নিয়ম ভঙ্গকারীদের জন্য কঠোর সতর্কবার্তা
প্রধানমন্ত্রী অবিচল থাকলে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে- ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী
Advertisement
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের ঘটনা নিয়মভঙ্গকারীদের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কঠোর বার্তা বলে মনে করেন দেশের বিশিষ্টজন। তাদের মতে, এ সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে আইন ও নীতি-নৈতিকতার প্রশ্নে কঠোর অবস্থানের বার্তা দিয়েছেন। মন্ত্রী, সংসদ সদস্য কিংবা জনপ্রতিনিধি- ক্ষমতাবান যেই হোন না কেন, আইন লঙ্ঘন করলে তাকে জবাবদিহি করতে হবে। সোমবার যুগান্তরকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় দেশের দুজন বিশিষ্ট নাগরিক এমনই মন্তব্য করেছেন। আরেকজন বিশিষ্ট নাগরিক বলেছেন, বিব্রতবোধের কারণে ক্ষমতাসীন দল ইশরাককে পদত্যাগ করাতে বাধ্য করেছে।
রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেললাইনসংলগ্ন এলাকায় অস্ত্র দেখিয়ে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেন ইশরাক হোসেন। অভিযানের সময় তার সহযোগীদের হাতেও আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। তবে একজন প্রতিমন্ত্রীর এভাবে অস্ত্র নিয়ে অভিযান পরিচালনা করা সঠিক হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী। তিনি বলেন, মাদকমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য থাকলেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ নেই। লাইসেন্স করা হলেও একজন জনপ্রতিনিধির প্রকাশ্যে পিস্তল বের করা সমীচীন নয়। আইন লঙ্ঘন করে যে কোনো পদক্ষেপের দায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেই নিতে হবে।
আর অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনাকে বাড়াবাড়ি হিসাবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ইশরাকের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে দলের অন্যদের জন্যও একটি কঠোর বার্তা গেছে। মন্ত্রিসভার সদস্য ও সংসদ সদস্যরাও সতর্ক হবেন বলে আশা করেন তিনি।
তবে ইশরাক হোসেনের মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়া এবং পদত্যাগের সময়ে তার আচরণ এবং বক্তব্য সরকার ও ক্ষমতাসীনদলকে অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি করেছে বলে মনে করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, যে আচরণ শীর্ষ পর্যায়ে অগ্রহণযোগ্য হওয়ার কারণে ইশরাককে পদত্যাগ করতে হলো, তারই যথার্থতার দাবির পক্ষে নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ত করে আবারও শোডাউন করেছেন তিনি। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে জনমনে যে উদ্বেগ বেড়ে চলেছে, তা আরও ঘনীভূত হয়েছে। এরকম অরাজক পরিস্থিতি পুলিশের জন্য যতটুকু, তার চেয়ে বেশি সরকার ও ক্ষমতাসীনদলকে অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি করেছে।
সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে পদত্যাগের ঘোষণা করেন ইশরাক হোসেন। এ সময় তিনি অস্ত্রসহ অভিযানের পক্ষে সাফাই গান। সামনের দিনেও মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার কথা জানান।
প্রতিমন্ত্রী থাকা অবস্থায় সরকারি প্রটোকল নিয়ে ইশরাক হোসেনের মাদকবিরোধী অভিযান ও তার পদত্যাগ প্রসঙ্গে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এক্ষেত্রে আইনের বহুমাত্রিক লঙ্ঘন হয়েছে। একজন জনপ্রতিনিধি, যিনি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন, তিনি আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। এমন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান থেকে দল ও সরকারের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি এবং আইনের শাসনের প্রতি আস্থাহীনতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি বলেন, আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সের শর্তভঙ্গ করে আত্মরক্ষার সীমা অতিক্রম করে মাদক নিয়ন্ত্রণের নামে বাস্তবে বিচারহীন খুনের হুমকিসহ সহিংসতার শোডাউন করেছেন ইশরাক। সরকারি দায়িত্বপূর্ণ অবস্থান থেকে পুলিশের ওপর চরম আস্থাহীনতার বার্তা দিয়েছেন। ক্ষমতার অপব্যবহার ও আইনের এই বেপরোয়া লঙ্ঘন সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের জন্য বিব্রতকর দৃষ্টান্ত। তার পদত্যাগ যথেষ্ট নয়, দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহি নিশ্চিত করা না হলে সরকারকে ক্রমাগত আরও অধিকতর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে।
ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে অধ্যাপক আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রী এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দেখিয়েছেন, তিনি একটি সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চান। কোনো মন্ত্রী বা সংসদ সদস্য আইন নিজের হাতে তুলে নিলে কিংবা অন্যায় কাজে জড়ালে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এ ধরনের দৃঢ় অবস্থান প্রয়োজন।
এর আগে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে ঘিরে নেওয়া পদক্ষেপের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে একই ধরনের বার্তা দেওয়া হচ্ছে। দলীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক সম্পর্কের কারণে কাউকে ছাড় দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে সভ্য, মানবিক, জ্ঞানভিত্তিক ও উদার গণতান্ত্রিক সমাজে রূপান্তর করতে হলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনাকে বাড়াবাড়ি হিসাবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ। তার মতে, একজন মন্ত্রী হিসাবে প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন করা সমীচীন নয়। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে ব্যক্তি, দল ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন্ন হয়। ইশরাকের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে দলের অন্যদের জন্যও একটি বার্তা গেছে বলে মনে করেন তিনি।
তবে মাদকবিরোধী অভিযান ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, মাদকবিরোধী অভিযানে অনেক সময় মাদকসেবী ও খুচরা বিক্রেতারা ধরা পড়েন। পরে তাদের অনেকে জামিনে বেরিয়ে আসেন। কিন্তু মাদক ব্যবসার নেপথ্যে থাকা মূল হোতা ও পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, সেই প্রশ্ন রয়েছে। তার মতে, অভিযানে শুধু খুচরা বিক্রেতাদের গ্রেফতার করলেই মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। মাদক কারবারির সঙ্গে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়, নেপথ্যের হোতাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সরকারের দায়িত্ব।
