ঢামেক হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট
রোগী ঢুকতে পারলেও বেরোনো কঠিন
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। দেশের সর্ববৃহৎ সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র। উন্নত ও জরুরি চিকিৎসার আশায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন এখানে ছুটে আসেন হাজারো রোগী ও তাদের স্বজন। তবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ঢোকা সহজ হলেও রোগী নিয়ে বের হওয়া কঠিন। কারণ অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের হাতে রীতিমতো জিম্মি এই হাসপাতাল। অ্যাম্বুলেন্সের মালিক, চালক এবং স্থানীয় চাঁদাবাজরা মিলেমিশে এক বিশাল চক্র গড়ে তুলেছে।
রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সিন্ডিকেট সদস্যদের অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া অন্য কোনো অ্যাম্বুলেন্স ঢাকা মেডিকেলের রোগী নিতে পারে না। এক্ষেত্রে এক অঘোষিত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে আদায় করা হয় ইচ্ছামতো ভাড়া। দূরত্ব যাই হোক না কেন অ্যাম্বুলেন্সে উঠলেই ভাড়া গুনতে হয় ২ থেকে আড়াই হাজার টাকা। এর সঙ্গে বিভিন্ন সার্ভিস চার্জের নামে অতিরিক্ত আরও অর্থ আদায় করা হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ঢাকা মেডিকেলে অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কমাতে কয়েক মাস আগে একটি বেসরকারি আইটি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে চালু হয় ‘অল সমাধান’ নামের মোবাইল অ্যাপস। যেখানে ন্যায্যমূল্যে অ্যাম্বুলেন্স থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় বেশকিছু সেবা পাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে অল সমাধান অ্যাপসও সেভাবে কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছে না।
ফাঁদ : ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (ঢামেক) থেকে মাত্র চার কিলোমিটার দূরে লালবাগের ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করলে দিতে হয় ৩ হাজার টাকা। এর সঙ্গে বাড়তি যোগ হয় সার্ভিস চার্জ ও ভ্যাট ২৮০ টাকা, হুইলচেয়ার ১০০ টাকা, সাপোর্ট স্টাফ ৫০০ এবং বকশিশ একশ টাকা। সব মিলিয়ে খরচ প্রায় ৪ হাজার টাকা। অথচ একই দূরত্বে যেতে উবারের প্রিমিয়ার সার্ভিসে সর্বোচ্চ খরচ পড়ে মাত্র তিন থেকে সাড়ে তিনশ টাকা।
গত ১ মাসে ঢাকা মেডিকেল থেকে রোগী পরিবহণের বেশকিছু ভাড়ার রসিদ আসে যুগান্তরের হাতে। এতে দেখা যায়, ১ অক্টোবর ঢামেক থেকে ধানমন্ডির পপুলারে যেতে ভাড়া নেওয়া হয় আড়াই হাজার টাকা। একইভাবে ২ অক্টোবর পল্লবী-১২ পর্যন্ত যেতে ভাড়া ২ হাজার ৮০০ টাকা। এদিন শ্যামলী পর্যন্ত আরেক ট্রিপের জন্য ভাড়া নেওয়া হয় ২ হাজার ৫০০ টাকা। এছাড়া ঢাকা মেডিকেল থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরত্বে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতেও হাজার টাকা ভাড়া আদায়ের রেকর্ড পাওয়া যায়।
তবে ঢাকার বাইরে যাওয়ার পরিস্থিতি আরও জটিল। এক্ষেত্রে ইচ্ছামতো আদায় করা হয় ভাড়া। ঢাকার বাইরে যাওয়া একাধিক অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়ার রসিদ পরীক্ষা করে দেখা যায়, ১৬ আগস্ট ঢামেক থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ যেতে এক রোগীর কাছ থেকে আদায় করা হয় ৬ হাজার টাকা। এছাড়া ১৩ সেপ্টেম্বর পটুয়াখালীর গলাচিপায় যাওয়ার ভাড়া ১৬ হাজার ৫৬০ টাকা। এর সঙ্গে ভ্যাট বাবদ আরও দেড় হাজার। এদিন কুষ্টিয়া যাওয়ার আরেকটি ট্রিপের ভাড়া নেওয়া হয় ১২ হাজার টাকা।
২৭০০ টাকা : ১১ অক্টোবর এ প্রতিবেদক নিজেই রোগী সেজে ঢাকা মেডিকেল চত্বরে হাজির হন। যথারীতি ‘সমাধান’ অ্যাপের মাধ্যমে অ্যাম্বুলেন্স বুক করা হয়। গন্তব্য-যমুনা ফিউচার পার্কে অবস্থিত যুগান্তর কার্যালয়। ঢাকা মেডিকেল থেকে গন্তব্যের দূরত্ব প্রায় ১৬ কিলোমিটার। অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের সদস্যরা ভাড়া হাঁকেন আড়াই হাজার টাকা। এর সঙ্গে হুইলচেয়ার ও বকশিশ বাবদ আরও ২০০ টাকা।
সময় তখন বিকাল পৌনে ৫টা। ২ হাজার ৭০০ টাকা ভাড়া চূড়ান্ত হলে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়। এরপর গন্তব্যের উদ্দেশে যাত্রা। চালকের নাম সোহেল। ঢাকা মেডিকেল এলাকায় তিনি আছেন ২০১৪ সাল থেকে। আগে ছিলেন রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার দালাল। পরে অ্যাম্বুলেন্স ধোয়া-মোছার কাজ করতেন। একপর্যায়ে অ্যাম্বুলেন্স চালকের সহকারী এবং বর্তমানে নিজেই অ্যাম্বুলেন্স চালান। এক্ষেত্রে প্রাথমিক চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রশিক্ষণ গ্রহণের নিয়ম থাকলেও তিনি কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ নেননি। তবে নার্সদের কাছ থেকে অক্সিজেন মাস্ক পরা শিখেছেন। সোহেল বলেন, ভাড়া হিসাবে যে অর্থ পাওয়া যায় তার পুরোটাই মালিকের হিসাবে জমা দিতে হয়। শুধু প্রতি ট্রিপের জন্য মজুরি হিসাবে তাকে ৫০০ টাকা দেওয়া হয়।
যা আছে নীতিমালায় : অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস নীতিমালা-২০২৩-এর খসড়ায় বাণিজ্যিক অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে-ঢাকা মহানগরীর মধ্যে প্রথম দুই কিলোমিটারের ভাড়া হবে সর্বোচ্চ ৬০০ টাকা। তবে মহানগরীর বাইরে ৪০০ টাকা। এর পরের প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া হবে ৬০ টাকা। ভাড়ায় চালিত অ্যাম্বুলেন্সে মিটার সংযোজন ও যাত্রার সময় সংক্রান্ত তথ্যের রেকর্ড রাখার কথাও বলা হয়েছে। এছাড়া অ্যাম্বুলেন্সচালক এবং সহকারীদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং ধারণা থাকতে হবে।
যাদের হাতে নাটাই : ঢামেককেন্দ্রিক ১৩৬টি বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স চলাচল করে। এসব গাড়ির নিবন্ধন, ফিটনেস ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর অভিযোগ, এই নেটওয়ার্কের সদস্যরা ঢামেক থেকে রোগী বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান। আবার বেসরকারি হাসপাতাল থেকেও রোগী ঢামেকে আনার ব্যবস্থা করেন। এতে রোগীর যাতায়াতের দুদিকেই এরা অ্যাম্বুলেন্স বাণিজ্য করেন।
সূত্র জানায়, ঢামেককেন্দ্রিক অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের মূল হোতা হিসাবে স্থানীয় অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি আবুল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক বাদল মাতবরের নাম জানা যায়। অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থাপনায়ও বাদল মাতবরের প্রভাব রয়েছে। তবে ব্যবসায় বনিবনা না হওয়ায় সম্প্রতি আবুল হোসেন পদত্যাগ করেছেন। এছাড়া ঢামেকের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী সমিতির সভাপতি আজিম ও সাধারণ সম্পাদক শিপন মিয়াসহ আরও বেশ কয়েকজন কর্মচারী অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসায় যুক্ত রয়েছেন।
দখলের অফিস : ঢামেকের জরুরি বিভাগের গেটের বিপরীতে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতির কার্যালয়ের সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে। এছাড়া নতুন ভবনের সিঁড়িঘরের একটি অংশেও অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম চলছে। এসব জায়গা থেকে অ্যাম্বুলেন্সের সিরিয়াল, চালকদের সঙ্গে যোগাযোগ, রোগীর স্বজনদের সঙ্গে দরদাম ও গাড়ি ঠিক করার কাজ চলে। হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ও ফ্লোরে অন্তত দুই ডজন চালক ও সহযোগীকে রোগীর সন্ধানে তৎপর থাকতে দেখা গেছে।
ঢামেকের একাধিক চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর অভিযোগ, ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর জরুরি বিভাগের বিপরীতে সমিতির কার্যালয় উদ্বোধন করেন হাসপাতালের সদ্য সাবেক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আসাদুজ্জামান। ওই সময় বর্তমান উপপরিচালক ডা. আশরাফুল আলমও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সরকারি জায়গায় বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স সমিতির অফিস কেন তা নিয়ে খোদ হাসপাতাল প্রশাসনেরই প্রশ্ন রয়েছে।
সাবেক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আসাদুজ্জামান বদলি হয়ে নিজ বাহিনীতে ফিরে যাওয়ায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। এছাড়া উপপরিচালক ডা. আশরাফুল আলমের বক্তব্য জানার জন্য অফিসে গেলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে বক্তব্য জানতে চেয়ে তার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে খুদে বার্তা পাঠানো হয়। কিন্তু এতেও তিনি সাড়া দেননি।
যা বলছেন সমিতির নেতারা : অ্যাম্বুলেন্স বাণিজ্য ও রোগীদের জিম্মি করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢামেক চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী সমিতির সাধারণ সম্পাদক শিপন মিয়া যুগান্তরকে বলেন, হাসপাতালকেন্দ্রিক বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ও ‘সমাধান’ অ্যাপের মালিকানা বা পরিচালনার সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। বর্তমান পরিচালকের নির্দেশে অ্যাপের কার্যক্রমও বন্ধ করা হয়েছে। হাসপাতালের ভেতর থেকে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আরেক নেতা ঢামেককেন্দ্রিক অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির সভাপতি আবুল হোসেন যুগান্তরকে বলেন, তিনি শারীরিক অসুস্থতার কারণে ২ মাস আগে সমিতি থেকে লিখিতভাবে পদত্যাগ করেছেন। এ কারণে সমিতির কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি কিছু বলতে পারছেন না। সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাদল মাতবর বলেন, অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া থেকে সমিতি কোনো অর্থ আদায় করে না। চালকরা ভাড়ার ২০ শতাংশ পারিশ্রমিক হিসাবে পান।
সোনার হরিণ সরকারি অ্যাম্বুলেন্স : ঢামেকে আটটি সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে দুটি অচল। সচল ছয়টির পাঁচটি সাধারণ এবং একটি আইসিইউ সাপোর্টেড অ্যাম্বুলেন্স। সংশ্লিষ্টদের জোরালো তদবির ছাড়া এসব অ্যাম্বুলেন্সের সেবা পাওয়া সাধারণের নাগালের বাইরে। তবে সান্ধ্যকালীন সরকারি চালক-সহকারীরা মিলে রাজধানীর আশপাশে টাকার বিনিময়ে রোগী পরিবহণ করে থাকেন বলে জানা গেছে। ঢামেক অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য প্রসঙ্গে জানতে চাইলে হাসপাতালের নবনিযুক্ত পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম ফরহাদ হোসেন ১৩ অক্টোবর যুগান্তরকে বলেন, ‘হাসপাতালের জায়গা সীমিত। প্রতিদিন এখানে হাজারো রোগী ও স্বজনরা যাতায়াত করেন। ফলে হাসপাতালের ভেতরে এভাবে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসার কোনো সুযোগ নেই।’
