ইতিহাস গড়া আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে মেসির ‘ফুলস্টপ’
Advertisement
স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০২:১৫ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দুই দশকেরও বেশি সময়। বিশ্ব ফুটবলকে সম্মোহিত করে রেখেছিলেন। অবশেষে আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা জার্সিটা চিরতরে তুলে রাখলেন ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা কিংবদন্তি লিওনেল মেসি।
আজ বুয়েনস আয়ার্সের আইকনিক ‘এস্তাদিও মনুমেন্তাল’ স্টেডিয়ামে ৮৫ হাজারেরও বেশি দর্শকের অশ্রুসজল চোখে বিদায় নিলেন তিনি।
বেনিনের বিপক্ষে এই আবেগঘন প্রীতি ম্যাচে আর্জেন্টিনা ৩-০ ব্যবধানে জয়ী করে। নিজের ২০৮তম এবং শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচেও নিজের জাত চেনাতে ভোলেননি ৩৯ বছর বয়সি এই ফুটবল জাদুকর। খেলার ৭১ মিনিটে পেনাল্টি থেকে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ১২৬তম গোলটি করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন বাকি দুটি গোল।
এর মাধ্যমে আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষ ম্যাচটাও স্মরণীয় করে রাখলেন জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বকাপজয়ী এই অধিনায়ক।
শৈশবের কঠিন পথ ও ক্লাব অধ্যায়
১৯৮৭ সালের ২৪ জুন আর্জেন্টিনার রোজারিওতে জন্ম নেন লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। ছোটবেলায় গ্রোথ হরমোনজনিত জটিল ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ায় তার স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছিল।
ওষুধের বিপুল খরচ বহন করা যখন তার পরিবারের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন মাত্র ১৩ বছর বয়সে পাশে দাঁড়ায় স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনা। চিকিৎসা খরচের দায়িত্ব নিয়ে তারা মেসিকে নিয়ে যায় তাদের বিখ্যাত একাডেমি ‘লা মাসিয়া’তে।
পরে বার্সেলোনার সিনিয়র দলে ১৭টি মৌসুমে তাদের এনে দেন সাফল্যের অমলিন জোয়ার।
ক্লাবটির হয়ে ১০টি লা লিগা ও ৪টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগসহ দুই ডজনেরও বেশি মেজর ট্রফি জেতেন তিনি। পাশাপাশি, ২০১২ সালে এক পঞ্জিকাবর্ষে সর্বোচ্চ ৯১টি গোল করার অবিস্মরণীয় রেকর্ড গড়েন।
এরপর প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি) ঘুরে ২০২৩ সালে তিনি যোগ দেন মার্কিন ক্লাব ইন্টার মায়ামিতে, যেখানে প্রথম বছরই দলকে লিগস কাপ এবং পরবর্তীতে এফসি কাপের ট্রফি এনে দেন।
জাতীয় দলে ব্যর্থতার গ্লানি ও বিশ্বজয়ের অমর কাব্য
ক্লাব ফুটবলে আকাশচুম্বী সাফল্য পেলেও জাতীয় দলের হয়ে দীর্ঘদিন ট্রফি না জেতায় চরম সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল মেসিকে। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনাল এবং টানা দুটি কোপা আমেরিকার ফাইনালে হেরে গিয়ে ২০১৬ সালে ক্ষোভে-দুঃখে নিয়েছিলেন অবসরও।
তবে দেশে ফিরে আবারও জাতীয় দলে প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন, নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন এক অপরাজিত স্বপ্নের দল।
২০০৫ সালে হাঙ্গেরির বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জার্সিতে অভিষেক করা লিওনেল মেসি দেশের হয়ে প্রথম সাফল্যের ছোঁয়া পান ২০২১ সালে। সে বছর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলকে হারিয়ে ২৮ বছর পর আর্জেন্টিনাকে কোপা আমেরিকার শিরোপা এনে দেন। এর ঠিক পরের বছর, ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে হারিয়ে ৩৬ বছর পর আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফি উপহার দেন তিনি।
দুই বছর পর যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে কলম্বিয়াকে ১-০ গোলে হারিয়ে আর্জেন্টিনা টানা দ্বিতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয় এবং মেসি তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় কোপা আমেরিকা ট্রফি উঁচিয়ে ধরেন।
২০২৬ বিশ্বকাপে ফাইনালে উঠলেও শেষ পর্যন্ত স্পেনের কাছে লজ্জার হারে রানার্সআপ হতে হয় আর্জেন্টিনাকে। তবে নিজের ষষ্ঠ আসরে অংশ নিয়ে প্রথম ফুটবলার হিসেবে মেসি ঠিকই রেকর্ড গড়েন।
বিশ্বকাপের ছয় টুর্নামেন্টে মোট ২১টি গোল করে বিশ্বকাপের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনটি নিজের করে নেন এই ক্ষুদে জাদুকর।
বিদায়বেলার অশ্রু ও মহাকাব্যিক সমাপনী
জাতীয় দল থেকে অবসরের সিদ্ধান্তটা আগেই জানিয়েছিলেন। আজ বুধবার (০৭ অক্টোবর) সারা বিশ্বের কোটি সমর্থকের সামনে বিদায়ী ম্যাচে আফ্রিকান দেশ বেনিনের বিপক্ষে মাঠে নেমেই আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের বিদায়টা রাঙালেন লিওনেল আন্দ্রেস মেসি।
বেনিনের বিপক্ষে ‘দ্য লাস্ট ট্যাঙ্গো’ খ্যাত শেষ ম্যাচটি শেষ হতেই স্টেডিয়ামের আকাশ ড্রোন শো-এর আলোয় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, যেখানে ভেসে ওঠে ২০২২ বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরা মেসির ঐতিহাসিক মুহূর্তটি।
বিদায়ী বক্তব্যে আবেগাপ্লুত মেসি বলেন, ‘আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নামাটা যেকোনো মানুষের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতি। আমার ইচ্ছা করে এই অনুভূতিটা সারাজীবন ধরে রাখি, কিন্তু বিদায় নেওয়ার সঠিক সময় এটাই। আমি সবসময় এই জার্সির জন্য আমার সবটুকু উজাড় করে দিয়েছি।’
প্রসঙ্গত, জাতীয় দলকে বিদায় জানালেও মাঠের ফুটবলকে এখনই বিদায় বলছেন না রেকর্ড ৮ বার ব্যালন ডিঅর ও ৬ বার ইউরোপীয় গোল্ডেন শু জয়ী এই তারকা। তিনি আমেরিকান ক্লাব ইন্টার মায়ামির হয়ে তার পেশাদার ক্লাব ফুটবল ক্যারিয়ার চালিয়ে যাবেন।

