ক্যাসিনোকাণ্ডের এনু ও রুপন গ্রেফতার
জাল পাসপোর্টে দেশত্যাগের চেষ্টা করে দুই ভাই * ক্যাসিনোর টাকায় ২২টি জমি ও বাড়ি, ৫টি ব্যক্তিগত গাড়ি * ৯১টি অ্যাকাউন্টে জমা আছে ১৯ কোটি টাকা * ৪০ লাখ টাকা ও ১২টি মোবাইল উদ্ধার
Advertisement
যুগান্তর রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২০২০, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
এনু ও রুপন। ছবি: যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ক্যাসিনোকাণ্ডের হোতা গেণ্ডারিয়ার আওয়ামী লীগ নেতা এনামুল হক এনু ও রুপন ভূঁইয়াকে গ্রেফতার করেছে সিআইডি। সোমবার কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যায় একটি ১০ তলা বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়। পুরান ঢাকার এ দু’ভাই জাল পাসপোর্টে দেশ ছাড়ার চেষ্টা করছিলেন।
শেখ মোস্তফা নামে তাদের এক সহযোগীকেও একই সঙ্গে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ। এ সময় তাদের কাছ থেকে নগদ ৪০ লাখ টাকা ও ১২টি মোবাইল ফোনও উদ্ধার করা হয়। গ্রেফতারের সময় তারা ওই বাসার টয়লেটের ওপরে ফাঁকা অংশে লুকিয়েছিলেন। এনু ও রুপন জুয়ার টাকায় ধনসম্পদের মালিক হন।
টাকা দিয়ে তারা ক্ষমতাসীন দলের পদ-পদবিও কিনে নেন। রাজনীতিতে সক্রিয় না থাকলেও এনু গেণ্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এবং তার ভাই রুপন ভূঁইয়া একই ইউনিটের সহসাধারণ সম্পাদক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, এনু ও রুপন মতিঝিলে ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে ক্যাসিনোকাণ্ডের অন্যতম হোতা। স্থানীয়ভাবেও তারা জুয়াড়ি পরিবারের সদস্য হিসেবে চিহ্নিত।
সোমবার দুপুরে রাজধানীর মালিবাগে এক সংবাদ সম্মেলনে সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগের ডিআইজি ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, গত সেপ্টেম্বরে এ অভিযান শুরু হয়। এতে ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেফতার ও অর্থ জব্দের পর তাদের বিরুদ্ধে অর্থপাচার আইনে নয়টি মামলা হয়। ওই মামলাগুলো তদন্তের ভার পায় সিআইডি।
নয়টির মধ্যে চারটি মামলার এজাহারেই গেণ্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এনামুল হক এনু ও সহসাধারণ সম্পাদক রুপন ভূঁইয়ার নাম আছে। মামলা তদন্তের ধারাবাহিকতায় আমরা তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা করি। শেখ মোস্তফার সহযোগিতায় কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যায় দশতলা বাড়িতে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া করে সেখানে অবস্থান করছেন এনু ও রুপন। সোমবার সকালে ওই বাড়িতে অভিযান চালিয়ে সহযোগী মোস্তফাসহ ওই দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়।
ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, সিআইডির তদন্তে ও তাদের জিজ্ঞাসাবাদে দুই ভাইয়ের সম্পত্তির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। দুই ভাইয়ের মোট ২২টি জমি ও বাড়ি আছে। যার অধিকাংশই পুরান ঢাকাকেন্দ্রিক। এছাড়া সারা দেশে ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় ৯১টি অ্যাকাউন্টে তাদের মোট ১৯ কোটি টাকা জমা রয়েছে। দুই ভাইয়ের ব্যক্তিগত পাঁচটি গাড়িও আছে।
গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর এনামুল হক এনু ও রুপন ভূঁইয়ার বাসায় এবং তাদের দুই কর্মচারীর বাসায় অভিযান চালায় র্যাব। সেখান থেকে পাঁচ কোটি টাকা এবং সাড়ে সাত কেজি সোনা উদ্ধার করা হয়। এছাড়া আগ্নেয়াস্ত্রও উদ্ধার করা হয়। তিনি বলেন, দেশের বাইরে পাচার করতে তারা সেগুলো রেখেছিলেন। রিমান্ডে নিয়ে দুই ভাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে আরও বিস্তারিত জানা যাবে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, সেপ্টেম্বরে তাদের বাড়িতে অভিযান চালানোর সময় তারা পালিয়ে কক্সবাজার চলে যান। অবৈধভাবে মিয়ানমার হয়ে মালয়েশিয়া পাড়ি জমানোর উদ্দেশ্য ছিল তাদের।
তবে সেখানে যেতে ব্যর্থ হয়ে তারা নেপালে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। এজন্য তারা ঢাকায় এসে কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যায় মোস্তফা নামের এক সহযোগীর মাধ্যমে ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে অবস্থান করছিলেন।
সেখান থেকে বেনামি পাসপোর্ট তৈরি করে ভারত হয়ে নেপাল যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। ভারত হয়ে নেপাল যাওয়ার জন্য মোট ৪০ লাখ টাকা সঙ্গে রাখেন। সিআইডির জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছেন, প্রথমে ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে তারা ‘ওয়ান টেন’ নামে জুয়া চালু করেন। পরে নেপালিদের মাধ্যমে সরঞ্জাম এনে সেখানে পুরোদস্তুর ক্যাসিনো চালু করে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও অন্যান্য সূত্রে জানা গেছে, ক্যাসিনোর টাকায় এনু ও রুপন গত ৬ বছরে পুরান ঢাকায় জমি, বাড়ি ও ফ্ল্যাট কিনে কমপক্ষে ২২টি। তাদের পরিবারের ৫ সদস্য, ঘনিষ্ঠজনসহ মোট ১৭ জন আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের পদ পেয়েছেন। তারা সরকারি দলের এসব পদ-পদবি জুয়া ও ক্যাসিনো কারবার নির্বিঘ্নে চালানোর ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশিত শুদ্ধি অভিযানের অংশ হিসেবে গত সেপ্টেম্বরে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অবৈধ ক্যাসিনোতে অভিযান শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তারই ধারাবাহিকতায় ১৮ সেপ্টেম্বর ওয়ান্ডারার্সসহ বিভিন্ন ক্লাবের ক্যাসিনোতে অভিযান চালায় র্যাব।
এসবের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে র্যাবের হাতে গ্রেফতার হন ঢাকা দক্ষিণ মহানগর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। ২০ সেপ্টেম্বর প্রভাবশালী ঠিকাদার যুবলীগ নেতা এসএম গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীমকে গ্রেফতার করে র্যাব।
২২ সেপ্টেম্বর আরামবাগ ক্রীড়া চক্র, দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাব, ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাব ও মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে অভিযান চালানো হয়। ২৩ সেপ্টেম্বর অভিযান চলে ফু-ওয়াং, পিয়াসী ও ড্রাগন বারে। এসব অভিযানে বিপুলসংখ্যক ক্যাসিনো সামগ্রী জব্দ করা হয়।
