মাঠে ঠকছেন কৃষক, বাজারে ভোক্তা
jugantor
মাঠে ঠকছেন কৃষক, বাজারে ভোক্তা

  ইয়াসিন রহমান  

০৯ এপ্রিল ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পণ্য পরিবহণে পথে পথে চাঁদাবাজি

রাজশাহীর বানেশ্বর বাজার থেকে ঢাকার কাওরান বাজার পর্যন্ত পণ্য পরিবহণে ট্রাকভাড়া ১৭ হাজার টাকা। এর বাইরে রাজশাহীর আমচত্বর, বেলপুকুরিয়া, নাটোর বাইপাস, এলেঙ্গা বাইপাস, টাঙ্গাইল বাইপাস, কাওরান বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে প্রায় দেড় থেকে দুহাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়।

যশোর থেকে ঢাকার কাওরান বাজার পর্যন্ত ট্রাকভাড়া ২৪ হাজার টাকা। এই পথেও কয়েক জায়গায় চাঁদা দিতে হয়। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে। এই প্রতিবেদনে ‘রাস্তা খরচ’ খাতে পুলিশের চাঁদার কথা বলা হয়েছে।

যুগান্তরের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, উৎপাদনকারী থেকে পণ্য ভোক্তা পর্যায়ে আসতে বেশ কয়েকটি ধাপ পেরোতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে-স্থানীয় ব্যবসায়ী, স্থানীয় মজুতদার, স্থানীয় খুচরা বাজার, ব্যাপারী, পাইকারি ব্যবসায়ী, কেন্দ্রীয় বাজার বা টার্মিনাল, আড়তদার, প্রক্রিয়াজাতকারী, খুচরা বাজার, খুচরা ব্যবসায়ী ইত্যাদি।

প্রতিটি ধাপেই মূল্য বাড়ে। এর সঙ্গে আছে নামে-বেনামে চাঁদাবাজি। মহাসড়কে, টার্মিনালে, ফেরিঘাটে, নগরীর প্রবেশমুখে চাঁদা আদায় হয়। সবকিছু যোগ করে নির্ধারণ হয় পণ্যের দাম। এর সঙ্গে লাভ যোগ করে খুচরা বিক্রেতা ভোক্তার হাতে দ্রব্য তুলে দিচ্ছেন।

ভোক্তা যে দামে কিনছেন তার সঙ্গে কৃষকের বিক্রি দামের মধ্যে বিস্তর ফাকার দেখা গেছে। বাস্তবে দুই প্রান্তের (ঢাকা ও তৃণমূল পর্যায়) সঙ্গে মিলিয়ে দেখা গেছে পণ্য উৎপাদনের পর বিক্রি করে ঠকছেন কৃষক এবং ঢাকায় খুচরা পর্যায়ে চড়া দামে কিনতে গিয়ে ঠকছেন ভোক্ত। বাকি সবাই লাভবান হচ্ছেন।

কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আবদুর রাজ্জাক বলেন, সবজির বিপণনে কিছুটা সমস্যা রয়েছে। এর মধ্যে পরিবহণ চাঁদাবাজি হচ্ছে। পাশাপাশি মধ্যস্বত্বভোগীসহ অনেক সমস্যা রয়েছে।

এসব সমস্যার সমাধান করতে পারলে সবজির ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হবে। সম্প্রতি জাতীয় সবজি মেলা উদ্বোধনকালে তিনি বলেন, কৃষককে লাভবান করতে ইতোমধ্যে রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউতে কৃষকের বাজার স্থাপন করা হয়েছে।

আর এ ধরনের বাজার প্রত্যেকটি জেলায় করা হবে। যাতে কৃষক তাদের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি ভোক্তার কাছে বিক্রি করতে পারে। এতে করে কৃষকের সঙ্গে ভোক্তাও লাভবান হবেন।

যুগান্তরের অনুসন্ধানেও কৃষিমন্ত্রীর বক্তব্যের সত্যতা মিলেছে। মাঠ পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করছেন তারা চাঁদাবাজির শিকার। তারা এর নাম দিয়েছেন গুপ্ত চাঁদাবাজি। পথে নামে-বেনামে চাঁদাবাজির পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ে পণ্যের হাতবদল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে দাম বাড়ছে পাগলা ঘোড়ার গতিতে।

কৃষকের পণ্য মাঠ থেকে ঢাকার খুচরা বাজারে পৌঁছাতে পণ্যের দাম ৪ থেকে ৫ দফা বেড়ে যাচ্ছে।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের কৃষক যে বাঁধাকপি গড়ে সাড়ে ১৩ টাকা (প্রতিটি) দরে বিক্রি করেন, সেই কপি ঢাকায় এসে খুচরা বাজারে দাম ৩৮ টাকা। গ্রামে কৃষক পর্যায়ে দামের চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি।

শুধু বাঁধাকপি নয়, এভাবে- বেগুন, শিম, ফুলকপি ও কাঁচামরিচ কৃষক পর্যায়ের দামের দুই থেকে তিনগুণ দরে বিক্রি হয় ঢাকার বাজারে। এর কারণ হিসাবে মধ্যস্বত্বভোগী, পরিবহণ খরচ ও পুলিশের চাঁদাবাজিকে দায়ী করা হয়েছে।

অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে গত ১ থেকে ৩ জানুয়ারি ঢাকার কাওরান বাজার, বগুড়া, যশোর, রাজশাহী ও মেহেরপুর জেলার কৃষক, ফড়িয়া, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতার কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়।

রমজান উপলক্ষ্যে চাঁদা আদায়ের হার আরও বেড়েছে। ফলে পণ্যের দামও প্রায় আকাশ ছুঁয়েছে। এই দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার নানা ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। এর কিছু কাজ হয়েছে। তবে বেশিরভাগই সুফল বয়ে আনেনি। ফলে বাজারে দামের পাগলা ঘোড়া এখনো বশে আসেনি।

খুচরা বাজারে পণ্যের দাম বাড়লেও কৃষক নায্যমূল্য পাচ্ছে না। অনেকটা উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। অন্যদিকে ভোক্তাকে কিনতে হচ্ছে বেশি দাম দিয়ে।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের সর্বশেষ জরিপে দেখা যায়, কৃষক পর্যায়ে এক কেজি আলু উৎপাদনে খরচ হয় ৭ টাকা ৬০ পয়সা। কৃষক স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে এ আলু প্রতিকেজি ৮ টাকা ৮৫ পয়সায় বিক্রি করছেন।

কৃষক মুনাফা পাচ্ছেন সাড়ে ১৬ শতাংশ। স্থানীয় ব্যবসায়ী তা পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করছেন ১২ টাকা ২০ পয়সায়। এতে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মুনাফা করছেন প্রায় ৩৮ শতাংশ।

পাইকারি ব্যবসায়ীরা এক কেজি আলু খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করছেন ১৭ টাকায়। এতে পাইকারি ব্যবসায়ীরা মুনাফা করছেন প্রায় ৪০ শতাংশ। খুচরা ব্যবসায়ী একই আলু সাধারণ ভোক্তার কাছে বিক্রি করছেন ২২ টাকায়। এতে খুচরা ব্যবসায়ীদের মুনাফা হচ্ছে প্রায় ৩০ শতাংশ।

প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, কৃষকের ৭ টাকা ৬০ পয়সার এক কেজি আলু ভোক্তা কিনছে ২২ টাকায়। অর্থাৎ কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে এক কেজি আলু ৫ দফা হাতবদল হচ্ছে।

দাম বাড়ছে ১৪ টাকা ৪০ পয়সা বা ১৯০ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি দাম বাড়ছে পাইকারি থেকে ভোক্তার কাছে আসতে। এভাবে প্রায় সব পণ্যের দামই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর মধ্যে চাঁদাবাজির অর্থও রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, মাঠে কৃষক আর বাজারে ভোক্তা উভয়েই ঠকছেন। বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় মধ্যস্বত্বভোগীরা অতি মুনাফা লুটছে।

যদি কৃষক পর্যায় থেকে সরাসরি পাইকারি ও খুচরা বাজারে পণ্য বিক্রি করার উপায় থাকত, তবে মধ্যস্বত্বভোগীরা অতি মুনাফা করতে পারত না। পাশাপাশি রাস্তায় চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে।

নিজস্ব অনুসন্ধানে জানা গেছে, ময়মনসিংহ ও যশোরে কৃষক পর্যায়ে প্রতিকেজি বেগুন ২০-২৫ টাকায় বিক্রি হলেও রাজধানীর খুচরা বাজারে বিক্রি হয়েছে ১০০ টাকায়। যা কৃষকের দাম থেকে ৬ থেকে ৮ গুণ বেশি।

একইভাবে ১৫-২০ টাকা কেজির শসা ঢাকায় বিক্রি হয়েছে ৭০-৮০ টাকায়। যা ৪ থেকে ৫ গুণ বেশি। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সবজির সরবরাহ বাড়লেও দাম অনেক বেশি।

নানা খাতে খরচ ও ঘন ঘন হাতবদলে মুনাফার হার বেশি হওয়ায় ভর মৌসুমেও সবজির দাম কমছে না। পাশাপাশি রয়েছে একশ্রেণির অসাধু মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেট।

এদিকে সবজির সবচেয়ে বড় মোকাম রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার মৌগাছি হাটে বেগুন বিক্রি করতে আসেন পাশের উপজেলার সন্তোষপুর গ্রামের সবজি চাষি আবদুল মতিন।

তিনি বলেন, আমি গত বছরের মতো এবারও তিন বিঘা জমি বর্গা নিয়ে চাষ করেছি। ২৫ টাকা কেজিতে বেগুন ফড়িয়াদের কাছে বিক্রি করতে হচ্ছে। সবজি বিক্রি করে এখন উৎপাদন খরচই উঠছে না। কিন্তু ঢাকায় শুনছি ১০০ টাকার ওপরে বিক্রি হচ্ছে।

শুক্রবার রাজধানীর কাওরান বাজার, শান্তিনগর কাঁচাবাজার, মালিবাগ বাজারসহ বেশ কয়েকটি বাজার ঘুরে বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খুচরা পর্যায়ে প্রতিকেজি পটোল বিক্রি হয়েছে ৬০ টাকা, শসা ৮০ টাকা, বেগুন ১০০ টাকা, ঢ্যাঁড়স ও পটোল ৬০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।

এছাড়া প্রতিপিস লেবু ১০ টাকা ও লাউ বিক্রি হয়েছে ৬০ টাকা। কিন্তু কৃষক পর্যায়ে প্রতিকেজি পটোল বিক্রি হয়েছে ৩৫ টাকা, শসা ২৫ টাকা, বেগুন ২০-২৫ টাকা, ঢ্যাঁড়স ৩০ ও পটোলের কেজি ৩৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এছাড়া প্রতিপিস লেবু কৃষক পর্যায়ে ৩ টাকা ও লাউ ১৮-২০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।

এদিকে গত ২ এপ্রিল ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতির ফেডারেশন (এফবিসিসিআই) রাজধানীর মতিঝিলে নিজেদের কার্যালয়ে এক সভার আয়োজন করে।

সভায় ব্যবসায়ীরা বলেন, সড়ক-মহাসড়কে পুলিশ ও কাঁচাবাজারে প্রভাবশালীদের ‘গুপ্ত’ চাঁদাবাজির কারণে পণ্যের দাম বেড়েছে। তারা বলেছেন, সড়ক ও মহাসড়কে প্রতিনিয়ত চাঁদাবাজি হচ্ছে।

বিষয়টি অনেকটা সরকারিভাবে টোল সংগ্রহের মতো হয়ে গেছে। চাঁদাবাজি কমলে নিত্যপণ্যের দামও কমবে। এ সময় এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ঘাটে ঘাটে চাঁদা দিতে হচ্ছে। এগুলো নিয়ে ব্যবসায়ীরা উদ্বেগের মধ্যে আছেন। এর সমাধান হওয়া উচিত।

ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার মো. ফারুক হোসেন শুক্রবার যুগান্তরকে বলেন, যদি কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিতে জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া যায় তবে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে।

এতে অপরাধ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট সদস্যকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে। তবে তিনি বলেন, এ ধরনের কাজের সঙ্গে পুলিশের সম্পৃক্ততার কোনো অভিযোগ তাদের কাছে নেই।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলেন, তদারকিকালে দেখছি বাজারে পর্যাপ্ত সবজি আছে, কিন্তু দামও বেশি। কেন এই দাম বেশি তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অনিয়ম পেলেই শাস্তির আওতায় আনা হবে।

অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার মন্ডল বলেন, পরিবহণ খরচসহ বড় আকৃতির একটি লেবুর পাইকারি মূল্য কাওরান বাজারে ৩ টাকা হলেও বিভিন্ন হাতবদল হয়ে রাজধানীর খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে প্রতিটি ১০ টাকা। এখানে কোনো কারসাজি আছে কিনা তা দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি চাঁদাবাজি বিষয়টাও দেখা হচ্ছে।

হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপারেশনস) যুগান্তরকে বলেন, ঢালাওভাবে হাইওয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির যে অভিযোগ আনা হচ্ছে তা সত্য নয়।

তবে এই অভিযোগকে আমরা অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে নিয়েছি। কেবল পুলিশ সদস্য নয়, সড়কে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে আমরা শক্ত অবস্থানে আছি। যেখানেই এ ধরনের ঘটনা ঘটুক না কেন, আমাদের জানানোর জন্য অনুরোধ করছি। তাহলে আমরা তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে যেতে পারব।

মাঠে ঠকছেন কৃষক, বাজারে ভোক্তা

 ইয়াসিন রহমান 
০৯ এপ্রিল ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
পণ্য পরিবহণে পথে পথে চাঁদাবাজি
ফাইল ছবি

রাজশাহীর বানেশ্বর বাজার থেকে ঢাকার কাওরান বাজার পর্যন্ত পণ্য পরিবহণে ট্রাকভাড়া ১৭ হাজার টাকা। এর বাইরে রাজশাহীর আমচত্বর, বেলপুকুরিয়া, নাটোর বাইপাস, এলেঙ্গা বাইপাস, টাঙ্গাইল বাইপাস, কাওরান বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে প্রায় দেড় থেকে দুহাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়।

যশোর থেকে ঢাকার কাওরান বাজার পর্যন্ত ট্রাকভাড়া ২৪ হাজার টাকা। এই পথেও কয়েক জায়গায় চাঁদা দিতে হয়। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে। এই প্রতিবেদনে ‘রাস্তা খরচ’ খাতে পুলিশের চাঁদার কথা বলা হয়েছে। 

যুগান্তরের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, উৎপাদনকারী থেকে পণ্য ভোক্তা পর্যায়ে আসতে বেশ কয়েকটি ধাপ পেরোতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে-স্থানীয় ব্যবসায়ী, স্থানীয় মজুতদার, স্থানীয় খুচরা বাজার, ব্যাপারী, পাইকারি ব্যবসায়ী, কেন্দ্রীয় বাজার বা টার্মিনাল, আড়তদার, প্রক্রিয়াজাতকারী, খুচরা বাজার, খুচরা ব্যবসায়ী ইত্যাদি।

প্রতিটি ধাপেই মূল্য বাড়ে। এর সঙ্গে আছে নামে-বেনামে চাঁদাবাজি। মহাসড়কে, টার্মিনালে, ফেরিঘাটে, নগরীর প্রবেশমুখে চাঁদা আদায় হয়। সবকিছু যোগ করে নির্ধারণ হয় পণ্যের দাম। এর সঙ্গে লাভ যোগ করে খুচরা বিক্রেতা ভোক্তার হাতে দ্রব্য তুলে দিচ্ছেন।

ভোক্তা যে দামে কিনছেন তার সঙ্গে কৃষকের বিক্রি দামের মধ্যে বিস্তর ফাকার দেখা গেছে। বাস্তবে দুই প্রান্তের (ঢাকা ও তৃণমূল পর্যায়) সঙ্গে মিলিয়ে দেখা গেছে পণ্য উৎপাদনের পর বিক্রি করে ঠকছেন কৃষক এবং ঢাকায় খুচরা পর্যায়ে চড়া দামে কিনতে গিয়ে ঠকছেন ভোক্ত। বাকি সবাই লাভবান হচ্ছেন। 

কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আবদুর রাজ্জাক বলেন, সবজির বিপণনে কিছুটা সমস্যা রয়েছে। এর মধ্যে পরিবহণ চাঁদাবাজি হচ্ছে। পাশাপাশি মধ্যস্বত্বভোগীসহ অনেক সমস্যা রয়েছে।

এসব সমস্যার সমাধান করতে পারলে সবজির ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হবে। সম্প্রতি জাতীয় সবজি মেলা উদ্বোধনকালে তিনি বলেন, কৃষককে লাভবান করতে ইতোমধ্যে রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউতে কৃষকের বাজার স্থাপন করা হয়েছে।

আর এ ধরনের বাজার প্রত্যেকটি জেলায় করা হবে। যাতে কৃষক তাদের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি ভোক্তার কাছে বিক্রি করতে পারে। এতে করে কৃষকের সঙ্গে ভোক্তাও লাভবান হবেন।

যুগান্তরের অনুসন্ধানেও কৃষিমন্ত্রীর বক্তব্যের সত্যতা মিলেছে। মাঠ পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করছেন তারা চাঁদাবাজির শিকার। তারা এর নাম দিয়েছেন গুপ্ত চাঁদাবাজি। পথে নামে-বেনামে চাঁদাবাজির পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ে পণ্যের হাতবদল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে দাম বাড়ছে পাগলা ঘোড়ার গতিতে।

কৃষকের পণ্য মাঠ থেকে ঢাকার খুচরা বাজারে পৌঁছাতে পণ্যের দাম ৪ থেকে ৫ দফা বেড়ে যাচ্ছে।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের কৃষক যে বাঁধাকপি গড়ে সাড়ে ১৩ টাকা (প্রতিটি) দরে বিক্রি করেন, সেই কপি ঢাকায় এসে খুচরা বাজারে দাম ৩৮ টাকা। গ্রামে কৃষক পর্যায়ে দামের চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি।

শুধু বাঁধাকপি নয়, এভাবে- বেগুন, শিম, ফুলকপি ও কাঁচামরিচ কৃষক পর্যায়ের দামের দুই থেকে তিনগুণ দরে বিক্রি হয় ঢাকার বাজারে। এর কারণ হিসাবে মধ্যস্বত্বভোগী, পরিবহণ খরচ ও পুলিশের চাঁদাবাজিকে দায়ী করা হয়েছে।

অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে গত ১ থেকে ৩ জানুয়ারি ঢাকার কাওরান বাজার, বগুড়া, যশোর, রাজশাহী ও মেহেরপুর জেলার কৃষক, ফড়িয়া, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতার কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়।

রমজান উপলক্ষ্যে চাঁদা আদায়ের হার আরও বেড়েছে। ফলে পণ্যের দামও প্রায় আকাশ ছুঁয়েছে। এই দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার নানা ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। এর কিছু কাজ হয়েছে। তবে বেশিরভাগই সুফল বয়ে আনেনি। ফলে বাজারে দামের পাগলা ঘোড়া এখনো বশে আসেনি।

খুচরা বাজারে পণ্যের দাম বাড়লেও কৃষক নায্যমূল্য পাচ্ছে না। অনেকটা উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। অন্যদিকে ভোক্তাকে কিনতে হচ্ছে বেশি দাম দিয়ে। 

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের সর্বশেষ জরিপে দেখা যায়, কৃষক পর্যায়ে এক কেজি আলু উৎপাদনে খরচ হয় ৭ টাকা ৬০ পয়সা। কৃষক স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে এ আলু প্রতিকেজি ৮ টাকা ৮৫ পয়সায় বিক্রি করছেন।

কৃষক মুনাফা পাচ্ছেন সাড়ে ১৬ শতাংশ। স্থানীয় ব্যবসায়ী তা পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করছেন ১২ টাকা ২০ পয়সায়। এতে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মুনাফা করছেন প্রায় ৩৮ শতাংশ।

পাইকারি ব্যবসায়ীরা এক কেজি আলু খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করছেন ১৭ টাকায়। এতে পাইকারি ব্যবসায়ীরা মুনাফা করছেন প্রায় ৪০ শতাংশ। খুচরা ব্যবসায়ী একই আলু সাধারণ ভোক্তার কাছে বিক্রি করছেন ২২ টাকায়। এতে খুচরা ব্যবসায়ীদের মুনাফা হচ্ছে প্রায় ৩০ শতাংশ।

প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, কৃষকের ৭ টাকা ৬০ পয়সার এক কেজি আলু ভোক্তা কিনছে ২২ টাকায়। অর্থাৎ কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে এক কেজি আলু ৫ দফা হাতবদল হচ্ছে।

দাম বাড়ছে ১৪ টাকা ৪০ পয়সা বা ১৯০ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি দাম বাড়ছে পাইকারি থেকে ভোক্তার কাছে আসতে। এভাবে প্রায় সব পণ্যের দামই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর মধ্যে চাঁদাবাজির অর্থও রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, মাঠে কৃষক আর বাজারে ভোক্তা উভয়েই ঠকছেন। বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় মধ্যস্বত্বভোগীরা অতি মুনাফা লুটছে।

যদি কৃষক পর্যায় থেকে সরাসরি পাইকারি ও খুচরা বাজারে পণ্য বিক্রি করার উপায় থাকত, তবে মধ্যস্বত্বভোগীরা অতি মুনাফা করতে পারত না। পাশাপাশি রাস্তায় চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে।

নিজস্ব অনুসন্ধানে জানা গেছে, ময়মনসিংহ ও যশোরে কৃষক পর্যায়ে প্রতিকেজি বেগুন ২০-২৫ টাকায় বিক্রি হলেও রাজধানীর খুচরা বাজারে বিক্রি হয়েছে ১০০ টাকায়। যা কৃষকের দাম থেকে ৬ থেকে ৮ গুণ বেশি।

একইভাবে ১৫-২০ টাকা কেজির শসা ঢাকায় বিক্রি হয়েছে ৭০-৮০ টাকায়। যা ৪ থেকে ৫ গুণ বেশি। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সবজির সরবরাহ বাড়লেও দাম অনেক বেশি।

নানা খাতে খরচ ও ঘন ঘন হাতবদলে মুনাফার হার বেশি হওয়ায় ভর মৌসুমেও সবজির দাম কমছে না। পাশাপাশি রয়েছে একশ্রেণির অসাধু মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেট।

এদিকে সবজির সবচেয়ে বড় মোকাম রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার মৌগাছি হাটে বেগুন বিক্রি করতে আসেন পাশের উপজেলার সন্তোষপুর গ্রামের সবজি চাষি আবদুল মতিন।

তিনি বলেন, আমি গত বছরের মতো এবারও তিন বিঘা জমি বর্গা নিয়ে চাষ করেছি। ২৫ টাকা কেজিতে বেগুন ফড়িয়াদের কাছে বিক্রি করতে হচ্ছে। সবজি বিক্রি করে এখন উৎপাদন খরচই উঠছে না। কিন্তু ঢাকায় শুনছি ১০০ টাকার ওপরে বিক্রি হচ্ছে।

শুক্রবার রাজধানীর কাওরান বাজার, শান্তিনগর কাঁচাবাজার, মালিবাগ বাজারসহ বেশ কয়েকটি বাজার ঘুরে বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খুচরা পর্যায়ে প্রতিকেজি পটোল বিক্রি হয়েছে ৬০ টাকা, শসা ৮০ টাকা, বেগুন ১০০ টাকা, ঢ্যাঁড়স ও পটোল ৬০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।

এছাড়া প্রতিপিস লেবু ১০ টাকা ও লাউ বিক্রি হয়েছে ৬০ টাকা। কিন্তু কৃষক পর্যায়ে প্রতিকেজি পটোল বিক্রি হয়েছে ৩৫ টাকা, শসা ২৫ টাকা, বেগুন ২০-২৫ টাকা, ঢ্যাঁড়স ৩০ ও পটোলের কেজি ৩৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এছাড়া প্রতিপিস লেবু কৃষক পর্যায়ে ৩ টাকা ও লাউ ১৮-২০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।

এদিকে গত ২ এপ্রিল ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতির ফেডারেশন (এফবিসিসিআই) রাজধানীর মতিঝিলে নিজেদের কার্যালয়ে এক সভার আয়োজন করে।

সভায় ব্যবসায়ীরা বলেন, সড়ক-মহাসড়কে পুলিশ ও কাঁচাবাজারে প্রভাবশালীদের ‘গুপ্ত’ চাঁদাবাজির কারণে পণ্যের দাম বেড়েছে। তারা বলেছেন, সড়ক ও মহাসড়কে প্রতিনিয়ত চাঁদাবাজি হচ্ছে।

বিষয়টি অনেকটা সরকারিভাবে টোল সংগ্রহের মতো হয়ে গেছে। চাঁদাবাজি কমলে নিত্যপণ্যের দামও কমবে। এ সময় এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ঘাটে ঘাটে চাঁদা দিতে হচ্ছে। এগুলো নিয়ে ব্যবসায়ীরা উদ্বেগের মধ্যে আছেন। এর সমাধান হওয়া উচিত।

ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার মো. ফারুক হোসেন শুক্রবার যুগান্তরকে বলেন, যদি কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিতে জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া যায় তবে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে।

এতে অপরাধ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট সদস্যকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে। তবে তিনি বলেন, এ ধরনের কাজের সঙ্গে পুলিশের সম্পৃক্ততার কোনো অভিযোগ তাদের কাছে নেই। 

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলেন, তদারকিকালে দেখছি বাজারে পর্যাপ্ত সবজি আছে, কিন্তু দামও বেশি। কেন এই দাম বেশি তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অনিয়ম পেলেই শাস্তির আওতায় আনা হবে।

অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার মন্ডল বলেন, পরিবহণ খরচসহ বড় আকৃতির একটি লেবুর পাইকারি মূল্য কাওরান বাজারে ৩ টাকা হলেও বিভিন্ন হাতবদল হয়ে রাজধানীর খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে প্রতিটি ১০ টাকা। এখানে কোনো কারসাজি আছে কিনা তা দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি চাঁদাবাজি বিষয়টাও দেখা হচ্ছে।

হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপারেশনস) যুগান্তরকে বলেন, ঢালাওভাবে হাইওয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির যে অভিযোগ আনা হচ্ছে তা সত্য নয়।

তবে এই অভিযোগকে আমরা অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে নিয়েছি। কেবল পুলিশ সদস্য নয়, সড়কে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে আমরা শক্ত অবস্থানে আছি। যেখানেই এ ধরনের ঘটনা ঘটুক না কেন, আমাদের জানানোর জন্য অনুরোধ করছি। তাহলে আমরা তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে যেতে পারব।
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন