জামায়াতের সঙ্গে ঐক্য নিয়ে দ্বন্দ্ব, একে একে এনসিপি ছাড়লেন ৩ জনপ্রিয় নেত্রী
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১০:১১ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নির্বাচনি ঐক্য নিয়ে শুরু থেকেই দলটির ভেতরে মতবিরোধ তৈরি হয়। এর জেরে একে একে দল ছেড়েছেন এনসিপির বহু কেন্দ্রীয় নেতা। এই তালিকায় আছেন দলটির ৩ জনপ্রিয় নেত্রী—ডা. তাসনিম জারা, তাজনূভা জাবীন ও সামান্তা শারমিন। জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠন, দলের আদর্শিক অবস্থান এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি তুলে পদত্যাগ করেন তারা।
এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর দল থেকে পদত্যাগ করেন। সেদিন নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে তিনি কোনো নির্দিষ্ট দল বা জোটের প্রার্থী না হয়ে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেন। ঢাকা-৯ আসনে খিলগাঁও, সবুজবাগ ও মুগদাবাসীর উদ্দেশে তিনি লেখেন, ‘আমার স্বপ্ন ছিল একটি রাজনৈতিক দলের প্ল্যাটফর্ম থেকে সংসদে গিয়ে আমার এলাকার মানুষের ও দেশের সেবা করা। তবে বাস্তবিক প্রেক্ষাপটের কারণে আমি কোনো নির্দিষ্ট দল বা জোটের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেন তাসনিম জারা। তিনি লেখেন, ‘একটা দলের প্রার্থী হলে সেই দলের স্থানীয় অফিস থাকে, সুসংগঠিত কর্মী বাহিনী থাকে। সরকার ও প্রশাসনের সঙ্গে নিরাপত্তা বা অন্যান্য বিষয়ে আপত্তি ও শঙ্কা নিয়ে কথা বলার সুযোগ থাকে। তবে আমি যেহেতু কোনো দলের সঙ্গে থাকছি না, তাই আমার সে সব কিছুই থাকবে না।’
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আসন সমঝোতা নিয়ে এনসিপির আলোচনা শুরুর পর দলের ভেতরে ভিন্নমত তৈরি হয়। তাসনিম জারার পদত্যাগের দিনই জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনে আপত্তি জানিয়ে নাহিদ ইসলামকে চিঠি দেন এনসিপির ৩০ নেতা।
চিঠিতে তারা বলেন, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে রাজনৈতিক জোট বা আসন সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়ে সামনে আসা আলোচনা দলের ঘোষিত আদর্শ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা এবং গণতান্ত্রিক নৈতিকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
নেতাদের অভিযোগ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের বিভাজনমূলক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, অন্য দলের ভেতরে গুপ্তচরবৃত্তি ও নাশকতার চেষ্টা, এনসিপির ওপর বিভিন্ন অপকর্মের দায় চাপানো এবং দলটির নারী সদস্যদের চরিত্রহননের চেষ্টা উদ্বেগজনক। এ ছাড়া ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা ও সে সময় সংঘটিত অপরাধের বিষয়ে দলটির অবস্থান এনসিপির মূল্যবোধের সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
চিঠিতে আরও বলা হয়, জামায়াতের সঙ্গে জোট হলে এনসিপির রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। নতুন, নীতিনিষ্ঠ ও ভবিষ্যতমুখী রাজনীতির প্রত্যাশায় যারা দলটির পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও হতাশা তৈরি হবে। নেতারা নাহিদ ইসলামকে জামায়াতের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক জোটে না যাওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার অনুরোধ জানান।
তবে এসব আপত্তির পরও এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্ব জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠন করে।
তাজনূভা জাবীনের পদত্যাগ
তাসনিম জারার পদত্যাগের একদিন পর, ২৮ ডিসেম্বর এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক পদ থেকে পদত্যাগ করেন তাজনূভা জাবীন। ফেসবুক পোস্টে তিনি জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি জানান।
তাজনূভা লেখেন, ‘আপনারা অনেকে ভাবছেন, হয়তো জামায়াতের সঙ্গে জোটে ঐতিহাসিক কারণ বা নারী বিষয়ের কারণে আমার আপত্তি। এর চেয়েও ভয়ঙ্কর যে কারণ, সেটা হল যে প্রক্রিয়ায় এটা হয়েছে। এটাকে রাজনৈতিক কৌশল, নির্বাচনি জোট ইত্যাদি লেভেল দেয়া হচ্ছে। আমি বলব এটা পরিকল্পিত। এটাকে সাজিয়ে এ পর্যন্ত আনা হয়েছে।’
দলের শীর্ষ নেতৃত্ব প্রার্থী মনোনয়ন ও আসন সমঝোতার মাধ্যমে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ সীমিত করেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তবে পদত্যাগ করলেও তখনই স্বতন্ত্র নির্বাচনে অংশ নেবেন না বলে জানান।
তাজনূভা বলেন, এনসিপির প্রতিষ্ঠাকালীন লক্ষ্য—গণপরিষদ, সেকেন্ড রিপাবলিক, মধ্যপন্থা, নারী ও বিভিন্ন জাতিসত্তাকে নিয়ে রাজনীতি—ধারণ করা নেতাদের মধ্যে তিনি একজন। দলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হয়েও পদত্যাগ ছাড়া সামনে আর কোনো ‘সম্মানজনক অপশন’ ছিল না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জামায়াতের সঙ্গে জোটের বিষয়ে তাজনূভা বলেন, এনসিপি নিজস্ব স্বকীয়তা নিয়ে দাঁড়ালে পাঁচ বছর পর যেকোনো দলের সঙ্গে রাজনৈতিক জোটে যেতে সমস্যা ছিল না। কিন্তু প্রথম নির্বাচনেই কেন জোট করতে হবে, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার অভিযোগ, অন্য বিকল্পগুলো ধীরে ধীরে বাদ দেওয়া হয়েছে, যাতে জামায়াতের সঙ্গে জোট ছাড়া আর কোনো পথ না থাকে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমার পদত্যাগের কারণ যতটা না জোট, তারচেয়ে বেশি যে প্রক্রিয়ায় জোট হয়েছে। অবিশ্বাস, অনাস্থা মূল কারণ।’
এনসিপির শীর্ষ নেতাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের সমালোচনা করে তাজনূভা বলেন, তারা নিজেদের মধ্যে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে এতটাই ব্যস্ত যে দেশের জন্য নতুন মধ্যপন্থি বাংলাদেশপন্থি রাজনীতি গড়ে তুলতে পারবেন না।
সামান্তা শারমিনের পদত্যাগ
সবশেষ বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) এনসিপির প্রথম সারির নেত্রী সামান্তা শারমিন দল থেকে পদত্যাগ করেন। নিজের ফেসবুক টাইমলাইনে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, প্রায় এক বছর ধরে জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনের প্রশ্নে দলের ভেতরে নিজের ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেছেন।
সামান্তা লেখেন, ‘কিছুক্ষণ আগে জাতীয় নাগরিক পার্টি থেকে আমি পদত্যাগ করেছি। প্রায় এক বছর আগে আমি জাতীয় নাগরিক পার্টির জোট গঠনের প্রশ্নে একটা আলাদা অবস্থান নিয়েছিলাম। আমি বলেছিলাম, জামায়াত ইসলামী নীতিগত বা কৌশলগত কোনো ক্ষেত্রেই মিত্র হওয়ার যোগ্য না এবং তাদের সঙ্গে জোট করার জন্য এনসিপিকে কঠিন মূল্য চুকাতে হবে।’
নিজের পোস্টে ‘সংস্কারের বন্ধু জামায়াত হতে পারে কিনা’ শিরোনামে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন সামান্তা। তিনি বলেন, এনসিপির রাজনীতির মূল লক্ষ্য ছিল সংস্কার। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পথে বিদ্যমান ক্ষমতা কাঠামো যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সে জন্য সাংবিধানিক সংস্কার, আইনের সংস্কার এবং রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের সংস্কার প্রয়োজন ছিল।
সামান্তার দাবি, জামায়াতে ইসলামী এই তিনটির কোনোটিকেই নিজেদের রাজনীতি ও রাষ্ট্রপ্রকল্পের অংশ মনে করে না। তার মতে, জামায়াত প্রকৃত অর্থে সংস্কারের রাজনীতি ধারণ করে না; সংগঠনটির দার্শনিক ভিত্তি ও প্রস্তাবিত রাষ্ট্রপ্রকল্প গণতান্ত্রিক নয়।
তিনি আরও লেখেন, গণতান্ত্রিক সংস্কারের মূল ভিত্তি উদার গণতান্ত্রিক সামাজিক মূল্যবোধ। অন্যদিকে জামায়াত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিপন্থী এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সুবিধা কাজে লাগিয়ে ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করাই সংগঠনটির রাজনৈতিক অভিপ্রায় বলে মনে করেন তিনি।
সামান্তার ভাষ্য, জামায়াতকে সংস্কারের পথে বন্ধু মনে করার কারণে বাংলাদেশের উদার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী সাধারণ মানুষ এনসিপির সংস্কারের রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। দলের নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট না থাকায় এনসিপি জামায়াতের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে এবং বিভিন্ন ইস্যুতে জামায়াতের পক্ষে প্রতিক্রিয়ামূলক ও সহায়ক ভূমিকা নিতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, জনগণের আকাঙ্ক্ষা থেকে জন্ম নেওয়া দল হিসেবে এনসিপিকে এসব সমস্যা সম্পর্কে বারবার সতর্ক করে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন।
জামায়াতের সঙ্গে জোট নিয়ে মতবিরোধ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠন নিয়ে এনসিপির নেতাদের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়। স্বাধীনতাযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা এবং পরবর্তী সময়ে ক্ষমা না চাওয়ার বিষয়টি সামনে রেখে দলের অনেক নেতা দলটির সঙ্গে জোটের বিরোধিতা করেন।
তবে শেষ পর্যন্ত নাহিদ-আখতার-হাসনাতরা জামায়াতের সঙ্গে জোট করে নির্বাচনে অংশ নেন। নির্বাচনে দলটি ছয়টি আসনে জয়ী হয়।
পদত্যাগী নেত্রীদের বক্তব্য ও অভিযোগের মূল বিষয় ছিল, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল, এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে ঐক্য করে সেখান থেকে সরে গেছে। তাদের আশঙ্কা, এ ঐক্যের ফলে এনসিপি নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় হারিয়ে জামায়াতের রাজনীতির দিকে ঝুঁকতে পারে এবং ভবিষ্যতে জামায়াতের মধ্যে বিলীন হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এনসিপিতে ফিরে আসবেন কিনা—এমন প্রশ্নে তাজনূভা জাবীন যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি তো একটা প্লাটফর্মে আছিই। অলটারনেটিভস। শিগগিরই বড় আকারে আমরা সাংগঠনিক শক্তি প্রকাশ করবো। অলটারনেটিভকে আমরা নিজ পায়ে দাঁড় করাতে চাই। এনসিপিতে ফিরে আসতে চাই না।’
