মুক্তিযুদ্ধ ইতিহাসে বাঙালির শ্রেষ্ঠ অর্জন
jugantor
মুক্তিযুদ্ধ ইতিহাসে বাঙালির শ্রেষ্ঠ অর্জন

  মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম  

০৫ মার্চ ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মুক্তিযুদ্ধ ইতিহাসে বাঙালির শ্রেষ্ঠ অর্জন

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছরে আমরা পা দিয়েছি। ২০২১ সালটি মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তী বছর হিসাবে পালন করা হবে।

যথার্থ মর্যাদা ও গুরুত্বের সঙ্গে এ সুবর্ণজয়ন্তী পালন করা ইতিহাস প্রদত্ত কর্তব্য। কারণ মুক্তিযুদ্ধ ছিল ইতিহাসে বাঙালির শ্রেষ্ঠ অর্জন। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জাতি ও জনগণের সামনে প্রগতির পথে এগিয়ে যাওয়ার এক ঐতিহাসিক সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল।

নতুন এক অভিনব ‘বসন্ত’ এসেছিল জাতির জীবনে। ফুটেছিল কত ফুল। পুষ্পে পুষ্পে ভরে উঠেছিল বিজয়ের ডালি। মনের মধুরতম স্বপ্নগুলোর বাস্তবায়নের আশায় উদ্বেলিত হয়েছিল দেশবাসী।

স্বজন হারানোর ব্যথায় কাতর থাকা সত্ত্বেও সেদিন সমগ্র জাতি হয়ে উঠেছিল বিজয় আনন্দে আত্মহারা।

বাঙালি জাতির ইতিহাসে সেদিন তাৎক্ষণিক অর্জন হিসাবে রচিত হয়েছিল এক যুগান্তকারী সুমহান বিজয়। দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীকে সশস্ত্র সংগ্রামে পরাজিত করে দেশকে বিজাতীয় শাসনের নাগপাশ থেকে সেদিন মুক্ত করা হয়েছিল।

পূর্ণ মর্যাদায় সেদিন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাঙালি জাতির স্বাধীন রাষ্ট্র-বাংলাদেশ। শুধু এটুকুই নয়। গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্রের মূলনীতির ভিত্তিতে প্রগতির পথে জাতির নবযাত্রার বাস্তব সম্ভাবনা সেদিন উদ্ভাসিত হয়েছিল।

বহু বছরের সংগ্রামের ধারায় গড়ে ওঠা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উপাদানগুলোর বাস্তব সমাবেশ ঘটেছিল, তার ফলেই সৃষ্টি হতে পেরেছিল প্রগতির পথে জাতির অগ্রযাত্রার এ সম্ভাবনা।

বছরের পর বছর রচিত গণমানুষের নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের প্রবাহ, লাখো শহিদের আত্মাহুতি, অগণিত মানুষের কঠোর আত্মত্যাগ, সমগ্র জাতির লৌহদৃঢ় একতা ও মরণপণ সংগ্রাম-এ সবের ফলেই সেদিনের সেই তাৎপর্যপূর্ণ বিজয় অর্জন করা সম্ভব হয়েছিল। অমূল্য বিজয়ের ফুলের ডালি নিয়েই সেদিনের ‘নব বসন্তের’ ধারায় নতুন দেশের নবযাত্রা শুরু হয়েছিল।

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ কেবল নয় মাসের একটি ‘সামরিক অভিযান’ ছিল না। তা ছিল দীর্ঘদিনের গণসংগ্রামের শীর্ষ অধ্যায়। বহু বছরের সংগ্রামের প্রবাহে একাত্তরে রচিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র অধ্যায়ের পটভূমি ও তার অমূল্য উপাদান-সম্ভার।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল না, পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভাবাদর্শগত ভিত্তি বজায় রেখে কেবল ‘পূর্ব পাকিস্তানের’ বাঙালি মুসলমানদের ওপর পরিচালিত ‘পশ্চিম পাকিস্তানের’ বৈষম্য অবসানের জন্য একটি লড়াই। ‘পাকিস্তান’ রাষ্ট্রের সাম্প্রদায়িক, অগণতান্ত্রিক, শোষণমূলক, প্রতিক্রিয়াশীল ও সাম্রাজ্যবাদের পদলেহনের ব্যবস্থাকে বহাল রেখে, সেই পাকিস্তান রাষ্ট্রটিকে ভেঙে দুই টুকরা করে ‘পাকিস্তান’ ও ‘বাংলাস্থান’ নামে দুটি পৃথক রাষ্ট্র করার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করা হয়নি।

পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শগত ভিত্তি ধ্বংস (নেতিকরণ) করে সম্পূর্ণ ভিন্ন গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল ভিত্তির ওপর নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্পষ্ট লক্ষ্য নিয়েই সংগঠিত হয়েছিল আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের স্পষ্ট নির্দেশ ছিল এই যে, দেশ চলবে অসাম্প্রদায়িক ধারায়।

রাষ্ট্রের নীতি হবে ধর্মনিরপেক্ষতা (সেক্যুলারিজম)। কিন্তু আজ আমাদের দেশকে সেখান থেকে অনেক দূরে সরিয়ে আনা হয়েছে। ’৭৫ সালে ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দেওয়া হয়েছিল। সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনলেও এরশাদ প্রবর্তিত ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ ও ধর্মভিত্তিক দল করার সুযোগ বহাল রাখা হয়েছে।

এসব মৌলিক প্রশ্নে পশ্চাদপসারণ করে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ধারার প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির বিরুদ্ধে নীতিনিষ্ঠ আদর্শগত রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগ্রামে সরাসরি অবতীর্ণ না হয়ে, ক্ষমতার খেলায় বিজয়ী হওয়ার লোভে আদর্শের প্রশ্নে আপস করে, সাম্রাজ্যবাদসহ দেশি-বিদেশি শত্রুর সঙ্গে ‘কৌশলগত সমঝোতা’ করে মুক্তিযুদ্ধের সম্মান ও মর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করা হচ্ছে।

মুক্তিযুদ্ধ ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ আন্দোলন ছিল না। তা ছিল জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের উপাদানে সমৃদ্ধ। সাম্রাজ্যবাদ, নয়া উপনিবেশবাদ, ডলারের শৃঙ্খল, বিজাতীয় শক্তির কাছে অধীনতা-নির্ভরশীলতা-এসব থেকে মুক্তি অর্জনের মধ্য দিয়ে পূর্ণ জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রতিষ্ঠার জন্যই পরিচালিত হয়েছিল আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ।

সব ধরনের পরনির্ভরতা থেকে মুক্ত হয়ে আত্মশক্তির ওপর দাঁড়িয়ে স্বাধীন জাতীয় বিকাশের ধারাকে এগিয়ে নেওয়ার সুস্পষ্ট পথনির্দেশ ও সম্ভাবনা রচিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। কিন্তু আমাদের দেশ আজ সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব শক্তির কাছে, উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোর স্বার্থের নিগড়ে, বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ, ডব্লিউটিও সংস্থার ইচ্ছার কাছে বন্দি।

তাদের কথার বাইরে যাওয়ার উপায় নেই। চলছে সাম্রাজ্যবাদ ও দেশি-বিদেশি শোষকদের আজ্ঞাবহ হয়ে চলার প্রতিশ্রুতির প্রতিযোগিতা। চলছে নির্ভরশীলতা ও নির্লজ্জ ভিক্ষাবৃত্তিতে সাফল্য নিয়ে বড়াই করার হীন প্রবৃত্তি। জাতির আত্মসম্মান ও মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত।

দেশকে ‘পুনঃউপনিবেশীকরণের’ জালে বেঁধে ফেলা হয়েছে। ‘বিশ্ব বাস্তবতার’ তথাকথিত অজুহাত দেখিয়ে এ গ্লানিকর অধীনতার কাছে আত্মসমর্পণ করা হচ্ছে। আত্মসমর্পণের এ ‘নগদ সুবিধার’ পথ মুক্তিযুদ্ধের বিজয়সম্ভারকে পদদলিত করছে।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল জাতীয় মুক্তি অর্জনের পাশাপাশি সমাজতন্ত্রের পথে দেশের আর্থসামাজিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার স্পষ্ট প্রত্যয়ে দীপ্ত। ‘পুঁজিবাদের’ শোষণমূলক পথ নয়, ‘সমাজতন্ত্রের’ পথেই হবে এ দেশের অগ্রযাত্রা।

সংবিধানের রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতির অন্যতম হিসাবে ‘সমাজতন্ত্র’কে গ্রহণ করা হয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, সম্পদের মালিকানার রূপ, সম্পদ বণ্টনের আদর্শগত ভিত্তি ইত্যাদি বিষয়েও সংবিধানে খুবই স্পষ্ট দিকনির্দেশনা সন্নিবেশিত হয়েছিল। এসব কথা সংবিধানে এখনো আছে বটে।

কিন্তু বাস্তবে দেশ পরিচালিত হচ্ছে উলটা পথে। সমাজতন্ত্রের বদলে দেশে চলছে ‘অবাধ ও মুক্তবাজার অর্থনীতি’। চলছে বেপরোয়া ‘লুটপাটতন্ত্র’। রাষ্ট্র, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ-সবকিছুকেই আজ বিত্ত ও বিত্তবানদের দাসত্বের নিগড়ে আবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে।

লুটপাটের অর্থনীতি অপ্রতিরোধ্য শক্তিধর হয়ে উঠেছে। আপেক্ষিক দারিদ্র্য, ধনবৈষম্য, বেকারত্ব, নৈতিক অবক্ষয়, অনাচার, নৈরাজ্য বাড়ছে। মেহনতি মানুষ, মধ্যবিত্ত, এমনকি উৎপাদন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে আগ্রহী সম্পদবানরাও দিশেহারা।

অন্যদিকে, হাতেগোনা কিছু পরিবার লুটপাট চালিয়ে সম্পদের পাহাড় বানাচ্ছে, বিলাসী জীবনযাপন করছে, দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার করছে।

সংগ্রাম করেও বিজয় অর্জন না করতে পারাটা নিঃসন্দেহে গভীর বেদনার বিষয়। কিন্তু বিজয় অর্জন করার পর সে বিজয় হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার মাঝে যে পরাজয়ের গ্লানি, তা আরও বেশি মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক।

পঞ্চাশ বছর আগে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যা অর্জিত হয়েছিল, তার অনেক কিছুই আজ হারিয়েছিই কেবল নয়, ‘হারানোর উপলব্ধিটাও’ যেন আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে যায়, তার সূক্ষ্ম অপপ্রয়াস আজ চতুর্দিকে দেখতে পাচ্ছি।

বিজয় হাতছাড়া যে হয়েছে, সেটা বুঝতে না-পারা এবং বুঝতে না-দেওয়ার চেষ্টাটি আরও মর্মান্তিক। এমনটিই কিন্তু ঘটছে এখন। ‘মুক্তিযুদ্ধ’, স্বাধীনতা প্রভৃতি শব্দ বারবার উচ্চারণ করা হলেও মুক্তিযুদ্ধের অমূল্য বিজয়সম্ভারের উপকরণগুলো এবং এর মর্মকথা সচেতনভাবে অনুচ্চারিত রাখা হচ্ছে।

মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তীতে তাই প্রশ্ন জাগে মনে, তবে কি মুক্তিযুদ্ধের অর্জনের সবকিছুই আজ নিঃশেষ? না, সব শেষ হয়ে যায়নি। জাতির এ দুর্ভাগ্যের অবসানের জন্য চলতি অচলায়তন ভেঙে অবস্থার বদল ঘটাতে পারে নব যৌবনের শক্তি। দেশের অদম্য জনশক্তি।

পঞ্চাশ বছরের ভুলত্রুটি, ব্যর্থতা, বিশ্বাসঘাতকতা-এসব থেকে অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা নিয়ে এবং গভীরতর উপলব্ধি নিয়ে সেই শক্তিকে আজ আবার জেগে ওঠার প্রস্তুতি নিতে হবে। পঞ্চাশ বছর আগে ‘নব বসন্তের’ যে অমূল্য বিজয়সম্ভার অর্জন করা সম্ভব হয়েছিল, তা আজও সেক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার ভিত্তি ও প্রেরণার অনন্ত উৎস হয়ে রয়েছে।

জাতি আজ যে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধই সেক্ষেত্রে সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে এবং চেতনার মশাল হয়ে জাতিকে আবার পথ দেখাতে সক্ষম। একাত্তরের এ বিজয়কে কখনোই কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। তাই তো বলতে চাই-‘ফুল ফুটুক না ফুটুক, আজ বসন্ত’।

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি

মুক্তিযুদ্ধ ইতিহাসে বাঙালির শ্রেষ্ঠ অর্জন

 মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম 
০৫ মার্চ ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
মুক্তিযুদ্ধ ইতিহাসে বাঙালির শ্রেষ্ঠ অর্জন
ছবি: সংগৃহীত

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছরে আমরা পা দিয়েছি। ২০২১ সালটি মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তী বছর হিসাবে পালন করা হবে।

যথার্থ মর্যাদা ও গুরুত্বের সঙ্গে এ সুবর্ণজয়ন্তী পালন করা ইতিহাস প্রদত্ত কর্তব্য। কারণ মুক্তিযুদ্ধ ছিল ইতিহাসে বাঙালির শ্রেষ্ঠ অর্জন। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জাতি ও জনগণের সামনে প্রগতির পথে এগিয়ে যাওয়ার এক ঐতিহাসিক সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল।

নতুন এক অভিনব ‘বসন্ত’ এসেছিল জাতির জীবনে। ফুটেছিল কত ফুল। পুষ্পে পুষ্পে ভরে উঠেছিল বিজয়ের ডালি। মনের মধুরতম স্বপ্নগুলোর বাস্তবায়নের আশায় উদ্বেলিত হয়েছিল দেশবাসী।

স্বজন হারানোর ব্যথায় কাতর থাকা সত্ত্বেও সেদিন সমগ্র জাতি হয়ে উঠেছিল বিজয় আনন্দে আত্মহারা।

বাঙালি জাতির ইতিহাসে সেদিন তাৎক্ষণিক অর্জন হিসাবে রচিত হয়েছিল এক যুগান্তকারী সুমহান বিজয়। দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীকে সশস্ত্র সংগ্রামে পরাজিত করে দেশকে বিজাতীয় শাসনের নাগপাশ থেকে সেদিন মুক্ত করা হয়েছিল।

পূর্ণ মর্যাদায় সেদিন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাঙালি জাতির স্বাধীন রাষ্ট্র-বাংলাদেশ। শুধু এটুকুই নয়। গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্রের মূলনীতির ভিত্তিতে প্রগতির পথে জাতির নবযাত্রার বাস্তব সম্ভাবনা সেদিন উদ্ভাসিত হয়েছিল।

বহু বছরের সংগ্রামের ধারায় গড়ে ওঠা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উপাদানগুলোর বাস্তব সমাবেশ ঘটেছিল, তার ফলেই সৃষ্টি হতে পেরেছিল প্রগতির পথে জাতির অগ্রযাত্রার এ সম্ভাবনা।

বছরের পর বছর রচিত গণমানুষের নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের প্রবাহ, লাখো শহিদের আত্মাহুতি, অগণিত মানুষের কঠোর আত্মত্যাগ, সমগ্র জাতির লৌহদৃঢ় একতা ও মরণপণ সংগ্রাম-এ সবের ফলেই সেদিনের সেই তাৎপর্যপূর্ণ বিজয় অর্জন করা সম্ভব হয়েছিল। অমূল্য বিজয়ের ফুলের ডালি নিয়েই সেদিনের ‘নব বসন্তের’ ধারায় নতুন দেশের নবযাত্রা শুরু হয়েছিল।

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ কেবল নয় মাসের একটি ‘সামরিক অভিযান’ ছিল না। তা ছিল দীর্ঘদিনের গণসংগ্রামের শীর্ষ অধ্যায়। বহু বছরের সংগ্রামের প্রবাহে একাত্তরে রচিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র অধ্যায়ের পটভূমি ও তার অমূল্য উপাদান-সম্ভার।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল না, পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভাবাদর্শগত ভিত্তি বজায় রেখে কেবল ‘পূর্ব পাকিস্তানের’ বাঙালি মুসলমানদের ওপর পরিচালিত ‘পশ্চিম পাকিস্তানের’ বৈষম্য অবসানের জন্য একটি লড়াই। ‘পাকিস্তান’ রাষ্ট্রের সাম্প্রদায়িক, অগণতান্ত্রিক, শোষণমূলক, প্রতিক্রিয়াশীল ও সাম্রাজ্যবাদের পদলেহনের ব্যবস্থাকে বহাল রেখে, সেই পাকিস্তান রাষ্ট্রটিকে ভেঙে দুই টুকরা করে ‘পাকিস্তান’ ও ‘বাংলাস্থান’ নামে দুটি পৃথক রাষ্ট্র করার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করা হয়নি।

পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শগত ভিত্তি ধ্বংস (নেতিকরণ) করে সম্পূর্ণ ভিন্ন গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল ভিত্তির ওপর নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্পষ্ট লক্ষ্য নিয়েই সংগঠিত হয়েছিল আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের স্পষ্ট নির্দেশ ছিল এই যে, দেশ চলবে অসাম্প্রদায়িক ধারায়।

রাষ্ট্রের নীতি হবে ধর্মনিরপেক্ষতা (সেক্যুলারিজম)। কিন্তু আজ আমাদের দেশকে সেখান থেকে অনেক দূরে সরিয়ে আনা হয়েছে। ’৭৫ সালে ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দেওয়া হয়েছিল। সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনলেও এরশাদ প্রবর্তিত ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ ও ধর্মভিত্তিক দল করার সুযোগ বহাল রাখা হয়েছে।

এসব মৌলিক প্রশ্নে পশ্চাদপসারণ করে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ধারার প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির বিরুদ্ধে নীতিনিষ্ঠ আদর্শগত রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগ্রামে সরাসরি অবতীর্ণ না হয়ে, ক্ষমতার খেলায় বিজয়ী হওয়ার লোভে আদর্শের প্রশ্নে আপস করে, সাম্রাজ্যবাদসহ দেশি-বিদেশি শত্রুর সঙ্গে ‘কৌশলগত সমঝোতা’ করে মুক্তিযুদ্ধের সম্মান ও মর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করা হচ্ছে।

মুক্তিযুদ্ধ ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ আন্দোলন ছিল না। তা ছিল জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের উপাদানে সমৃদ্ধ। সাম্রাজ্যবাদ, নয়া উপনিবেশবাদ, ডলারের শৃঙ্খল, বিজাতীয় শক্তির কাছে অধীনতা-নির্ভরশীলতা-এসব থেকে মুক্তি অর্জনের মধ্য দিয়ে পূর্ণ জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রতিষ্ঠার জন্যই পরিচালিত হয়েছিল আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ।

সব ধরনের পরনির্ভরতা থেকে মুক্ত হয়ে আত্মশক্তির ওপর দাঁড়িয়ে স্বাধীন জাতীয় বিকাশের ধারাকে এগিয়ে নেওয়ার সুস্পষ্ট পথনির্দেশ ও সম্ভাবনা রচিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। কিন্তু আমাদের দেশ আজ সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব শক্তির কাছে, উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোর স্বার্থের নিগড়ে, বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ, ডব্লিউটিও সংস্থার ইচ্ছার কাছে বন্দি।

তাদের কথার বাইরে যাওয়ার উপায় নেই। চলছে সাম্রাজ্যবাদ ও দেশি-বিদেশি শোষকদের আজ্ঞাবহ হয়ে চলার প্রতিশ্রুতির প্রতিযোগিতা। চলছে নির্ভরশীলতা ও নির্লজ্জ ভিক্ষাবৃত্তিতে সাফল্য নিয়ে বড়াই করার হীন প্রবৃত্তি। জাতির আত্মসম্মান ও মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত।

দেশকে ‘পুনঃউপনিবেশীকরণের’ জালে বেঁধে ফেলা হয়েছে। ‘বিশ্ব বাস্তবতার’ তথাকথিত অজুহাত দেখিয়ে এ গ্লানিকর অধীনতার কাছে আত্মসমর্পণ করা হচ্ছে। আত্মসমর্পণের এ ‘নগদ সুবিধার’ পথ মুক্তিযুদ্ধের বিজয়সম্ভারকে পদদলিত করছে।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল জাতীয় মুক্তি অর্জনের পাশাপাশি সমাজতন্ত্রের পথে দেশের আর্থসামাজিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার স্পষ্ট প্রত্যয়ে দীপ্ত। ‘পুঁজিবাদের’ শোষণমূলক পথ নয়, ‘সমাজতন্ত্রের’ পথেই হবে এ দেশের অগ্রযাত্রা।

সংবিধানের রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতির অন্যতম হিসাবে ‘সমাজতন্ত্র’কে গ্রহণ করা হয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, সম্পদের মালিকানার রূপ, সম্পদ বণ্টনের আদর্শগত ভিত্তি ইত্যাদি বিষয়েও সংবিধানে খুবই স্পষ্ট দিকনির্দেশনা সন্নিবেশিত হয়েছিল। এসব কথা সংবিধানে এখনো আছে বটে।

কিন্তু বাস্তবে দেশ পরিচালিত হচ্ছে উলটা পথে। সমাজতন্ত্রের বদলে দেশে চলছে ‘অবাধ ও মুক্তবাজার অর্থনীতি’। চলছে বেপরোয়া ‘লুটপাটতন্ত্র’। রাষ্ট্র, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ-সবকিছুকেই আজ বিত্ত ও বিত্তবানদের দাসত্বের নিগড়ে আবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে।

লুটপাটের অর্থনীতি অপ্রতিরোধ্য শক্তিধর হয়ে উঠেছে। আপেক্ষিক দারিদ্র্য, ধনবৈষম্য, বেকারত্ব, নৈতিক অবক্ষয়, অনাচার, নৈরাজ্য বাড়ছে। মেহনতি মানুষ, মধ্যবিত্ত, এমনকি উৎপাদন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে আগ্রহী সম্পদবানরাও দিশেহারা।

অন্যদিকে, হাতেগোনা কিছু পরিবার লুটপাট চালিয়ে সম্পদের পাহাড় বানাচ্ছে, বিলাসী জীবনযাপন করছে, দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার করছে।

সংগ্রাম করেও বিজয় অর্জন না করতে পারাটা নিঃসন্দেহে গভীর বেদনার বিষয়। কিন্তু বিজয় অর্জন করার পর সে বিজয় হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার মাঝে যে পরাজয়ের গ্লানি, তা আরও বেশি মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক।

পঞ্চাশ বছর আগে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যা অর্জিত হয়েছিল, তার অনেক কিছুই আজ হারিয়েছিই কেবল নয়, ‘হারানোর উপলব্ধিটাও’ যেন আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে যায়, তার সূক্ষ্ম অপপ্রয়াস আজ চতুর্দিকে দেখতে পাচ্ছি।

বিজয় হাতছাড়া যে হয়েছে, সেটা বুঝতে না-পারা এবং বুঝতে না-দেওয়ার চেষ্টাটি আরও মর্মান্তিক। এমনটিই কিন্তু ঘটছে এখন। ‘মুক্তিযুদ্ধ’, স্বাধীনতা প্রভৃতি শব্দ বারবার উচ্চারণ করা হলেও মুক্তিযুদ্ধের অমূল্য বিজয়সম্ভারের উপকরণগুলো এবং এর মর্মকথা সচেতনভাবে অনুচ্চারিত রাখা হচ্ছে।

মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তীতে তাই প্রশ্ন জাগে মনে, তবে কি মুক্তিযুদ্ধের অর্জনের সবকিছুই আজ নিঃশেষ? না, সব শেষ হয়ে যায়নি। জাতির এ দুর্ভাগ্যের অবসানের জন্য চলতি অচলায়তন ভেঙে অবস্থার বদল ঘটাতে পারে নব যৌবনের শক্তি। দেশের অদম্য জনশক্তি।

পঞ্চাশ বছরের ভুলত্রুটি, ব্যর্থতা, বিশ্বাসঘাতকতা-এসব থেকে অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা নিয়ে এবং গভীরতর উপলব্ধি নিয়ে সেই শক্তিকে আজ আবার জেগে ওঠার প্রস্তুতি নিতে হবে। পঞ্চাশ বছর আগে ‘নব বসন্তের’ যে অমূল্য বিজয়সম্ভার অর্জন করা সম্ভব হয়েছিল, তা আজও সেক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার ভিত্তি ও প্রেরণার অনন্ত উৎস হয়ে রয়েছে।

জাতি আজ যে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধই সেক্ষেত্রে সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে এবং চেতনার মশাল হয়ে জাতিকে আবার পথ দেখাতে সক্ষম। একাত্তরের এ বিজয়কে কখনোই কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। তাই তো বলতে চাই-‘ফুল ফুটুক না ফুটুক, আজ বসন্ত’।

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : অগ্নিঝরা মার্চ

২১ মার্চ, ২০২১
১৮ মার্চ, ২০২১