ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল কীভাবে জানা যায়?
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:১৫ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ভূমিকম্প হলে প্রথমেই যে প্রশ্নটি সামনে আসে, সেটি হলো- কম্পনটি ঠিক কোথা থেকে শুরু হয়েছিল? ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল বা এপিসেন্টার নির্ণয় করতে বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেন বিভিন্ন ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য। বর্তমানে উন্নত কম্পিউটার প্রযুক্তির সাহায্যে কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ভূমিকম্পের অবস্থান, গভীরতা ও মাত্রা নির্ণয় করা সম্ভব। তবে এর মূল পদ্ধতিটি বুঝতে খুব জটিল প্রযুক্তির প্রয়োজন নেই; মানচিত্র, স্কেল, পেন্সিল ও কম্পাস ব্যবহার করেও এর ধারণা পাওয়া যায়।
মিশিগান টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ভূমিকম্পের সময় পৃথিবীর অভ্যন্তর থেকে বিভিন্ন ধরনের ভূকম্পন তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে পি-ওয়েভ বা প্রাথমিক তরঙ্গ সবচেয়ে আগে বিভিন্ন ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে পৌঁছায়। এরপর পৌঁছায় এস-ওয়েভ বা দ্বিতীয়িক তরঙ্গ। দুটি তরঙ্গের গতির পার্থক্যের কারণে একটি স্টেশনে তাদের পৌঁছানোর সময়েও পার্থক্য তৈরি হয়। এই সময়ের ব্যবধানই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল থেকে ওই স্টেশনের দূরত্ব নির্ণয়ের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।
পি ও এস-ওয়েভই দেয় প্রথম সূত্র
ইউএস জিওলোজিক্যাল সার্ভে প্রকাশিত ‘দি সাইন্স অব আর্থকোয়েক’ নিবন্ধে বলা হয়েছে, মিশিগান টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, কোনো ভূমিকম্পের সিসমোগ্রাম বা ভূকম্পন রেকর্ড বিশ্লেষণের সময় প্রথমে দেখা হয়, পি-ওয়েভ কখন পৌঁছেছে এবং এস-ওয়েভ কখন এসেছে। দুটি তরঙ্গের আগমনের সময়ের ব্যবধান যত বেশি হবে, সাধারণত স্টেশনটি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল থেকে তত দূরে থাকবে।
ধরা যাক, একটি সিসমোগ্রামে পি-ওয়েভ ও এস-ওয়েভের মধ্যে ২৪ সেকেন্ডের ব্যবধান পাওয়া গেল। নির্দিষ্ট ভূকম্পন তরঙ্গের সময়-দূরত্বের চার্ট ব্যবহার করে এই ২৪ সেকেন্ডের ব্যবধান থেকে হিসাব করা যায়, পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রটি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল থেকে প্রায় ২১৫ কিলোমিটার দূরে।
অর্থাৎ, ওই ভূমিকম্পটি ঠিক কোথায় ঘটেছে, তা তখনো জানা না গেলেও অন্তত এটুকু নিশ্চিত হওয়া যায় যে, স্টেশনটি সম্ভাব্য উৎপত্তিস্থল থেকে ২১৫ কিলোমিটার দূরের একটি বৃত্তের কোথাও অবস্থান করছে।
প্রয়োজন একাধিক স্টেশন
একটি ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য দিয়ে ভূমিকম্পের সঠিক উৎপত্তিস্থল নির্ণয় করা সম্ভব নয়। কারণ একটি স্টেশন শুধু জানাতে পারে, ভূমিকম্পটি তার কাছ থেকে কত দূরে ঘটেছে।
এ জন্য প্রয়োজন হয় অন্য ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য। প্রতিটি স্টেশন থেকে পাওয়া দূরত্বকে ব্যাসার্ধ ধরে মানচিত্রে আলাদা বৃত্ত আঁকা হয়। তিনটি ভিন্ন স্টেশনের তথ্য পাওয়া গেলে তিনটি বৃত্ত আঁকা সম্ভব। বৃত্তগুলো যে নির্দিষ্ট এলাকায় পরস্পরকে ছেদ করে, সেখানেই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল বা এপিসেন্টার হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
বর্তমানে অবশ্য বিজ্ঞানীরা শুধু হাতে আঁকা বৃত্তের ওপর নির্ভর করেন না। বিশ্বের বিভিন্ন ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে পাওয়া তথ্য কম্পিউটার বিশ্লেষণ করে ভূমিকম্পের অবস্থান, গভীরতা ও মাত্রা দ্রুত নির্ণয় করা হয়। তবে মূল ধারণাটি একই- বিভিন্ন স্টেশনে পি ও এস-ওয়েভ পৌঁছানোর সময়ের পার্থক্য থেকে পাওয়া দূরত্ব একত্র করে ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল শনাক্ত করা।
কেন হয় ভূমিকম্প
ভূমিকম্প পৃথিবীর অন্যতম প্রাকৃতিক দুর্যোগ। হঠাৎ মাটির নিচে শক্তির বিশাল পরিবর্তন ঘটলে সৃষ্টি হয় ভূকম্পন তরঙ্গ, যা পৃথিবীর ভেতর ও চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক সেকেন্ডের এই কম্পন কখনো সামান্য অনুভূত হলেও শক্তিশালী ভূমিকম্প মুহূর্তেই ভবন, সড়ক ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস করতে পারে।
পৃথিবীর ভূত্বকের নিচে বিভিন্ন শিলাস্তর ও টেকটোনিক প্লেট রয়েছে। এসব প্লেট দীর্ঘ সময় ধরে একে অপরের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ভূত্বকের কোনো ফাটল বা ফল্টের দুই পাশের শিলা এই চাপের কারণে ধীরে ধীরে বিকৃত হতে থাকে। একপর্যায়ে জমে থাকা চাপ সহ্যসীমা ছাড়িয়ে গেলে শিলা হঠাৎ ভেঙে যায় এবং ফল্ট বরাবর দ্রুত সরে যায়। তখন জমে থাকা শক্তি ভূকম্পন তরঙ্গ হিসেবে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলেই সৃষ্টি হয় ভূমিকম্প।
