ফ্রান্সে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে, কারফিউ জারি
Advertisement
হাসান ইলিয়াছ তানিম, প্যারিস (ফ্রান্স) থেকে
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ফ্রান্সজুড়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির উচ্চমূল্য ও সরকারি জনসেবার মান নিয়ে অসন্তোষের জেরে শুরু হওয়া বিক্ষোভ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। গত শনিবারের ভয়াবহ সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগের পর রোববার রাতেও প্যারিসের বিভিন্ন এলাকায় দোকানপাটে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ। এ অবস্থায় কয়েকটি স্থানে কারফিউ বা সান্ধ্য আইন জারির নির্দেশ দিয়েছে সরকার।
বিক্ষোভ পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হওয়ায় চরম চাপে পড়েছে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সরকার। নিজের প্রেসিডেন্ট মেয়াদের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে ম্যাক্রোঁর নেতৃত্ব নিয়েও সমালোচনা বাড়ছে; প্রশ্ন উঠছে তার ভূমিকা নিয়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থতার অভিযোগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগও দাবি করেছেন বিরোধীরা। এ অবস্থায় আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে অর্থনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক বিভাজন ও নতুন বিক্ষোভের ঘোষণায় দেশটির সংকট আরও গভীর হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
রোববার বিকালে প্যারিসের কেন্দ্রস্থল প্লাস দ্য লা রিপাবলিক এলাকায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। টানা দ্বিতীয় দিনের মতো সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন সড়কে বৈদ্যুতিক সাইকেল স্তূপ করে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে বিক্ষোভে দেড় হাজারের বেশি দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে। এতে ক্ষতির পরিমাণ কয়েক কোটি ইউরোতে পৌঁছেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাস ও স্টান গ্রেনেড ব্যবহার করে পুলিশ। ফরাসি সংবাদমাধ্যম ল্য মঁদের সোমবার সকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার বিক্ষোভের পর দেশজুড়ে প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। শনিবারের বিক্ষোভে অংশ নেন ৫ লাখের বেশি মানুষ।
এদিকে সহিংসতার জেরে আহত হয়েছেন প্রায় এক হাজার পুলিশ ও জেন্ডারমেরি সদস্য। রোববার টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে ম্যাক্রোঁ তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে ‘বেপরোয়া সহিংসতা’ হিসাবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘এসব ছবি দেখার পর আমরা সবাই নিজেদের প্রশ্ন করেছি-ফরাসিরা কীভাবে ফ্রান্সের সঙ্গে এমনটা করতে পারে?’ সহিংসতার জেরে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু সহিংসতাপ্রবণ শহরগুলোতে সীমিত সময়ের জন্য স্থানীয় কারফিউ জারির নির্দেশ দিয়েছেন। মার্সেইয়ে সোমবার দুপুর ১২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত বিক্ষোভ ও সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে পুরো ফ্রান্সে দেশব্যাপী কারফিউ জারি করা হয়নি।
বিক্ষোভের নেপথ্যে কী?
সোমবার দ্য নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে, ফ্রান্সে সাম্প্রতিক সহিংসতার পেছনে একাধিক আন্দোলন ও জন-অসন্তোষের সম্মিলিত প্রভাব। কয়েক সপ্তাহ ধরে উন্নত শিক্ষার পরিবেশের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছেন; পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে গড়ে উঠেছে নতুন জাতীয় আন্দোলন; সেই সুযোগে লুটপাটে অংশ নিয়েছে কিছু দাঙ্গাকারী-সবমিলিয়ে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি
শনিবারের সহিংসতা সামাল দিতে সরকার প্রস্তুত ছিল না- এমন অভিযোগ তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজের পদত্যাগ দাবি করেন বাম ও ডানপন্থি রাজনীতিকরা। নুনেজ পদত্যাগের প্রস্তাব দিলেও তা গ্রহণ করেননি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ। প্রেসিডেন্ট কার্যালয় এলিসি প্রাসাদ এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রোববার প্রেসিডেন্টের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছিলেন। তবে এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নেতৃত্ব অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় প্রেসিডেন্ট তা প্রত্যাখ্যান করেন।’
রাজনৈতিক দোষারোপে বাড়ছে উত্তেজনা
ম্যাক্রোঁ ও প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু শনিবারের সহিংসতার জন্য উগ্র বামপন্থি গোষ্ঠী ও অপরাধীদের দায়ী করেছেন। অন্যদিকে কট্টর বামপন্থি নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ সরকারের ‘অযোগ্যতা’ ও ব্যর্থতার অভিযোগ তুলেছেন। জাতীয়তাবাদী ডানপন্থি নেতা মেরিন লা পেনও সরকারের সমালোচনা করেছেন। বিবিসি লিখেছে, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের বিপরীতে রাজনীতিকরা একে অপরের ওপর দায় চাপাতেই বেশি ব্যস্ত-এমন হতাশা প্রকাশ করছেন অনেক ফরাসি নাগরিক।
বিক্ষোভে সুবিধা কট্টর ডান লা পেনের
ফ্রান্সে চলমান বিক্ষোভের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে আগামী বছরের এপ্রিলে অনুষ্ঠেয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে এ আন্দোলন দেশটির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্রান্সের রাজনীতি বর্তমানে মোটামুটি তিনটি বড় দলে বিভক্ত-চরম ডানপন্থি, মধ্য-ডানপন্থি ও চরম বামপন্থি। এসব দলের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার অভাব রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে কট্টর ডানপন্থি নেত্রী মেরিন লা পেন ও অন্য ডানপন্থি রাজনীতিকরা বিদ্যালয়ে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, পুলিশের জন্য অর্থায়ন বাড়ানো এবং সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। বিশ্লেষকের মতে, বিপুলসংখ্যক মানুষের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে ঘটে যাওয়া সহিংসতা লা পেনের রাজনৈতিক অবস্থান জোরদার করার সুযোগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে এটি জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁর নেতৃত্বাধীন বামপন্থি দল লা ফ্রঁস ইনসুমিজের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। দলটি বিক্ষোভের প্রতি জোরালো সমর্থন জানিয়েছে।
৫ নভেম্বর ফের বড় বিক্ষোভের ঘোষণা
আগামী ৫ নভেম্বর বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়নের সমন্বয়ে নতুন করে বড় আকারের ধর্মঘট ও বিক্ষোভের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে দেশটিতে। এর সঙ্গে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে ফ্রান্সের বিচিত্র রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিচয়ের ‘ইয়েলো ভেস্ট’ বা হলুদ জ্যাকেট আন্দোলনের কর্মীদেরও।
