গল্প
ধলা
Advertisement
জুয়েল আশরাফ
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ভোর হলে গ্রামের মেঠোপথে প্রথমে দুধওয়ালার সাইকেলের ঘণ্টা শোনা যায়। তারপর মুরগি ডাকে, গরুর গলায় বাঁধা ঘণ্টা বাজে, উঠানে ঝাঁট দেওয়ার শব্দ ওঠে। সূর্য ওঠার আগেই গ্রামটা যেন নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। শুধু মজনু মিয়ার গরুটার কোনো তাড়া নেই। গরুটার নাম ধলা। বয়স বেশি নয়, কিন্তু সে সারা দিন এমন ভাব করে দাঁড়িয়ে থাকে, যেন পৃথিবীর সব কাজকর্ম তার চোখের সামনে ঘটছে এবং কোনোটাই তার বিশেষ পছন্দ হচ্ছে না। ধলার একটা অদ্ভুত অভ্যাস আছে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় সে সাতবার ঘণ্টা বাজাবে। একবার। দুবার। তিনবার। এভাবে সাতবার। তারপর আর কোনো শব্দ করবে না। মজনু মিয়া ব্যাপারটা জানেন। তাই সাতবার ঘণ্টা বাজলেই তিনি ধলাকে গোয়ালে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দেন। রিদু ব্যাপারটা মানতে পারল না। সে একদিন বাবাকে জিজ্ঞেস করল, ধলা সাতবার ঘণ্টা বাজায় কেন? বাবা বললেন, ওর অভ্যাস। সব গরুর তো এমন অভ্যাস নেই। সব গরু ধলা না। এই উত্তর শুনে রিদুর সন্দেহ আরও বাড়ল। এক সন্ধ্যায় সে লুকিয়ে ধলার পেছনে পেছনে মাঠের দিকে গেল। সেদিন ধলা ছয়বার ঘণ্টা বাজিয়ে থেমে গেল। রিদু অপেক্ষা করল। কিছুই হলো না। ধলা মাথা তুলে গ্রামের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর দূর থেকে একটা বাচ্চার কান্না শোনা গেল। ধলা সপ্তমবার ঘণ্টা বাজাল। সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের উত্তর দিকের একটা বাড়ির দরজা খুলে গেল। একজন মা ছুটে বেরিয়ে এলেন। ওরে, তুই এখানে! তার ছোট ছেলে উঠানের বাইরে চলে গিয়েছিল। মা তাকে ধরে ঘরে নিয়ে গেলেন। রিদু অবাক হয়ে ধলার দিকে তাকাল। ধলা ঘাস খেতে শুরু করেছে। যেন কিছুই হয়নি। পরদিন রিদু আবার গেল। এবার পাঁচবার ঘণ্টা বাজল। ষষ্ঠবারের আগে ধলা হঠাৎ থেমে গেল। দূরের রাস্তা দিয়ে এক বৃদ্ধ মানুষ হেঁটে আসছিলেন। হাতে লাঠি। অন্ধকারে তিনি পথ হারিয়ে ফেলেছেন। ধলা ছয়বার ঘণ্টা বাজাল। বৃদ্ধ থামলেন। তারপর ঘণ্টার শব্দ অনুসরণ করে ঠিক গ্রামের মাঝখানে চলে এলেন। রিদু বুঝল, ধলা আসলে ঘণ্টা বাজায় না। সে কাউকে ডাকে। কিন্তু কাকে? তৃতীয় দিন রিদু ধলার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, আজ আমাকে ডাকবে? ধলা তার দিকে তাকাল। একবার ঘণ্টা বাজাল। রিদু হেসে ফেলল। একবার কেন? ধলা আর কিছু করল না। সেদিন রাতে রিদুর দাদি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সবাই দৌড়াদৌড়ি করছে। ওষুধ নেই। বাজার বন্ধ। রিদুর বাবা বেরোতে যাচ্ছেন, এমন সময় বাইরে...টুন। একবার ঘণ্টা। রিদু ছুটে গোয়ালের কাছে গেল। ধলা দরজার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দরজার বাইরে গ্রামের সেই বৃদ্ধ মানুষটি দাঁড়িয়ে। তার হাতে একটা ছোট ব্যাগ। তোমাদের বাড়িতে ডাক্তার লাগবে শুনলাম, বলেই এলাম। আমার ছেলে পাশের গ্রামে ডাক্তার। রিদু কিছু বলতে পারল না। সেই রাতেই দাদি ভালো হয়ে গেলেন। পরদিন সকালে রিদু ধলার কাছে গিয়ে বলল, তুমি কি জানো কে কখন বিপদে পড়ে? ধলা জাবর কাটতে কাটতে তার দিকে তাকাল। কোনো উত্তর নেই। শুধু ঘণ্টাটা খুব আস্তে দুলল। টুন। বহু বছর পর ধলা আর নেই। মজনু মিয়া গোয়ালঘরের পুরোনো খুঁটিতে তার ঘণ্টাটা ঝুলিয়ে রেখেছেন। অদ্ভুত ব্যাপার, মাঝে মধ্যে গভীর রাতে সেই ঘণ্টা একবার বাজে। কেউ তখন ধলার কথা মনে করে না। শুধু রিদু ঘুমের মধ্যে চোখ খুলে ফেলে। আর ভাবে, আজ রাতে গ্রামের কোথাও কি কেউ কাউকে ডাকছে! হ
