সিপিডির বাজেট সংলাপ
মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগই প্রধান চ্যালেঞ্জ
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২২, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধিই আগামী অর্থবছরের বাজেটের প্রধান চ্যালেঞ্জ। এছাড়া পাচার হওয়া টাকা ৭ শতাংশ কর দিয়ে বৈধ করার সুযোগ দেওয়াটা নৈতিকতাবিরোধী এবং সৎ, এতে ব্যবসায়ীরা নিরুৎসাহিত হতে পারে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বাজেট সংলাপে অংশ নিয়ে বক্তারা এসব বিষয় তুলে ধরেছেন। বৃহস্পতিবার রাজধানীর লেকশোর হোটেলে অনুষ্ঠিত সংলাপে সভাপতিত্ব করেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।
এতে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান। বিশেষ অতিথি ছিলেন জাতীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এমপি, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং কাজী নাবিল আহমেদ এমপি।
সংলাপে ‘ন্যাশনাল বাজেট ফর ফিসক্যাল ইয়ার-২০২২-২৩ : অ্যাড্রেসিং সিক্স চ্যালেঞ্জ, মেজারস প্রোপোসড অ্যান্ড মেজারস রিকয়ার্ড’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
আলোচক ছিলেন শ্রমিক নেতা রাজেকুজ্জামান রতন, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিডেন্ট রিজওয়ান রহমান, এমপ্লয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি সুস্মিতা আনিস। বক্তব্য দেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরউল্লাহ চৌধুরী, অ্যাডভোকেট সালমা আলী, সাবেক বাণিজ্য সচিব সোহেল আহমেদ চৌধুরী প্রমুখ।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়েছে, বাজেটের প্রথম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে মূল্যস্ফীতি। কিন্তু মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজেটে উপযুক্ত রূপরেখা নেই। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য আরও যেসব পদক্ষেপ নেওয়া যেত, সে বিষয়ে গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো দরকার ছিল।
পাশাপাশি ধনী শ্রেণির করদাতাদের সর্বোচ্চ করহার ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে আগের মতো ৩০ শতাংশ করা এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সাধারণ মানুষের জন্য বরাদ্দ বাড়ানো দরকার ছিল। এছাড়া বেশকিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে উচ্চহারে শুল্ক-কর আরোপিত আছে।
এগুলোর কর হার কমানো হলে তা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতো। এসবের বাইরে দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করার জন্য শুল্ক, ভ্যাট ও কর কাঠামোতে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। তাহলেই বিনিয়োগ বাড়বে। বিনিয়োগ বাড়ানোর একটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বর্ধিত ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা। সারে ভর্তুকি বাড়ানোর উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের বিষয়ে যে উদ্যোগ নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে, সে বিষয়ে আপত্তি আছে।
তাড়াহুড়ো করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলে দেশের অর্থনীতিতে নানাভাবে তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তৃতীয় চ্যালেঞ্জ বৈদেশিক সহায়তার মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থের সঠিক ব্যবহার ও প্রাধিকারভুক্ত প্রকল্পগুলোর সময়মতো বাস্তবায়ন করা।
আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটেও অনেকগুলো প্রকল্পে নামমাত্র বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে করে প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন অনেক বিলম্বিত হয়। চতুর্থ চ্যালেঞ্জ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে কম বরাদ্দ।
স্বাস্থ্য খাতে গত ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বরাদ্দ দেশের মোট জিডিপির এক শতাংশেরও কম। এমনকি এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর মধ্যেও এ বরাদ্দে বাংলাদেশ পেছনের সারিতে।
এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য খাতের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো সময়মতো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ দরকার। এছাড়া শিক্ষা খাতে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তার সঠিক বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
পঞ্চম চ্যালেঞ্জ হলো স্থানীয় পর্যায়ে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট ও করদাতার সংখ্যা বাড়ানো। সরকার প্রস্তাবিত বাজেটে করপোরেট কর হার কমানোর ঘোষণা দিলেও ব্যবসায় ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার বাস্তবায়ন, কর কাঠামোর সংস্কার ও ব্যবসা সহজীকরণের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা না হলে করপোরেট কর হ্রাসের সুবিধা বিনিয়োগকারীরা নিতে পারবেন না।
এছাড়া বিদেশে পাচার হওয়া টাকা বৈধ করার সুযোগ দেওয়া নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ। একই সঙ্গে এ ধরনের উদ্যোগ সৎ করদাতাদের প্রতি অবিচার হয়। ষষ্ঠ ও সর্বশেষ চ্যালেঞ্জ মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা। এ বিষয়ে উদ্যোগ থাকতে হবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, অনেক সময় গবেষণা সংস্থাগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মেলে না। এর অন্যতম কারণ হলো আমাদের বাস্কেট অনেক বড়।
গ্রাম-শহর উভয় মিলে অনেক বড় বাস্কেট ধরেই মূল্যস্ফীতি হিসাব করে বিবিএস। কিন্তু আপনারা ছোট বাস্কেট নিয়ে কাজ করেন। বাস্কেটের তারতম্য আছে। চালের দাম বেশি।
এর প্রভাব সরাসরি গরিব ও নিুআয়ের মানুষের ওপর পড়াটাই স্বাভাবিক। আপনারা সেই অংশ থেকেই তথ্য নিয়ে মূল্যস্ফীতির প্রভাবটা দেখান। ফলে অনেক বেশি মনে হয়।
কিন্তু সার্বিকভাবে হিসাব করলে চিত্র অন্যরকম আসে। তিনি আরও বলেন, ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি কৃষি, গ্যাস ও বিদ্যুতে যে ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে সেটি ঠিক আছে।
কেননা এটি দিতে হবে। সমাজের বড় অংশ তাদের ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা বৈষম্য কমাতে কাজ করছি।
ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রাদেশিক সরকার প্রয়োজন। যা জাতীয় পার্টি অনেক আগেই বলেছে। জাতীয় পার্টির সময়কার উপজেলা ব্যবস্থা এখন ফল দিচ্ছে।
আমরা কোর্টকে বিকেন্দ্রীকরণ করেছিলাম। কিন্তু সেটি পরে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছিল। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতির প্রকৃত হিসাব করলে দেখা যাবে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। এই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ অন্যতম চ্যালেঞ্জ।
কিন্তু মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজেটে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেই। কার স্বার্থে ৭ শতাংশ কর দিয়ে পাচার হওয়া টাকা বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হলো? এর মাধ্যমে নীতি-নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, অনির্বাচিত সরকারের দেওয়া এই বাজেটে জনগণের চাওয়া-পাওয়া উপেক্ষিত হয়েছে। এই সরকার বাজেট দিতে পারে কিনা তার বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
পদ্মা সেতু করতে ১০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প ৩০ হাজার কোটি টাকা লেগেছে কেন। এই টাকা বলছেন নিজের টাকা। এটা তো জনগণের টাকা। বিদেশ থেকে ঋণ নিলে ১০ হাজার কোটি টাকাতেই হয়ে যেত।
সেটিও তো জনগণের টাকা দিয়েই পরিশোধ করা হতো। পদ্মা সেতু নিয়ে প্রশ্ন করছি, উত্তর দেন। কিন্তু তা না দিয়ে ষড়যন্ত্র দেখছেন কেন? বাংলাদেশের রিজার্ভ, আমদানি, রপ্তানিসহ অন্যান্য অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান সঠিক নয়।
মূল্যস্ফীতির বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কাজী নাবিল আহমেদ বলেন, করোনা মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ আন্তর্জাতিক বাজারে চাপ সৃষ্টি করেছে। ফলে দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমদানি কমানো এবং মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। রিজওয়ান রহমান বলেন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি বড় চ্যালেঞ্জ হবে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কম থাকায় অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ কমে যাবে।
বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য বাজেটে বিশেষ সুযোগ থাকা দরকার। পোশাক খাতের সঙ্গে রপ্তানিমুখী শিল্পের একই কর হার করাটা প্রশংসাযোগ্য। কর ব্যবস্থা অটোমেশন করতে হবে। এডিপির বাস্তবায়ন দ্রুত ও স্বল্প খরচে করতে হবে। টাকা পাচার করে ফিরিয়ে আনলে ৭ শতাংশ কর দিতে হবে।
