সুষ্ঠু পরিবেশ, একটি মুক্ত পরিবেশ যখন হয়েছে, জনগণ কিন্তু ঠিকই রায় দিয়েছে জাতীয়তাবাদী শক্তির পক্ষে।’
রিজভীর বলেন, ‘আবরারকে যখন আক্রমণ করা হয়েছে, তাকে যখন হত্যা করা হচ্ছে, তখন এটা বুঝতে হবে এটা ভয়ঙ্কর রকম জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তের মধ্য দিয়ে ভয় পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা, যে এরকম একটা কথা লিখলেই তার জীবন অবসান ঘটবে এবং আর কেউ সাহস করবে না। কিন্তু তারা এই ভুল বার্তা পেয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বরং তার মৃত্যু এবং তাকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে গোটা জাতিকে আরও বেশি সংগঠিত করেছে। আর আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে, সম্প্রসারণবাদী শক্তির বিরুদ্ধে মানুষের যে প্রতিরোধের শক্তি, সেই শক্তির স্ফুলিঙ্গ।’
আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাবি কোষাধ্যক্ষ ড. এম জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, আবরার ফাহাদের পিতা মো. বরকত উল্লাহ। কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব সভাপতিত্বে আলোচনা সভা সঞ্চালনা করেন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির।

